• শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৪০ অপরাহ্ন

সরকারি খাতে কোথায় কত ঘুষ: ৮০৪টি অভিযোগে ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকার দাবি

Reporter Name / ২ Time View
Update : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬

বাংলাদেশের সরকারি সেবা খাতের প্রতিটি স্তরে ঘুষ ও অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের উপস্থিতি একটি ওপেন সিক্রেট বা সর্বজনবিদিত বিষয় হলেও এর কোনো সুনির্দিষ্ট উন্মুক্ত পরিসংখ্যান বা সমন্বিত খতিয়ান সাধারণ মানুষের হাতে থাকে না। সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকরা ঠিক কোন টেবিলে, কোন সেবার বিপরীতে কত টাকা দাবির মুখোমুখি হচ্ছেন—সেই তথ্য না জানার কারণে সাধারণ মানুষ প্রায়শই জিম্মি হয়ে পড়েন। তথ্যের এই গভীর শূন্যতা পূরণ এবং দেশজুড়ে সেবা খাতে চলা ঘুষ দাবির সামগ্রিক ধরন বা ‘প্যাটার্ন’ জনসমক্ষে উন্মোচনের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছে একটি নতুন নাগরিক ক্রাউডসোর্সিং প্ল্যাটফর্ম—‘ঘুষসাইট’ (www.ghush.site)। গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া এই ব্যতিক্রমী ওয়েবসাইটে দেশের যেকোনো প্রান্তের নাগরিক কোনো ধরনের অ্যাকাউন্ট তৈরি বা ব্যক্তিগত নাম-পরিচয় প্রকাশ না করেই তাদের সঙ্গে ঘটা ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ বেনামে নথিভুক্ত করতে পারছেন।
প্ল্যাটফর্মটির মূল বার্তা বা স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে—‘দপ্তরের নাম বলুন, দাবিকৃত টাকার কথা লিখুন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম-পরিচয় গোপন রাখুন’। ভারতের ‘bribes.fyi’ নামক একটি সমজাতীয় ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে বাংলাদেশের দুই তরুণ উদ্যোক্তা সাইফ কবির ও সাহেদ শরীফ মাত্র এক দিনের যৌথ প্রচেষ্টায় এর বাংলাদেশি সংস্করণটি তৈরি করেন। প্ল্যাটফর্মটি চালু হওয়ার পরপরই সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কার্যক্রম শুরুর মাত্র দুই দিনের মাথায় সাইটটিতে মোট ৮০৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যেখানে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এর আগে প্রাথমিক পর্যায়ে জমা পড়া ৪৫৮টি রিপোর্টে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকার ঘুষ দাবির তথ্য দেখা গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়ে ৮০৪টিতে রূপ নেয়।
জমা পড়া এই ৮০৪টি অভিযোগের বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে রাজধানী ঢাকা থেকেই সবচেয়ে বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। ঢাকা বিভাগ থেকে জমা হওয়া মোট অভিযোগের সংখ্যা ৪৩০টি। এরপরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখান থেকে এসেছে ১৬৭টি অভিযোগ। এছাড়া রাজশাহী বিভাগ থেকে ৪৪টি, খুলনা বিভাগ থেকে ৪৩টি, সিলেট বিভাগ থেকে ৩৮টি, রংপুর বিভাগ থেকে ৩৭টি, ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে ৩০টি এবং বরিশাল বিভাগ থেকে ১৫টি ঘুষের অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছে। একটি ইতিবাচক দিক হলো, প্ল্যাটফর্মে অভিজ্ঞতা শেয়ার করা অভিযোগকারীদের মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন যে অন্যায্য আর্থিক দাবির মুখে তারা সরাসরি ঘুষ দিতে অস্বীকার করেছেন এবং বিকল্প বা আইনি পথ অনুসরণের চেষ্টা করেছেন।
ওয়েবসাইটটির সার্বিক কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত সহজ ও ব্যবহারবান্ধব করে তৈরি করা হয়েছে, যাতে একজন সাধারণ সেবাগ্রহীতা দুই মিনিটেরও কম সময়ে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারেন। একজন ব্যবহারকারীকে মূলত পাঁচটি নির্দিষ্ট তথ্য প্রদান করতে হয়: সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, অফিসের আনুমানিক ভৌগোলিক অবস্থান, ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের সুনির্দিষ্ট অঙ্ক এবং ঘুষ চাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত কী পরিণতি হয়েছিল। ব্যবহারকারীরা চাইলে অভিজ্ঞতার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনাও যুক্ত করতে পারেন। তবে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত নাম, পদবি, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র নম্বর বা ফোন নম্বর উল্লেখ না করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর নীতিমালা বজায় রাখা হয়েছে।
ওয়েবসাইটে জমা পড়া কোনো তথ্য সরাসরি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। তথ্য জমা দেওয়ার পর তা একটি স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলভিত্তিক মডারেশন বা পরিমার্জন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। এই স্বয়ংক্রিয় ফিল্টারটি বিবরণী থেকে যে কোনো ব্যক্তির নাম, ফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, নির্দিষ্ট ফাইলের নম্বর, আপত্তিকর বা আক্রমণাত্মক ভাষা এবং স্প্যাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলে। এরপর সম্পূর্ণ নাম-পরিচয়হীন অবস্থায় কেবল দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, অবস্থান, টাকার পরিমাণ ও ফলাফলের বিবরণীটি উন্মুক্ত পাবলিক লেজারে যুক্ত হয়। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন যে, প্রতিটি রিপোর্ট সশরীরে বা ম্যানুয়ালি যাচাই করার মতো বিপুল জনবল না থাকায় এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমেই তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
তবে উদ্যোক্তারা শুরু থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কোনো তথ্যকে আদালতের চূড়ান্ত প্রমাণ বা কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত রায় হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। সাইটে প্রদর্শিত প্রতিটি তথ্যের সঙ্গে স্পষ্টভাবে ‘আনভেরিফায়েড’ বা অযাচাইকৃত শব্দটি উল্লেখ থাকে। এই প্ল্যাটফর্মটি কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত সংস্থা কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিকল্প নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিচ্ছিন্নভাবে থাকা ঘুষের অভিজ্ঞতাগুলোকে এক ছাদের নিচে এনে একটি উন্মুক্ত পাবলিক রেকর্ড বা লেজার তৈরি করা। উদ্যোক্তা সাইফ কবিরের মতে, একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দাবি করা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে; কিন্তু একই দপ্তরের একটি নির্দিষ্ট সেবার জন্য যখন বহু মানুষ প্রায় সমপরিমাণ টাকা দাবির কথা নথিবদ্ধ করেন, তখন তা একটি কাঠামোগত প্যাটার্নে রূপ নেয়—যা অস্বীকার করা কঠিন।
ওয়েবসাইটটি সম্পূর্ণভাবে এর দুই নির্মাতার নিজস্ব অর্থায়নে এবং আগ্রহী ব্যবহারকারীদের স্বেচ্ছা অনুদানে পরিচালিত হচ্ছে। এর সঙ্গে কোনো এনজিও বা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন নেই। নির্মাতাদের প্রত্যাশা, সরকারি সেবা নিতে যাওয়ার আগে এই উন্মুক্ত খতিয়ান দেখে সাধারণ মানুষ যেন আগে থেকেই অন্যায্য দাবির বিষয়টি অনুমান করতে পারেন এবং সাহসের সাথে অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। একই সঙ্গে গবেষক, অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং সুশাসন নিয়ে কাজ করা নীতি-নির্ধারকদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ধারা বুঝতে এই উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক মাধ্যম হয়ে উঠবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category