ব্যস্ত রাজধানীর রাজপথে প্রতিদিন লাখ লাখ চাকা ঘোরে। সেই চাকার ঘূর্ণনে সচল থাকে মেগাসিটির মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের যাতায়াত। তবে এই চাকার পেছনে ঢাকা পড়ে থাকে হাজারো খেটে খাওয়া মানুষের কান্না, দীর্ঘশ্বাস আর চরম অনিশ্চয়তার গল্প। ঢাকার অনিয়ন্ত্রিত রিকশা খাতকে ঘিরে প্রতিদিন যে বিশাল অঙ্কের লেনদেন হচ্ছে, তার পুরো সুফল চলে যাচ্ছে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী মালিক ও গ্যারেজ সিন্ডিকেটের পকেটে। অন্যদিকে, দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে ঢাকার রিকশাচালকদের জীবন থমকে আছে কেবলই ‘পেটে ভাতে’ বেঁচে থাকার আদিম লড়াইয়ে। কম বিনিয়োগে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাচ্ছেন মালিকরা, আর দুর্ঘটনার ঝুঁকি, শারীরিক অসুস্থতা ও ছিনতাইকারীর আতঙ্ক সঙ্গী করে অন্ধকার এক চক্রে হাবুডুবু খাচ্ছেন চালকেরা।
রাজধানীর অলিতে-গলিতে রিকশার প্যাডেল ঘোরানো বা ব্যাটারিচালিত যানের হাতল চেপে ধরা অধিকাংশ চালকেরই অতীত জীবন সুখকর ছিল না। মফস্বল বা দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে আসা এসব মানুষের কেউ ছিলেন প্রান্তিক কৃষক, কেউ বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। গ্রামীণ অর্থনীতিতে মহাজনদের চড়া সুদের ঋণের জালে আটকে কিংবা ব্যবসায়িক লোকসানের মুখে পড়ে ভিটেমাটি ও পুঁজি হারিয়েছেন অনেকে। সংসারের বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী আর সন্তানদের মুখে দুমুঠো অรร্ন তুলে দেওয়ার শেষ তাগিদে তারা বেছে নিয়েছেন এই ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমবাজার। কিন্তু রাজপথ তাদের সেই ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার বদলে উপহার দিচ্ছে প্রতিদিনের নতুন এক নীরব যুদ্ধ। দুপুরের কড়া রোদ কিংবা মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেও এক বেলার খাবার জোটাতে তাদের লড়তে হয় নির্মম বাস্তবতার সাথে।
রিকশা চালানোর পেছনে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক খড়্গটি আসে গ্যারেজ মালিকদের কাছ থেকে। প্রতিদিন ভোরবেলা রিকশা নিয়ে বের হওয়ার পর একজন চালকের মাথায় প্রথম যে চিন্তাটি ভর করে, তা হলো মালিকের দৈনিক জমা বা ভাড়া। এলাকাভেদে এই জমার পরিমাণ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাটারি চার্জিং বাবদ দিতে হয় অতিরিক্ত অর্থ। এর বাইরে চালকদের গ্যারেজের অস্বাস্থ্যকর, ছারপোকায় ভরা ঢালা বিছানায় থাকার জন্য গুনতে হয় আলাদা টাকা। কোনো কারণে সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ডাম্পিং বা জরিমানার মুখে পড়লে, তার পুরো দায়ভারও এসে পড়ে চালকের ওপর। অথচ একজন মালিকের অধীনে যদি ন্যূনতম transatlantic ১০টি রিকশাও থাকে, তবে কোনো শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই তার দৈনিক নিশ্চিত আয় ৫ হাজার টাকা। এই অনিয়ন্ত্রিত মালিকানা ও দ্রুত মুনাফা লোটার প্রবণতায় মালিকেরা স্বল্প সময়ে ফুলে-ফেঁপে উঠলেও চালকদের ভাগ্যের চাকা বরাবরই একই জায়গায় ঘূর্ণায়মান থাকে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা এবং অর্থনীতিবিদদের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। একজন চালক যদি দৈনিক গড়ে ১৫০০ টাকা আয় করেন, তবে ২০ লাখ রিকশা থেকে দৈনিক সামগ্রিক আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থপ্রবাহের হিসাব করলে দেখা যায়, মাসে এই খাতে প্রায় ৯ হাজার কোটি এবং বছরে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল এক সমীকরণ কাজ করছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল অর্থনৈতিক প্রবাহের পুরোটাই চলছে সম্পূর্ণ সরকারি হিসাব, ট্যাক্স ও নিবন্ধনের বাইরে। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে এর সরাসরি কোনো হিস্যা না থাকলেও স্থানীয় চালক ও সাধারণ মানুষের পকেট কেটে এই বিশাল বাণিজ্য টিকিয়ে রেখেছে একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট। এই খাতের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থা থেকে যারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, মূলত তারাই এটিকে কোনো নিয়মতান্ত্রিক বা আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে বরাবরই বাধা সৃষ্টি করছেন।
বেছি লাভের আশায় অনেক মালিক সাধারণ প্যাডেলচালিত রিকশাকেই কোনো ধরনের কারিগরি অনুমোদন বা নিরাপত্তা মানদণ্ড ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে যান্ত্রিক বা ব্যাটারিচালিত যানে রূপান্তর করছেন। প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার চেয়ে আর্থিক লাভকেই মুখ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্রেক বা কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই যানগুলো প্রায়শই ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে প্রধান সড়কগুলোতে এদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল সাধারণ পথচারী ও যাত্রীদের জন্য চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাকার গতি বাড়লেও এর সাথে সাথে বাড়ছে পঙ্গুত্ব বরণের হার। দুর্ঘটনাজনিত কারণে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) প্রতিনিয়ত রিকশা দুর্ঘটনার শিকার রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
এটি শুধু একটি গণপরিবহন সংকট নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে জনস্বাস্থ্যের এক মারাত্মক বিপর্যয়। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে একই ভঙ্গিতে একটানা বসে এই যান্ত্রিক রিকশা চালানোর কারণে চালকদের মধ্যে স্থায়ী কোমর ব্যথা, ক্রনিক ক্লান্তি, স্থূলতা এবং মেরুদণ্ডজনিত জটিল সমস্যার ঝুঁকি চরম মাত্রায় দেখা দিচ্ছে। শারীরিক তীব্র পরিশ্রমের বিপরীতে পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব তাদের শরীরকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় সংকট হলো, এই বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক সুরক্ষা বা স্বাস্থ্য বীমা নেই। ফলে কোনো চালক একদিন অসুস্থ হয়ে ঘরে বসে থাকলে সেদিনের জন্য তার পুরো পরিবারের উনুন জ্বলা বন্ধ হয়ে যায়। একবার বড় কোনো দুর্ঘটনায় পড়লে জমানো সামান্য অর্থটুকু নিমেষেই উধাও হয়ে যায়, যা তাদের ঠেলে দেয় নতুন কোনো ঋণের অতল গহ্বরে।
রিকশাচালকদের জীবনের অন্যতম অন্ধকার দিক হলো রাতের বেলার নিরাপত্তা ঝুঁকি। ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ার চিরন্তন ভয়ের পাশাপাশি রাতের বেলা যুক্ত হয় সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের অমানবিক আতঙ্ক। রাত যত গভীর হয়, রাস্তাগুলো এই নিঃসংশ চালকদের জন্য ততটাই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। প্রায় প্রতি মাসেই রিকশা চুরি, ছিনতাই এবং চালককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। অনেক সময় ছিনতাইকারীরা যাত্রীবেশে রিকশা ভাড়া করে নির্জন এলাকায় নিয়ে চালকের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। কেবল একটি ব্যাটারি বা রিকশা কেড়ে নেওয়ার জন্য চালককে নির্মমভাবে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না অপরাধীরা। আবার উল্টো পিঠে, অনেক সময় অপরাধ চক্রের সদস্যরা অসহায় চালকদের জিম্মি করে বা ভয় দেখিয়ে রিকশাটিকে অপরাধের কাজে বা পালিয়ে যাওয়ার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করে, যেখানে চালকদের করার কিছুই থাকে না।
অর্থনীতিবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই খাতটিকে পুরোপুরি উচ্ছেদ করা বা রাস্তা থেকে হুট করে মুছে ফেলা কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। কারণ এর সাথে লাখ লাখ মানুষের রুটি-রুজির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সমাধান লুকিয়ে আছে একটি পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার মধ্যে। যদি বিভিন্ন রুটে রিকশা চলাচলের সুনির্দিষ্ট রুট, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং কঠোর লাইসেন্সিং বা জবাবদিহিতার ব্যবস্থা চালু করা যায়, তবে এটি নগর অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার বদলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিদিনের জমাভিত্তিক শোষণের কারণে চালকেরা দীর্ঘমেয়াদে কোনো সঞ্চয় গড়তে পারছেন না। তাই রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে এই অদৃশ্য অর্থনীতিকে দৃশ্যমান ও আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে। যতক্ষণ না এই চালকদের ন্যায্য মজুরি, কর্মঘণ্টা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত চাকার নিচে পিষ্ট হতে থাকবে জীবনের সব রঙিন স্বপ্ন; আর দিনশেষে তা শুধুই পেটে ভাতের এক অন্তহীন হাহাকার হয়ে রাজপথে প্রতিধ্বনিত হবে।
তথ্যসূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন