• মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩২ পূর্বাহ্ন
Headline
১২ নভেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথে যাবে না সরকার: আইনমন্ত্রী ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা করের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন ‘লেডি মীর জাফর’ বলে ফেসবুকে পোস্ট: ডিএজির বিরুদ্ধে রুমিন ফারহানার অভিযোগ ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন: উত্তরে জামায়াতের প্রার্থী সেলিম, দক্ষিণে সাদিক দেশের বিমা খাতে বিশাল অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি হয়েছে: অর্থমন্ত্রী সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন, প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরবে কাল থেকে : প্রধানমন্ত্রী প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

লোহিত সাগরের বুকে নতুন সমীকরণ: হুতিদের অপ্রতিরোধ্য উত্থান ও পরাশক্তির অসহায়ত্ব

Reporter Name / ৪ Time View
Update : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম প্রধান স্নায়ুকেন্দ্র লোহিত সাগর এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালি আজ এক অভাবনীয় ভূকৌশলগত সংকটের মুখোমুখি। একসময় যে জলপথের নিয়ন্ত্রণ ছিল বিশ্বের বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর হাতে, আজ তা ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উঠে আসা একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অত্যাধুনিক রণতরি, যুদ্ধবিমান এবং বিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেটের অধিকারী হয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যেন এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সামনে এক প্রকার অসহায়ত্ব বরণ করছে। একটি অতি সাধারণ পাহাড়ি শিয়া মিলিশিয়া থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপথ পাল্টে দেওয়ার মতো বৈশ্বিক সামরিক শক্তিতে হুতিদের এই রূপান্তর আধুনিক সামরিক ইতিহাসের এক অন্যতম বড় বিস্ময়।

বৈষম্যের ছাই থেকে সশস্ত্র উত্থানের জন্ম

হুতিদের আজকের এই অপ্রতিরোধ্য শক্তির শেকড় লুকিয়ে আছে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং শিয়া মতাদর্শের একটি নির্দিষ্ট ধারার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মধ্যে। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলীয় সা’দা প্রদেশে জায়েদি শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে এক গভীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জাগরণ শুরু হয়। জায়েদিরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উত্তর ইয়েমেন শাসন করলেও, ১৯৬২ সালের বিপ্লবের পর তাদের সেই ঐতিহাসিক প্রতিপত্তি ম্লান হতে শুরু করে। বিশেষ করে সৌদি আরবের পৃষ্ঠপোষকতায় সালাফি মতাদর্শের ব্যাপক বিস্তার জায়েদিদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও পরিচয়ের জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
এই চরম বঞ্চনা ও অস্তিত্ব সংকটের প্রেক্ষাপটেই হুসেইন আল-হুতি নামের এক ক্যারিশম্যাটিক ধর্মীয় নেতার হাত ধরে ‘বিশ্বাসী তারুণ্য’ বা ‘আল শাবাব আল মুমিন’ নামক একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রাথমিকভাবে সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল জায়েদি শিক্ষার পুনরুজ্জীবন ও সাংস্কৃতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ইয়েমেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর সরকারের দুর্নীতি এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি নীতির প্রতি তাদের প্রকাশ্য ক্ষোভ এই আন্দোলনকে একটি রাজনৈতিক ও সশস্ত্র রূপ দেয়। ২০০৪ সালে সালেহ সরকার হুসেইন আল-হুতিকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে হত্যা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হুসেইন আল-হুতির মৃত্যুর পর এই আন্দোলনের নেতৃত্ব তার ভাই আবদুল মালিক আল-হুতির হাতে অর্পিত হয় এবং আনুষ্ঠানিক নাম ‘আনসারাল্লাহ’ হলেও বিশ্ববাসীর কাছে তারা ‘হুতি’ নামেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। ২০১৪ ও ২০১৫ সালের মধ্যে রাজধানী সানা দখলের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করে যে, তারা আর কেবল একটি বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী নেই, বরং রাষ্ট্রের সমান্তরাল এক প্রবল শক্তি।

অসম যুদ্ধের ময়দান ও সামরিক সক্ষমতার বিবর্তন

হুতিদের সামরিক শক্তির আজকের যে প্রতাপ, তা রাতারাতি গড়ে ওঠেনি; বরং ইয়েমেনের বছরের পর বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধই তাদের জন্য এক নিখুঁত সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্র হিসেবে কাজ করেছে। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট যখন হুতিদের নির্মূল করার লক্ষ্যে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও বিপুল সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে ইয়েমেনে আক্রমণ চালায়, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এই গোষ্ঠীর পতন কেবল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডকে নিজেদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে হুতিরা এক দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
শুরুর দিকে তাদের সমরাস্ত্রের ভান্ডার ছিল অত্যন্ত সাধারণ—হালকা অস্ত্র, রকেট প্রোপেলড গ্রেনেড এবং মর্টার। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতায় তারা খুব দ্রুত নিজেদের কৌশল ও অস্ত্রের ধরনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। তারা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম আত্মঘাতী ড্রোন, নজরদারি ড্রোন এবং জাহাজবিধ্বংসী অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করতে শুরু করে। তাদের এই সামরিক রূপান্তরের পেছনে বিদেশি প্রযুক্তিগত সহায়তার পাশাপাশি ইয়েমেনের ভূতপূর্ব সরকারি বাহিনীর লুণ্ঠিত অস্ত্রাগারের বিশাল অবদান রয়েছে। ২০১৪ সালে সানা দখলের পর রাষ্ট্রীয় সামরিক স্থাপনা থেকে বিপুল পরিমাণ ভারী অস্ত্র তাদের হস্তগত হয়, যা তাদের সামরিক সক্ষমতাকে এক লাফে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

সমরাস্ত্রের উৎস ও আঞ্চলিক ভূকৌশলগত সমীকরণ

হুতিদের কাছে এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে পৌঁছায়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তর গবেষণা ও বিতর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলগুলোর মতে, হুতিদের এই সামরিক উত্থানের নেপথ্যে প্রধান কারিগর হলো ইরান। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হুতিদের অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা প্রদান করে আসছে। ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান—পশ্চিমে লোহিত সাগর এবং দক্ষিণে বাব এল-মান্দেব প্রণালি—ইরানের জন্য এক অমূল্য কৌশলগত সম্পদ। ইয়েমেনে নিজেদের প্রভাব বলয়ে থাকা শক্তিশালী মিত্রের উপস্থিতি ইরানকে দূর থেকেই তার চিরশত্রু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সৌদি আরবের ওপর চরম ভূকৌশলগত চাপ সৃষ্টির সুযোগ করে দিয়েছে।
তবে হুতিদের কেবল ইরানের একটি আজ্ঞাবহ ‘প্রক্সি’ বা পুতুল মনে করাটা চরম ভুল হবে। তাদের নিজস্ব ইয়েমেনকেন্দ্রিক সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে এবং তাদের ধর্মীয় পরিচয়ও ইরানের প্রচলিত শিয়া মতবাদের সঙ্গে পুরোপুরি অভিন্ন নয়। ইরান থেকে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড বা নেভিগেশন সিস্টেম এলেও, আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তারা বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক বাজার থেকেও প্রযুক্তি সংগ্রহ করে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তারা বিদেশের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না থেকে স্থানীয় কারিগর ও প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ইয়েমেনের মাটিতেই এসব যন্ত্রাংশ সংযোজন করে প্রাণঘাতী অস্ত্র তৈরির এক নিজস্ব ইকোসিস্টেম বা সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।

কেন পরাশক্তিগুলো পেরে উঠছে না?

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী নিয়ে লোহিত সাগরে উপস্থিত থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা হুতিদের ঠেকাতে কার্যত ব্যর্থ হচ্ছে। এর মূল কারণ হলো ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ বা অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ারের চরম অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতা। একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান তৈরি এবং তা পরিচালনা করতে একটি রাষ্ট্রকে বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়। হুতিদের সেই সক্ষমতা নেই, কিন্তু তারা মাত্র কয়েক হাজার ডলার ব্যয়ে তৈরি একটি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে এমন এক ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেছে, যা ঠেকাতে প্রতিপক্ষকে মিলিয়ন ডলারের ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হচ্ছে। সামরিক অর্থনীতির এই অদ্ভুত সমীকরণে বৃহৎ পরাশক্তিগুলো ক্রমাগত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
এছাড়া হুতিদের সঙ্গে লড়াই করা প্রচলিত কোনো রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করার মতো নয়। তাদের কোনো নির্দিষ্ট বা সুসংগঠিত বিশাল সামরিক ঘাঁটি নেই যা বোমারু বিমান দিয়ে এক নিমিষেই গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। তাদের সামরিক অবকাঠামো অত্যন্ত বিকেন্দ্রীকৃত, যা ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি গুহা এবং বেসামরিক লোকালয়ের গভীরে লুক্কায়িত। ফলে পশ্চিমা দেশগুলো বিমান হামলা চালিয়ে কয়েকটি ড্রোন কারখানা বা ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম ধ্বংস করতে পারলেও, তাদের সামগ্রিক আক্রমণ কাঠামোকে বিন্দুমাত্র পঙ্গু করতে পারছে না।
সবশেষে, তাদের ভৌগোলিক অবস্থানই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। বাব এল-মান্দেবের মতো বিশ্ববাণিজ্যের এক সরু ও সংবেদনশীল গলার কাছে বসে তারা আক্ষরিক অর্থেই বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে ফেলেছে। গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলমুখী বা পশ্চিমা মালিকানাধীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলো লক্ষ্য করে তাদের ধারাবাহিক হামলার কারণে আজ গ্লোবাল শিপিং রুটগুলো আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে বিশ্বব্যাপী পরিবহন খরচ বাড়ছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হচ্ছে। হুতিরা আজ শুধু ইয়েমেনের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী নয়; দীর্ঘদিনের গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, দুর্গম ভূপ্রকৃতির সুবিধা এবং অপ্রতিসম সামরিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণে তারা এমন এক অদম্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা মোকাবিলা করার কোনো সহজ বা দ্রুত সমাধান পরাশক্তিগুলোর হাতে এই মুহূর্তে নেই।

 

তথ্যসূত্র: ঢাাকা স্ট্রিম, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ, রয়টার্স, আল জাজিরা ও বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category