মুদি দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা শেষে ৫০০ টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দিয়ে বিক্রেতার অসহায় চাহনি আর ‘খুচরা নেই’ শুনতে হওয়া আজকাল দেশের প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে| সামান্য এক কেজি মুরগি কিংবা প্রতিদিনের শাকসবজি কেনার পর ভাঙতি টাকার জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের যে বিরক্তি তৈরি হয়, তা নিছক কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়| এই প্রকাশ্য দৃশ্যমান খুচরা সংকটের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে দেশের মুদ্রা ব্যবস্থার এক জটিল অর্থনৈতিক টানাপড়েন এবং শত শত কোটি টাকার মুদ্রা ছাপানোর হিসাব-নিকাশ| কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে স্থানীয় বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত এই নগদ টাকার বৃত্তে এখন বড় নোটের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয়েছে, যার কারণে ছোট অঙ্কের কাগুজে নোটগুলো যেন বাজার থেকে নিঃশব্দে উধাও হয়ে যাচ্ছে|
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন মানের কাগুজে নোটের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৬৬ কোটিরও বেশি| আপাতদৃষ্টিতে বাজারে প্রচুর কাগুজে মুদ্রা সক্রিয় মনে হলেও এর অভ্যন্তরীণ গঠনের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন| হিসাব অনুযায়ী, বাজারে ছড়িয়ে থাকা মোট কাগুজে নোটের প্রায় অর্ধেকই এখন ৫০০ এবং ১০০০ টাকার মতো উচ্চমূল্যের নোট| তথ্যে দেখা যাচ্ছে, দেশে বর্তমানে ৫০০ টাকার নোট রয়েছে প্রায় ২৭০ কোটি এবং ১০০০ টাকার নোট রয়েছে ২০৩ কোটিরও বেশি| এই দুই বড় অঙ্কের নোট একত্রে যোগ করলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় ৪৭৩ কোটি| অর্থাৎ সহজ সমীকরণে দেশের প্রচলিত প্রতি একশতটি কাগুজে নোটের মধ্যে অন্তত ৪৯টি নোটই ৫০০ কিংবা ১০০০ টাকার বড় নোট|
বড় নোটের এই অতি-উপস্থিতির বিপরীতে দৈনন্দিন ক্ষুদ্র লেনদেনের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও প্রয়োজনীয় নোটগুলোর উপস্থিতি চরমভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে| বাজারে সবচেয়ে দুর্লভ রূপ ধারণ করেছে জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে চালু হওয়া ২০০ টাকার নোটটি| বর্তমানে বাজারে এই মানের নোট রয়েছে মাত্র ৫২ কোটি, যার অর্থ হলো মোট প্রচলিত নোটের মধ্যে ২০০ টাকার নোটের অংশ শতকরা মাত্র পাঁচটি| অথচ মধ্যম সারির কেনাকাটায় এই নোটটি খুচরার চাপ সামলাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারত| অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক যাতায়াত, রিকশাভাড়া কিংবা চায়ের দোকানের জন্য সর্বাধিক ব্যবহৃত ১০, ২০ ও ৫০ টাকার মতো ছোট নোটগুলোর মোট সংখ্যা ৩২৩ কোটির মতো হলেও আর্থিক মূল্যের দিক থেকে তা অত্যন্ত নগণ্য| এই ৩২৩ কোটি ছোট নোটের সম্মিলিত বাজারমূল্য মাত্র সাত হাজার কোটি টাকা| এর বিপরীতে বাজারে প্রচলিত ১০০০ টাকার নোটগুলো একাই ধরে রেখেছে প্রায় ২ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল আর্থিক বাজার| ফলে সংখ্যা ও মূল্যের এই অস্বাভাবিক বৈষম্যের কারণেই একজন নাগরিক যখন রিকশাচালককে ২০ টাকা ভাড়া মেটাতে বড় নোট দেন, তখন চালক খুচরা ফেরত দিতে ব্যর্থ হন; কারণ বাস্তবে পুরো বাজারেই ছোট নোটের দৃশ্যমান ঘাটতি তৈরি হয়েছে|
বাজার থেকে খুচরা নোট ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার এই কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে পৌঁছাতে হয় গাজীপুরের সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের ছাপাখানায়| বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশে নতুন টাকা ছাপানোর খরচ আকাশচুম্বী আকার ধারণ করেছে| সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে নতুন কাগুজে মুদ্রা ছাপানোর পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যয় হয়েছে ৪৫৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা| অথচ এর ঠিক আগের অর্থবছরে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২৩৪ কোটি টাকা| অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে টাকা ছাপানোর রাষ্ট্রীয় খরচ বেড়েছে প্রায় ৯৬ শতাংশ, যা প্রায় দ্বিগুণের সমান|
একটি একক নোট মুদ্রণে কত খরচ হয় তার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে| ২০২০ সালের দিকে একটি ২০ টাকার নতুন নোট ছাপাতে যেখানে খরচ হতো মাত্র ১ টাকা ৫৮ পয়সা, সেখানে বর্তমানে সেই একই নোট ছাপাতে খরচ হচ্ছে ৫ টাকা ২০ পয়সা| অর্থাৎ ২০ টাকার নোট ছাপানোর খরচ এক লাফে বেড়েছে প্রায় ২২৯ শতাংশ| একইভাবে ৫০ টাকার নোটের ছাপানোর খরচ বেড়েছে প্রায় ২২২ শতাংশ| এমনকি দেশের সর্বোচ্চ মূল্যের ১০০০ টাকার একটি নোট তৈরি করতে এখন খরচ পড়ছে ১০ টাকা ৪৪ পয়সা, যা পূর্বে ছিল ৫ টাকা ৪৯ পয়সা|
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে কাগুজে মুদ্রার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত তুলাযুক্ত সিকিউরিটি কাগজ এবং বিশেষ রাসায়নিক ও নিরাপত্তাযুক্ত কালির চরম সংকট তৈরি হয়েছে| বিশ্ববাজারে এই সংবেদনশীল কাঁচামাল সরবরাহ করে হাতে গোনা কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান| রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং কাঁচামালের দাম বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে| এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রা টাকার তীব্র অবমূল্যায়ন| ডলারের দর বেড়ে যাওয়ার ফলে আমদানি ব্যয় অত্যধিক বেড়ে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কারেন্সি নোট তৈরির বাজেটের ওপর|
এই প্রতিকূল বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক ধরনের বাধ্যতামূলক ও কৌশলী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে| তারা আপাতত ছোট নোট মুদ্রণের গতি কমিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বড় নোট ছাপানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে| নীতিগত এই সিদ্ধান্তের পেছনে সহজ হিসাব কাজ করছে—একটি ১০ বা ২০ টাকার কাগুজে নোট বাজারে ছাড়া হলে সাধারণ মানুষের বারবার ব্যবহারে তা দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই ময়লা হয়ে ছিঁড়ে যায় এবং পুনরায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে| ফলে অল্প সময়ের জন্য এই নোটগুলো ছাপাতে যে বিপুল পরিমাণ ডলার ও টাকা খরচ হয়, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য এক ধরনের অপচয়ে পরিণত হচ্ছে| এর বিপরীতে ৫০০ বা ১০০০ টাকার মতো বড় নোটগুলো মানুষ সাধারণত সতর্কভাবে ব্যবহার করে ও মানিব্যাগে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করে, ফলে এগুলোর আয়ুষ্কাল অনেক বেশি হয়|
মুদ্রা ছাপানোর এই কারিগরি সংকটের পাশাপাশি দেশজুড়ে খুচরা নোটের প্রয়োজনীয়তা কমে আসার পেছনে কাজ করছে বিগত কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি| বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং বিগত দুই বছর ধরে এই হার প্রায়শই ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করেছে| এই দীর্ঘমেয়াদী মূল্যস্ফীতির প্রত্যক্ষ ফল হলো—যে নিত্যপণ্য পূর্বে ১০০ টাকায় কেনা সম্ভব হতো, তা সংগ্রহ করতে এখন গ্রাহকের পকেট থেকে বের করতে হচ্ছে ৫০০ টাকারও বেশি| ফলে কম মূল্যের কাগুজে নোট দিয়ে এখন আর ব্যাগমালিকদের পক্ষে প্রাত্যহিক বাজার সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না| এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অটোমেটেড টেলার মেশিন বা এটিএম বুথগুলোতে গ্রাহকদের চাহিদা ও ধারণক্ষমতার সুবিধার্থে কেবল ৫০০ ও ১০০০ টাকার বড় নোট লোড করা হয়| ফলে সাধারণ চাকরিজীবী বা পেশাজীবীরা যখন ব্যাংক বুথ থেকে কার্ডের মাধ্যমে নগদ টাকা উত্তোলন করেন, তখন তাদের হাতে স্বাভাবিকভাবেই বড় নোট চলে আসে, যা বাজারে খুচরা সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করে তোলে|
তবে দেশের প্রচলিত মুদ্রা কাঠামোর সুরক্ষায় আরেকটি আইনি ও অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে| কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী, বাজারে যে পরিমাণ কাগুজে মুদ্রা ছাড়া হয়, তার বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সম্পদ রিজার্ভে জমা রাখতে হয়| বর্তমানে বাজারে প্রচলিত প্রায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার কাগুজে নোটের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে জমা রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা| অর্থাৎ সাধারণ মানুষের পকেটে থাকা প্রতি ১০০ টাকার সুরক্ষার পেছনে প্রায় ৮১ টাকাই নিশ্চিত করছে মার্কিন ডলার| স্বর্ণ মজুতের অংশ সেখানে শতকরা মাত্র ৬ টাকার কাছাকাছি| ফলে সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত টাকার অন্তর্নিহিত ক্রয়ক্ষমতা ও নিরাপত্তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে দেশের সার্বিক বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতার ওপর|
মুদ্রা ছাপানোর আকাশছোঁয়া খরচ এবং খুচরা টাকার এই তীব্র টানাটানি থেকে মুক্তির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন ক্যাশলেস বা ডিজিটাল লেনদেনের সম্প্রসারণকে প্রধান বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে| সাধারণ জনগণকে নগদ কাগুজে টাকার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে দৈনন্দিন লেনদেন করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে| ফুটপাতের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে প্রান্তিক কাঁচাবাজারে ‘বাংলা কিউআর’ কোডের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন চালু করার প্রক্রিয়া জোরদার করা হচ্ছে| ডিজিটাল ব্যবস্থায় ২০ টাকা বা ৫০ টাকার মতো ছোট পরিশোধ সম্পন্ন হলে একদিকে খুচরা ফেরতের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে নাগরিকরা মুক্তি পাবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকার মুদ্রা ছাপানোর বৈদেশিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে সাশ্রয় হবে|
চূড়ান্ত বিশ্লেষণে নাগরিকের মানিব্যাগে ৫০০ বা ১০০০ টাকার বড় নোটের উপস্থিতি কোনোভাবেই তার বর্ধিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রকাশ করে না| বরং এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রার মানের অবমূল্যায়নের কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কতটা সংকুচিত হয়েছে| বাজারে খুচরা টাকার এই অনুপস্থিতি কোনো আকস্মিক সমস্যা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনীতির বহুমুখী চাপের এক প্রত্যক্ষ প্রতিফলন| অতীতে যে টাকায় পরিবারের নিত্যদিনের বহু প্রয়োজন মিটে যেত, আজ সেই অঙ্কের টাকায় একটি সাধারণ হিসাব মেটানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছে—যা জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক পরিবর্তনের এক কঠিন সত্যকে প্রতিদিনের কেনাকাটায় উন্মোচিত করছে|