বাংলাদেশি প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং মিসফিট টেকনোলজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিমুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে মিয়ানমার সরকার। এর পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের পক্ষ থেকে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা রেড নোটিশও বাতিল করা হয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্প্যানিশ বিচারিক কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে যে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পর মুনিমুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রত্যর্পণের পক্ষে পর্যাপ্ত কোনো আইনি প্রমাণ বা ভিত্তি পাওয়া যায়নি। এই বড় ধরনের আইনি স্বস্তির ফলে দীর্ঘ টানাপোড়েন ও হয়রানির পর ওই বাংলাদেশি উদ্যোক্তা অবশেষে আইনি ঝামেলা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হলেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে, যখন মুনিমুল ইসলাম তাঁর স্ত্রী ও শিশুকন্যাদের সঙ্গে অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যে স্পেনের বার্সেলোনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুরোধের ভিত্তিতে স্প্যানিশ পুলিশ তাঁকে আটক করে। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন মিয়ানমার বা অ্যামচ্যাম মিয়ানমারের দায়েরকৃত একটি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে মিয়ানমার সরকার ইন্টারপোলের মাধ্যমে এই রেড নোটিশ জারি করিয়েছিল। কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই ছুটির আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে বিমানবন্দরে আকস্মিক এই আটকের ঘটনায় তাঁর পুরো পরিবার চরম মানসিক আঘাত ও উৎকণ্ঠার মুখে পড়েছিল।
স্পেনের বিচারিক কর্তৃপক্ষ গত ২৬ অক্টোবর স্বাক্ষরিত একটি আনুষ্ঠানিক আইনি নথিতে জানিয়েছে যে মিয়ানমার সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর তাঁরা মুনিমুল ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান সমস্ত আইনি কার্যক্রম ও বিচারপ্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে দিয়েছেন। এর আগে গত অক্টোবরের শুরুর দিকেই জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন এই বাংলাদেশি প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। তবে গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ চৌদ্দ দিন ধরে তাঁকে নিজ পরিবার ও দুই শিশুকন্যা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আটকে রাখা হয়েছিল, যা তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে এক বিরাট মানসিক, আর্থিক এবং সুনামগত ক্ষতিসাধন করেছে বলে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
মুক্তির পর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় মুনিমুল ইসলাম ইন্টারপোলের বর্তমান আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে এই পুরো ঘটনাটি ইন্টারপোলের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে অত্যন্ত নির্মমভাবে উন্মোচন করেছে। একটি স্বৈরাচারী সামরিক সরকারের পক্ষে কোনো ধরনের শক্ত ও বস্তুগত প্রমাণ ছাড়াই কেবল ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক দেশের মাটিতে একজন নির্দোষ নাগরিককে আটকের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া ইন্টারপোলের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। তিনি আরও জানান যে তিনি এই অন্যায়ের প্রতিকার পেতে অ্যামচ্যাম মিয়ানমার এবং এর সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট বোর্ড সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।
এই পুরো আইনি জটিলতার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল অ্যামচ্যাম মিয়ানমারের একটি অভ্যন্তরীণ আর্থিক বিরোধ। বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ মুনিমুল ইসলাম, অ্যামচ্যামের সাবেক বোর্ড সভাপতি ও মার্কিন নাগরিক অ্যাডাম ক্যাস্টিলও এবং সাবেক নির্বাহী পরিচালক অস্ট্রেলীয় নাগরিক ই খাউং ড্যানি ক্যাওয়ের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনে লবিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি আমেরিকান পাবলিক রিলেশন ফার্মকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এনেছিল। অ্যামচ্যামের দাবি ছিল যে অ্যাডাম ক্যাস্টিলও অবৈধভাবে তিন লক্ষ মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছিলেন এবং বর্তমান বোর্ডের কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই মারকিউরি পাবলিক অ্যাফেয়ার্স নামক পিআর ফার্মকে লবিংয়ের কাজে ব্যবহার করেছিলেন।
বিষয়টি পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে যখন মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এটিকে একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে তদন্ত করতে শুরু করে এবং অ্যাডাম ক্যাস্টিলও ও ই খাউং ড্যানি ক্যাওকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া যুক্তরাজ্য প্রবাসী মুনিমুল ইসলামের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিনিধিদলের বিশেষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অ্যাডাম ক্যাস্টিলওকে কারাবন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে ই খাউং ড্যানি ক্যাও ক্ষমতার চাপের মুখে পড়ে ট্রাস্ট ভঙ্গের অপরাধ স্বীকার করার পর তাঁকে মিয়ানমার থেকে নিজ দেশে ডিপোর্ট বা বহিষ্কার করা হয়েছিল।
বর্তমান গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমার বর্তমানে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যাঁরা ২০২১ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেত্রী অং সান সু চির সরকার থেকে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা মিয়ানমার সরকার বর্তমানে তাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের জন্য এক ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা বা চার্ম অফেন্সিভ চালিয়ে যাচ্ছে। যখন অ্যাডাম ক্যাস্টিলওকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তখন মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপনই তাদের বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মূল অভিযোগের বিপরীতে মুনিমুল ইসলামের আইনি অবস্থান শুরু থেকেই অত্যন্ত স্বচ্ছ ছিল। অ্যামচ্যামের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে মারকিউরি পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের পেছনে ব্যয়িত তিন লক্ষ মার্কিন ডলার সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বর্তমান বোর্ড চরম আইনি ও আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে মুনিমুল ইসলাম জোরালোভাবে প্রমাণ করেছিলেন যে এই পুরো অর্থ তাঁর নিজের কোম্পানির যুক্তরাষ্ট্র শাখা থেকেই কিস্তিতে পরিশোধ করা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে মিয়ানমারের কঠোর বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের কোনো ধরনের লংঘন ঘটেনি। যেহেতু তিনি ২০২২ সাল থেকে মিয়ানমারের বাসিন্দা ছিলেন না এবং সম্পূর্ণ বিদেশে অবস্থান করে কেবল কর্পোরেট ইনভয়েসিং ও ডিসবার্সমেন্টের কাজ পরিচালনা করেছিলেন, তাই তাঁর কোনো ব্যক্তিগত দায় ছিল না।
মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত তাদের নিজস্ব তদন্তে এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পেরেছে। স্প্যানিশ আদালতের কাছে পাঠানো শেষ চিঠিতে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়েছে যে মুনিমুল ইসলাম বিদেশে অবস্থান করে কেবল কর্পোরেট ইনভয়েসিং এবং নির্দেশ অনুযায়ী অর্থ বিতরণের দাপ্তরিক কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন, যার সঙ্গে কোনো অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের প্রমাণ মেলেনি। আর এই সুস্পষ্ট আইনি প্রমাণের ভিত্তিতেই তাঁর বিরুদ্ধে থাকা সমস্ত অভিযোগ এবং ইন্টারপোলের রেড নোটিশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
বয়স চল্লিশ বছর পূর্ণ হওয়া এই উদ্যোক্তা জানিয়েছেন যে মামলা ও হয়রানি থেকে মুক্তি পাওয়ায় তিনি মানসিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেলেও এই পুরো ঘটনার পরিণতির কারণে তিনি মোটেও সন্তুষ্ট নন। নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে যেভাবে অন্যায়ভাবে কারাবাসের মুখোমুখি হতে হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট জবাবদিহিতা তিনি চান। ভবিষ্যতে যাতে অন্য কোনো নিরীহ পরিবারকে এ ধরনের অযাচিত ভূরাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানির শিকার হতে না হয়, তার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহকে আরও বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের মতো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পরোয়ানা অনেক সময় রাজনৈতিক বা করপোরেট স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অপব্যবহার করা হয়, যা মুনিমুল ইসলামের এই মামলার মাধ্যমে আবারও দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ভবিষ্যতে এই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করতে এবং বৈশ্বিক আইনি কাঠামোর স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে আরও কঠোর ও নির্ভরযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তথ্যসূত্র: নিউ এজ