চলমান দাবদাহের মধ্যে সারা দেশে বিদ্যুৎ বিপর্যয় এক চরম আকার ধারণ করেছে। রোববার মধ্যরাতে স্মরণকালের ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের পর সোমবারও একই চিত্র অব্যাহত রয়েছে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি ও অর্থ সংকটের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালানো হলেও কার্যত কোনো সুফল মিলছে না।
রোববার মধ্যরাত ২টার দিকে দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট। সরকারি হিসাবে, ওই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ১৩ হাজার ৭৩ মেগাওয়াট। সোমবার সারাদিনও পরিস্থিতি প্রায় একই রকম ছিল। সারা দেশে গড়ে ২ থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতটাই বেশি যে, খোদ বিদ্যুৎ বিভাগ পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকায় লোডশেডিং করার কথা ভাবছে। তবে সাধারণ জনগণের ক্ষোভ ও ঢাকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী জানিয়েছেন, ঢাকায় লোডশেডিং করার মতো কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৪ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। অথচ দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা রয়েছে ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। এই বিপুল সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন না হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে অর্থ সংকট ও জ্বালানির অভাবকে দায়ী করছে পিডিবি। পিডিবির কাছে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর বিল বাবদ পাওনা দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অনেক কোম্পানি গত ৭-৮ মাস ধরে তাদের বিল পাচ্ছে না। বকেয়া বিল না পাওয়ায় তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য নতুন করে তেল কিনতে পারছে না।
বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানিয়েছেন, বেসরকারি কোম্পানিগুলো দেশকে লোডশেডিং মুক্ত রাখতে সরকারকে সহযোগিতা করতে চায়। কিন্তু বকেয়া বিল পরিশোধ না করলে কোম্পানিগুলোর পক্ষে অপারেশন চালানো অসম্ভব। বিশেষ করে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন ভয়াবহ সংকটে। দেশের ৪৩টি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অনেকগুলোতে এখন তেলের মজুত শূন্যের কোঠায়। এমনকি অনেক কেন্দ্রে এক লিটার তেলও নেই। যে কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট, সেখান থেকে এখন উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৩ মেগাওয়াট। ফার্নেস অয়েলের অভাবে শান্তাহার বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ১০ দিনের বেশি চালু রাখা যাচ্ছে না।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও একই রকম উদ্বেগজনক। দেশে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৬ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও তা এখন ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে, অপরটিও পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টের মতো বড় কেন্দ্রগুলোও বিল বকেয়া এবং বিভিন্ন দাবিদাওয়ার কারণে নিয়মিত বিদ্যুৎ দিতে পারছে না। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতেও একই সংকট। গ্যাস সংকটের কারণে পিডিবির ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫ হাজার ১১১ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ খাতে আগে যেখানে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ ছিল, এখন সেখানে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৯১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট।
ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি এখন সাধারণ মানুষের জন্য দুঃসহ। বিশেষ করে ময়মনসিংহের শিল্প ও কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে দৈনিক গড়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। ভালুকার বড়াই এলাকা থেকে রবিন বড়ুয়া জানান, দিনে ৪-৫ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় টেক্সটাইল কারখানা থেকে শুরু করে কৃষি খামারিরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কেরানীগঞ্জের সোহেল আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাজধানীতে এখনো কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে ৮-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। চট্টগ্রামের লোহাগড়া, ঠাকুরগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছেন মানুষ।
বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পরিস্থিতি সামাল দিতে সার কারখানা বা অন্য খাতে গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পুরোদমে চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে খুলনার ৩০০ মেগাওয়াটের ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হয়েছে। তবে বিল বকেয়ার কারণে ইউনাইটেড গ্রুপের মতো অনেক কোম্পানি এখনো উৎপাদন বাড়াতে পারছে না। মন্ত্রী তাদের বকেয়া পরিশোধের আশ্বাস দিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন।
পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার আরও একটি কারণ হলো পিডিবি ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। গত ৫ বছরে এমন সংকট দেখেনি বিদ্যুৎ খাত। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের মোট উৎপাদিত গ্যাসের ৬০ শতাংশ ক্যাপটিভসহ বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহার করা হয়। শিল্প খাতের জন্য গ্যাস বরাদ্দ কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একদিকে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের অভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে ওঠার উপক্রম হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট কেবল সাময়িক জ্বালানি বা অর্থের অভাব নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ঘাটতি ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবের বহিঃপ্রকাশ। গ্রীষ্মের এই তীব্র গরমের সময় বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়লে পরিস্থিতি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সরকার যদি দ্রুত বকেয়া বিল পরিশোধের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের আস্থা অর্জন করতে না পারে এবং নিয়মিত তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে এই হাহাকার আরও দীর্ঘায়িত হবে।
সোমবারের আবহাওয়া ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উত্তরের জেলাগুলো থেকে শুরু করে দক্ষিণের উপকূলীয় এলাকা—সবখানেই মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারছে না, হাসপাতালে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কলকারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে। সাধারণ মানুষের একমাত্র দাবি—দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো এবং লোডশেডিংয়ের এই বিভীষিকা থেকে মুক্তি দেওয়া। সরকার কি পারবে এই চরম সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে? নাকি আরও বড় কোনো বিপর্যয় অপেক্ষা করছে, সেই প্রশ্নই এখন সব মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর