দেশের প্রশাসনিক সংস্কার ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একগুচ্ছ নজিরবিহীন ও কঠোর প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার যেকোনো ধরণের রাজনৈতিক প্রতীক ও স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলতে মন্ত্রণালয়ের পুরোনো নথিপত্রে থাকা ছবি ও লোগোসম্বলিত সমস্ত নথি কাভার আমূল পরিবর্তন করে নতুন নথি কাভার ব্যবহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সাথে দাপ্তরিক গোপনীয়তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা, সর্বস্তরে ডিজিটাল নথি নম্বর প্রবর্তন করা, সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখায় নতুন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, দীর্ঘদিনের অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তি, ঝুলে থাকা বিভাগীয় মামলাগুলোর নিষ্পত্তি এবং মন্ত্রণালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে একাধিক সুনির্দিষ্ট ও কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গত জুন মাসের অভ্যন্তরীণ বার্ষিক সমন্বয় সভায় এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যার সভার কার্যবিবরণী সূত্র থেকে সম্প্রতি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
গত ২৫ জুন সকালে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো। নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এই নীতি নির্ধারণী অভ্যন্তরীণ সমন্বয় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জানানো হয় যে, সরকারি দাপ্তরিক কাজের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা এবং কম্পিউটারে সংরক্ষিত সব ধরণের সংবেদনশীল তথ্যের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইতিমধ্যে জোরালো কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দাপ্তরিক তথ্যের গোপনীয়তা কঠোরভাবে বজায় রাখতে হবে। নতুন প্রণীত সচিবালয় নির্দেশমালা-২০২৪ অনুযায়ী প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নথির প্রধান তত্ত্বাবধানকারী হিসেবে সমস্ত নথি ও গুরুত্বপূর্ণ পত্র আদান-প্রদানসহ সব ধরণের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এখন থেকে যেকোনো নথি ও পত্র আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে মুভমেন্ট রেজিস্টার খাতার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না।
মন্ত্রণালয়ের পুরোনো নথিপত্রে থাকা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার ছবি ও লোগোযুক্ত সমস্ত কাগজের নথি কাভার অবিলম্বে পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ নতুন ও নিরপেক্ষ নথি কাভার ব্যবহার করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের সব শাখা ও অধিশাখায় নতুন সচিবালয় নির্দেশমালা-২০২৪ অনুযায়ী আধুনিক ডিজিটাল নথি নম্বর ব্যবহার করাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়ই নয়, বরং মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন দেশের সব বিভাগীয় দপ্তর ও অধীনস্থ সংস্থাকেও এই একই ডিজিটাল নথি নম্বর ব্যবহারের জন্য জরুরি নির্দেশ জারি করতে বলা হয়েছে। আদালতে বিচারিক কাজের জন্য কোনো মূল নথি পাঠানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাধ্যতামূলকভাবে সেই নথির একটি নিখুঁত ছায়ালিপি বা ফটোকপি নিজেদের দপ্তরে সংরক্ষণ করবেন এবং আদালত থেকে যথাসময়ে সেই মূল নথিটি ফেরত আনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এ ছাড়া নথির সার্বিক সুরক্ষার স্বার্থে সব শাখার উপযুক্ত স্থানে দ্রুত সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী, গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৪-কে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং সিসি ক্যামেরার মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করে প্রতি মাসের সম্পূর্ণ ফুটেজ বাধ্যতামূলকভাবে সিডিতে সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে।
প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি এই সমন্বয় সভায় মন্ত্রণালয়ের আর্থিক খাতকে স্বচ্ছ করতে অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে। সভায় অতিরিক্ত সচিব (অডিট) জানান যে, মন্ত্রণালয়ের বকেয়া অডিট আপত্তিগুলো যথাসময়ে নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সভার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পূর্ত অডিট অধিদপ্তরের সঙ্গে দাপ্তরিক যোগাযোগ বহুগুণ বাড়াতে হবে। অডিটসংক্রান্ত যেকোনো ধরণের আর্থিক দুর্নীতি বা অনিয়ম চিহ্নিত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অডিট আপত্তিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং গুরুতর আর্থিক দুর্নীতির ক্ষেত্রে সরাসরি মামলা দায়ের করতে হবে।
এই অডিট ব্যবস্থাকে আরও সক্রিয় ও প্রো-অ্যাকটিভ করতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা পরিদপ্তরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে নিয়মিত পূর্ত অডিটের বিশেষ সভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া দেশের সব আঞ্চলিক দপ্তর ও সংস্থায় মন্ত্রণালয় থেকে নিয়মিত অডিট টিম পাঠানো হবে এবং অডিট দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে অতিরিক্ত সচিব প্রতি ২০ দিনে একটি বিশেষ ক্রস প্রোগ্রাম গ্রহণ করবেন। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক) অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা পরিদপ্তরের করা অডিটে অতীতে কী কী গুরুতর আপত্তি দেওয়া হয়েছিল এবং সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণী আগামী সভায় উপস্থাপনের জন্য কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় এবং অধীনস্থ দপ্তরগুলোর প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ তদন্তের বিষয়ে প্রশাসন শাখা-১ সভায় জানায় যে, নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চলছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন ও শাস্তিমূলক সুপারিশগুলো আরও সুনির্দিষ্ট ও মানসম্মত হওয়া প্রয়োজন বলে সভায় নীতিনির্ধারকেরা মত প্রকাশ করেন। এই প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত হয় যে, অনিষ্পন্ন বিভাগীয় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখন থেকে মানসম্মত ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশসহ চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন। সব অধিশাখা ও শাখাকে চলমান মামলার সুস্পষ্ট ও হালনাগাদ রিপোর্ট দিতে হবে এবং দুই মাসের বেশি সময় ধরে অনিষ্পন্ন থাকা তদন্তের প্রতিবেদন দ্রুত জমা দিতে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের লিখিত তাগিদ দিতে হবে। মন্ত্রণালয় এবং দপ্তর-সংস্থার সমস্ত বিভাগীয় মামলা অনতিবিলম্বে নিষ্পত্তি করতে হবে এবং আগামী সভায় চলমান বিভাগীয় মামলার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করতে হবে। এ ছাড়া এক বছরের বেশি পুরোনো এবং ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলমান বিভাগীয় মামলার সঠিক ও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান আগামী অভ্যন্তরীণ সমন্বয় সভার আগেই সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভার শেষ অংশে মন্ত্রণালয়ের সার্বিক ভৌত নিরাপত্তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের সব শাখা, অধিশাখা ও অনুবিভাগের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। দাপ্তরিক কাজ শেষে বাড়ি ফেরার আগে সব বৈদ্যুতিক লাইট, ফ্যান ও এসির সুইচ বন্ধ রাখতে হবে এবং অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের জাতীয় নীতি অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী ও দায়িত্বশীল আচরণ করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সভার সমাপনী বক্তব্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো। নজরুল ইসলাম বলেন, দেশের স্বার্থে এবং এই ঐতিহাসিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে প্রতিটি স্তরের সরকারি কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ সততা, কঠোর সময়ানুবর্তিতা, আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট