নারীর শরীরের একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক এবং অপরিহার্য জৈবিক প্রক্রিয়া হলো মাসিক বা পিরিয়ড। পৃথিবীর প্রতিটি নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশের সামাজিক বাস্তবতায় এই বিষয়টি নিয়ে আজও প্রকাশ্যে কথা বলা এক ধরনের অলিখিত ট্যাবু বা নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবেই রয়ে গেছে। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্র—সবখানেই মাসিক নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা পালন করা হয়। এই সামাজিক সংকোচ, অজ্ঞতা এবং সর্বোপরি নিরাপদ শৌচাগারের তীব্র অভাবের কারণে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন দেশের লাখ লাখ নারী ও কিশোরীর জীবন যেন আক্ষরিক অর্থেই থমকে যায়। নারীদের এই নীরব কষ্ট দূর করে তাদের জন্য একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার বৈশ্বিক দাবি নিয়ে ২৮ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবস’। এই বছর দিবসটির অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘একসঙ্গে গড়ি মাসিকবান্ধব বিশ্ব’ বা হ্যাশট্যাগ পিরিয়ডবান্ধববিশ্ব।
মাসিক চলাকালীন বাড়ির বাইরে বের হওয়া অনেক কর্মজীবী নারীর জন্য এক নিদারুণ মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যাদের কাজের প্রয়োজনে নিয়মিত মাঠপর্যায়ে বা বাইরে যেতে হয়, তাদের ভোগান্তির কোনো সীমা থাকে না। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাথী নামের এক নারী জানান, অফিসের বাইরে কাজ থাকলে পুরোটা সময় তিনি এক ধরনের ভয় ও মানসিক চাপের মধ্যে কাটান। কোথায় তিনি প্যাড পরিবর্তন করবেন, কিংবা কোথায় পরিষ্কার পানি ও একটি স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার পাবেন—এই চিন্তায় তার কাজের স্বাভাবিক গতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বাধ্য হয়ে অনেক সময় তাকে দীর্ঘক্ষণ একই প্যাড পরে থাকতে হয়, যা শারীরিক দিক থেকে চরম অস্বস্তিকর এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় অভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরেক চাকরিজীবী নারী নওরীন। তিনি জানান, অফিসে হয়তো কিছুটা সুবিধা পাওয়া যায়, কিন্তু দূরপাল্লার যাত্রা কিংবা গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সময় পথের বাসস্ট্যান্ড বা পাবলিক প্লেসগুলোতে নারীদের জন্য নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগার একেবারেই দুষ্প্রাপ্য। ফলে মাসিকের দিনগুলোতে যেকোনো ধরনের ভ্রমণ তার কাছে এক গভীর আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে।
কেবল কর্মজীবী নারীরাই নন, এই অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে দেশের লাখ লাখ স্কুলপড়ুয়া কিশোরী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীরা। মাসিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ না থাকায় তারা মাসের এই সময়টাতে অস্বাস্থ্যকর উপায় বেছে নিতে বাধ্য হয়। ক্যান্টার ২০২৪-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বাংলাদেশের নারী স্বাস্থ্যের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ওই গবেষণা অনুযায়ী, দেশের মাত্র ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী মাসিকের সময় স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি ন্যাপকিন বা প্যাড ব্যবহার করেন। বাকি বিশাল অংশের নারীরা আজও মাসের এই দিনগুলোতে পুরনো কাপড়, তুলা বা অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর উপকরণ ব্যবহার করে থাকেন। এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা ওই গবেষণার আরেকটি পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। সেখানে দেখা গেছে, অস্বাস্থ্যকর মাসিক ব্যবস্থাপনার কারণে দেশের ৯৭ শতাংশ নারী তাদের জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে জরায়ুমুখের বা সার্ভিকাল সংক্রমণে আক্রান্ত হন। ২২ বছর বয়সী শান্তা এমনই এক ভুক্তভোগী। পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করা এই তরুণী দীর্ঘদিন ধরে তলপেটে ব্যথা ও প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, মাসিকের সময় অস্বাস্থ্যকর পুরনো কাপড় ব্যবহারের কারণেই তার জরায়ুমুখে মারাত্মক সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। শান্তা আক্ষেপ করে জানান, তিনি বছরের পর বছর পুরনো কাপড় ব্যবহার করেছেন এবং সেগুলো সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত করার নিয়মও জানতেন না। সামান্য সচেতনতার অভাবে আজ তাকে এত বড় শারীরিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ন্যাশনাল হাইজিন সার্ভের তথ্যমতে, দেশের ৮৬ শতাংশ কিশোরী এখনও মাসিকের সময় পুরনো কাপড় বা ন্যাকড়া ব্যবহার করে এবং এদের মধ্যে মাত্র ১১ শতাংশ সেই কাপড় স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ব্যবহার করতে জানে। ব্র্যাক হেলথকেয়ার সেন্টারের চিকিৎসক ডা. দেবশ্রী সাহা এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, অপরিষ্কার কাপড় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করলে নারীদের শরীরে চুলকানি, অস্বাভাবিক স্রাব, মারাত্মক পেলভিক ইনফেকশন থেকে শুরু করে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি বাসা বাঁধে। তার দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার নারী কেবল জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন, যার পেছনে অস্বাস্থ্যকর মাসিক ব্যবস্থাপনা একটি বড় কারণ।
মাসিক স্বাস্থ্যের এই সংকট কেবল স্বাস্থ্যখাতেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি দেশের শিক্ষা এবং অর্থনীতিতেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষার স্তরে গিয়ে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, স্কুলে মেয়েদের জন্য মাসিকবান্ধব শৌচাগার এবং নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধার অভাবই এর অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের (বিএনপিএস) পরিচালক শাহনাজ সুমী জানান, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ‘পিরিয়ডজনিত দারিদ্র্য’ মেয়েদের শিক্ষার পথে এক বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে প্রতি চারজন কিশোরীর মধ্যে একজন কেবল স্যানিটারি প্যাড কিনতে না পারা বা উচ্চমূল্যের কারণে মাসিকের সময় স্কুলে যেতে পারে না। পরিসংখ্যান বলছে, ৪০ শতাংশ স্কুলছাত্রী মাসিকের সময় গড়ে তিন দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত প্রায় ৬০ লাখ নারী শ্রমিক মাসিকজনিত স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে বছরে গড়ে ছয় দিন কাজে অনুপস্থিত থাকতে বাধ্য হন, যা সার্বিক উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শাহনাজ সুমীর মতে, ৮৫ শতাংশেরও বেশি নারী আজও সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যপণ্য ও পর্যাপ্ত স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল লোকদেখানো সচেতনতা নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান প্রয়োজন।
তবে আশার কথা হলো, দেশের বিভিন্ন স্থানে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় এখন প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই সমাধানের কিছু ইতিবাচক মডেল তৈরি হচ্ছে। শেভরন বাংলাদেশের অর্থায়নে এবং সুইসকন্ট্যাক্টের বাস্তবায়নে পরিচালিত ‘স্মাইল’ (SMILE) নামের একটি প্রকল্প হবিগঞ্জের চারটি স্কুল এবং একটি মাদ্রাসায় মেয়েদের জন্য বিশেষ ‘হাইজিন কর্নার’ স্থাপন করেছে। এই উদ্যোগের ফলে ওই এলাকার প্রায় এক হাজার ৮০০ কিশোরী সরাসরি উপকৃত হচ্ছে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে যুগান্তকারী দিক হলো ‘আইওটি-সক্ষম’ (IoT-enabled) স্যানিটারি ন্যাপকিন ডিসপেনসার মেশিনের ব্যবহার। এই আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে রিয়েল-টাইমে প্যাডের মজুত পর্যবেক্ষণ করা যায়, ফলে কখনোই প্যাডের সরবরাহ বন্ধ হয় না এবং ব্যবহার সংক্রান্ত ডেটাও সহজে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়। এর পাশাপাশি নিম্ন আয়ের পরিবারের ছাত্রীদের জন্য ভর্তুকি মূল্যে স্যানিটারি প্যাড সরবরাহ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই ধরনের কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ ছাত্রীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে এবং তাদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধ করছে।
সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সঠিক স্বাস্থ্যপণ্য ব্যবহারের নিয়মকানুন জানাও অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে, একটি স্যানিটারি প্যাড চার থেকে ছয় ঘণ্টার বেশি কোনোভাবেই ব্যবহার করা উচিত নয়। দীর্ঘসময় একই প্যাড পরে থাকলে আর্দ্রতার কারণে সেখানে ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয় এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক নাহিদ আখতার দীপা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে জানান, বাজারের অনেক প্যাডে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান থাকে যা স্পর্শকাতর ত্বকের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই পণ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারীদের অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। তিনি নিজে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে এবং পরিবেশের কথা মাথায় রেখে গত তিন বছর ধরে মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করছেন এবং অন্যান্য নারীদেরও এই সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যকর বিকল্পটি সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করছেন।
২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওয়াশ ইউনাইটেড’ সর্বপ্রথম বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবস পালনের এই মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং ২০১৪ সালের ২৮ মে থেকে এটি বিশ্বব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনি ও অবস বিভাগের অধ্যাপক ডা. সেহেরীন ফারহাদ সিদ্দিকা মনে করেন, মাসিক নিয়ে সমাজে যে নীরবতার সংস্কৃতি চালু আছে, তা ভাঙতে না পারলে নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সচেতনতার শুরুটা হতে হবে একদম নিজ পরিবার থেকে। বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের মনে ভয় বা লজ্জা ঢুকিয়ে না দিয়ে তাদেরকে মাসিকের সঠিক বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জানাতে হবে, তবেই তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বেড়ে উঠবে। মাসিক কোনো অসুস্থতা বা অপবিত্র বিষয় নয়, এটি মানবসভ্যতা টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত। অথচ এই স্বাভাবিক বিষয়টিই আজও অনেক মেয়ের জন্য বঞ্চনার কারণ। সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত অঙ্গীকার এবং নিরাপদ শৌচাগার ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যপণ্য নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল মাসিকবান্ধব একটি সুস্থ বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব।
সূত্র: বাংলানিউজ২৪