• রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১১ অপরাহ্ন
Headline
২০৩০ সালের মধ্যে ১০৬.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের নিখোঁজ শিশুর লাশ মিলল সীমান্তের ওপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন কতজন, তালিকায় যারা জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান জাতিসংঘে নতুন সরকারের বার্তা দেবেন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী কাল নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন সরকার স্টার্টআপ, উদ্যোক্তা তৈরি ও উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে : জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বাংলাদেশ সফরে আগ্রহী চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা: রাষ্ট্রদূত মাকসুদ কামাল-জাফর ইকবালসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মন্ত্রিসভায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অধ্যাদেশের সংশোধনী অনুমোদন

যুক্তরাষ্ট্রের আশায় হুথি হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ সৌদি

Reporter Name / ৫ Time View
Update : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ প্রতিনিয়তই এক অস্থির ও পরিবর্তনশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবে সম্প্রতি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীদের একটি অভাবনীয় ও নজিরবিহীন আক্রমণ এই অঞ্চলের সংঘাতে এক সম্পূর্ণ নতুন এবং বিপজ্জনক মাত্রার জন্ম দিয়েছে। ইয়েমেন যুদ্ধে নিজেদের শক্তিমত্তার এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করে প্রথমবারের মতো সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বুকে সরাসরি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। রাজধানী রিয়াদ ছাড়াও সৌদি আরবের আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে একযোগে এই সুপরিকল্পিত আক্রমণ পরিচালনা করা হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো লোহিত সাগরের তীরবর্তী অত্যন্ত কৌশলগত বন্দরনগরী ইয়ানবুতে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর জ্বালানি স্থাপনায় হামলা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই প্রক্সি যুদ্ধে হুথিদের এই অত্যাধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার এবং রাজধানীর একেবারে প্রাণকেন্দ্রে আঘাত হানার সক্ষমতা সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের ভেতরে মূলত দুটি সুনির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। তাদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল খোদ রাজধানী রিয়াদের বিভিন্ন স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এবং সামরিক স্থাপনাগুলো। আর দ্বিতীয় বৃহৎ অভিযানটি চালানো হয়েছে ইয়ানবু শহরের আরামকো কোম্পানির অত্যন্ত সুরক্ষিত জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র আরামকোর ওপর এই হামলা প্রমাণ করে যে, হুথিরা কেবল সামরিক ক্ষতিই নয়, বরং সৌদি আরবের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তির ওপর আঘাত হানতে চাইছে। এই দুটি ভয়াবহ অভিযানে হুথিরা বিপুলসংখ্যক ড্রোন, দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অত্যাধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের এক প্রাণঘাতী সংমিশ্রণ ব্যবহার করেছে। রিয়াদ এবং ইয়ানবু ছাড়াও তায়েফ ও ফারাসান শহরের মতো জনবহুল ও কৌশলগত এলাকাগুলোতেও একাধিক ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট দাবি করেছে যে, তারা রিয়াদকে লক্ষ্য করে ধেয়ে আসা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝ আকাশেই সফলভাবে প্রতিহত ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য স্থানে চালানো হামলাগুলোও ব্যর্থ করে দেওয়ার দাবি করেছে সৌদি আরব।
এই নজিরবিহীন হামলার পেছনের কারণ হিসেবে হুথিদের পক্ষ থেকে একটি পাল্টা অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি সৌদি আরব অভিযোগ করেছিল যে, হুথি বিদ্রোহীরা পবিত্র মক্কা শহরকে লক্ষ্য করে হামলার অপচেষ্টা চালিয়েছে। ইয়েমেনের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি সৌদির এই গুরুতর অভিযোগকে সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তাদের দাবি, মক্কায় হামলার এই মিথ্যা অভিযোগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করছে। হুথিরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, মক্কার পবিত্রতা নিয়ে সৌদির এই মিথ্যা প্রচারণার চরম জবাব দিতেই তারা রাজধানী রিয়াদসহ বিভিন্ন শহরে এই ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পথ বেছে নিয়েছে। এদিকে সৌদি আরবের মূল ভূখণ্ডে হুথিদের এই আগ্রাসী ও বহুমুখী হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তিন গুরুত্বপূর্ণ মিত্র রাষ্ট্র কুয়েত, বাহরাইন ও মিশর। তারা এই হামলাকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য চরম হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করে রিয়াদের প্রতি তাদের পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে।
রাজধানী রিয়াদে হামলার পর ইয়েমেনের অভ্যন্তরেও মাঠপর্যায়ের লড়াই চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত অত্যন্ত কৌশলগত জলপথ বাব আল মানদেব প্রণালির কাছে হুথি বিদ্রোহী এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী ও তীব্র সংঘাত সংঘটিত হয়েছে। এই সম্মুখ সমরে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর তুমুল প্রতিরোধের মুখে পড়ে হুথিদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই লড়াইয়ে হুথিদের একজন অত্যন্ত সিনিয়র কমান্ডারসহ অন্তত সাতজন বিদ্রোহী নিহত হয়েছে। লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তার জন্য বাব আল মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি হওয়ায় এই এলাকার সংঘাত উভয় পক্ষের জন্যই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে রাজধানী রিয়াদ এবং তেল স্থাপনায় হামলার চরম প্রতিশোধ নিতে হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে টানা ও ভয়াবহ বিমান হামলা চালানোর ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে সৌদি সামরিক বাহিনী।
তবে হুথিদের বিরুদ্ধে এই আসন্ন সামরিক অভিযানের জন্য সৌদি আরব তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এক সহায়তা কামনা করেছে। রিয়াদ স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, ইয়েমেনে হামলা চালানোর জন্য তাদের নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডারে পর্যাপ্ত গোলাকারুদ বা অস্ত্রের কোনো অভাব নেই। তাদের মূলত প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য। হুথিদের গোপন আস্তানা, অস্ত্রাগার এবং সামরিক স্থাপনাগুলোকে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করা এবং সেই লক্ষ্যবস্তুগুলো নিশ্চিত করার জন্য অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চেয়েছে সৌদি আরব। রিয়াদের এই অবস্থান থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, তারা এখন আর ঢালাওভাবে বোমা বর্ষণ না করে বরং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মাধ্যমে হুথিদের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে চাইছে।
কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের এই দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্রতার মাঝেও এক ধরনের আস্থার সংকট ও ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, পবিত্র মক্কা শহরে হুথিদের সম্ভাব্য হামলার চেষ্টা সময়মতো ঠেকাতে সৌদি আরবের যে ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হয়েছে, তার মূল কারণ হলো ওয়াশিংটনের ওপর রিয়াদের মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা। মার্কিন গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হুথিদের যেকোনো আগ্রাসী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক ঢাল হিসেবে এগিয়ে আসবে, রিয়াদের নীতিনির্ধারকদের মনে এমন একটি বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছিল। সৌদি আরব ধরে নিয়েছিল যে, হুথিদের অগ্রযাত্রা রুখতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করবে। কিন্তু বাইডেন প্রশাসনের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সম্পৃক্ততা কমানোর কৌশলের কারণে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো সংঘাতে জড়ায়নি। মূলত এই ভুল-বোঝাবুঝি এবং ওয়াশিংটনের ওপর অন্ধ ভরসার কারণেই রিয়াদ হুথিদের হামলা প্রতিহত করতে নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণে অমার্জনীয় বিলম্ব করে ফেলে, যার খেসারত তাদের এখন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়ে দিতে হচ্ছে।
যুদ্ধের ময়দানে এমন চরম উত্তেজনা এবং উভয় পক্ষের আগ্রাসী প্রস্তুতির মাঝেই কূটনৈতিক সমাধানের একটি অত্যন্ত ক্ষীণ আশার আলোও দেখা যাচ্ছে। চলমান এই ভয়াবহ সংঘাতকে আর দীর্ঘায়িত না করে পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে হুথি বিদ্রোহীরা পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা শুরু করেছে। এই গোপন যোগাযোগের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে উপসাগরীয় রাষ্ট্র ওমান, যারা ঐতিহ্যগতভাবেই এই অঞ্চলে একটি নিরপেক্ষ কূটনৈতিক চ্যানেল হিসেবে কাজ করে থাকে। ওমানের রাজধানী মাস্কাটের মধ্যস্থতায় হুথিরা এখন কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বসে একটি সম্মানজনক সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহ প্রকাশ করছে। একদিকে রিয়াদে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে নিজেদের সামরিক শক্তির সর্বোচ্চ প্রদর্শনী করা এবং অন্যদিকে ওমানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পথ খোলা রাখা—এটি হুথিদের এক সুচিন্তিত দ্বৈত কৌশল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয় হলো, রিয়াদের আকাশ থেকে শুরু করে বাব আল মানদেবের রণাঙ্গন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত সামরিক শক্তিতে মীমাংসিত হয়, নাকি ওমানের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির কোনো নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
তথ্যসূত্র: স্টার নিউজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category