চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজপথে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অবসানের দাবিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন। তখন দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনই ছিল সবার প্রধান প্রেরণা। সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের অন্যতম অগ্রভাগে থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। তবে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর দ্রুতই পাল্টাতে শুরু করে দেশের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সমীকরণ। পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর এবং দেশের প্রধান প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সেই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। রাজপথের সাবেক দুই সহযোদ্ধা সংগঠন এখন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, আবাসিক হল নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বাকযুদ্ধ এবং দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় জুলাই-পরবর্তী ক্যাম্পাস রাজনীতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে গভীর সংশয় ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
পটপরিবর্তনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের অবসান ঘটলেও শূন্যস্থান পূরণে নতুন মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবাসিক হলগুলোতে রাজনীতি নিষিদ্ধের পরিপত্র জারি করলেও ভেতরে ভেতরে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পটভূমিতে গড়ে ওঠা অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি সংহত করার তৎপরতা শুরু করে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে আত্মগোপন ভেঙে ঢাবি ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রকাশ্যে আসা এবং পরবর্তীতে ডাকসুসহ বিভিন্ন হল সংসদ নির্বাচনে দলটির নিরঙ্কুশ জয় ক্যাম্পাসের ক্ষমতার ভারসাম্যকে এক নতুন বাস্তবতায় দাঁড় করায়। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষ বিদ্যাপীঠগুলোর ছাত্র সংসদে ছাত্রশিবিরের এই জয়জয়কারকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতির সমান্তরালে ছাত্ররাজনীতিতেও আধিপত্য রক্ষার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। অন্যদিকে কেন্দ্রে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রদলও দেশব্যাপী ক্যাম্পাসগুলোতে তাদের হারানো প্রভাব ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে থাকে, যা সংগঠন দুটির মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বকে প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ দেয়।
দুই সংগঠনের মধ্যকার বিরোধ কেবল আদর্শিক বা তাত্ত্বিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা একের পর এক বাস্তব ঘটনার মধ্য দিয়ে সংঘাতময় রূপ ধারণ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলে প্রাধ্যক্ষের কক্ষে অপ্রীতিকর ঘটনা তদন্ত চলাকালীন হাতাহাতি, জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবমাননাকর পোস্টকে কেন্দ্র করে থানা ঘেরাও ও মারমুখী অবস্থান এবং ছাত্রদলের হল কমিটিতে বিতর্কিত সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের অন্তর্ভুক্তির পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পরিস্থিতিকে প্রতিনিয়ত উত্তপ্ত রেখেছে। এর বাইরে ২০২৪ সালের বুদ্ধিজীবী দিবসে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত নেতাদের ছবি প্রদর্শন নিয়ে বিতর্ক কিংবা টিএসসির প্রদর্শনীতে রাজনৈতিক পোস্টার ছেঁড়া ও নতুন ব্যানার সাঁটানোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষ বারবার মুখোমুখি হয়েছে। এমনকি ক্যাম্পাস এলাকায় ভাসমান দোকান থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগ কিংবা বড়পর্দায় ফুটবল খেলা দেখানো বন্ধ করার মতো আপাতদৃষ্টিতে ছোট ছোট ইস্যুগুলোও মুহূর্তের মধ্যে বৃহৎ রাজনৈতিক উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে, যা পক্ষদ্বয়ের মধ্যকার গভীর আস্থাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ।
ঢাকার এই উত্তাপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকার বাইরের অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত নেতাদের ছবি সংবলিত বিলবোর্ড স্থাপন এবং রাজনৈতিক স্লোগানকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এসব ঘটনায় বহিরাগত ক্যাডারদের সশস্ত্র মহড়া এবং আবাসিক হলগুলোতে দেশীয় অস্ত্র মজুদের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে উভয় সংগঠনই পাল্টাপাল্টি আক্রমণ ও প্রতিরোধের অজুহাত তুলে ক্যাম্পাসগুলোতে অস্থিতিশীল পরিবেশ জিইয়ে রাখছে। ঢাকা আলিয়া মাদরাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, যা প্রমাণ করে যে স্থানীয় বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং গোটা দেশজুড়েই ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের এক সর্বব্যাপী লড়াই চলছে।
উভয় সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব এই পরিস্থিতির জন্য পরস্পরের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের অবস্থান নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করছে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভিযোগ, ছাত্রশিবির নির্বাচিত ছাত্র সংসদের আড়ালে ক্যাম্পাস ও আবাসিক হলগুলোতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালিয়ে ছাত্রদল ও মূল দলকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। তাদের দাবি, ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন হিসেবে তারা ক্যাম্পাসে কোনো দখলদারিত্ব কায়েম করতে চায় না, বরং গণতান্ত্রিক সহাবস্থান ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা রক্ষায় কেবল বিরোধী পক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করছে। এর বিপরীতে ছাত্রশিবিরের বক্তব্য হলো, তারা শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়ে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। তাদের অভিযোগ, ছাত্রদল সরকারি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ক্যাম্পাসগুলোতে পুরনো দখলদারিত্ব, পেশিশক্তি ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি পুনরায় ফিরিয়ে আনার জন্য মরিয়া আচরণ করছে।
রাজনৈতিক এই আধিপত্যের লড়াইয়ের মাঝে সবচেয়ে অসহায় ও আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নামা লাখো সাধারণ তরুণের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল শিক্ষাঙ্গনে গেস্টরুম কালচার, জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে উপস্থিতি এবং মারামারির বিষাক্ত সংস্কৃতির স্থায়ী অবসান। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কেবল সংগঠনের ব্যানার ও মুখ বদল হলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা ও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ আজও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। বরং যেকোনো তুচ্ছ ঘটনায় ক্যাম্পাস বন্ধ হওয়া, হলের ভেতরে নিরাপত্তা শঙ্কা এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার ভয় তাদের তাড়া করে ফিরছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থান যদি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুণগত পরিবর্তনের এক বড় মাইলফলক হয়ে থাকে, তবে সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে হবে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে। ছাত্ররাজনীতির আসল লক্ষ্য যদি শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, মেধা বিকাশ ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি না হয়ে কেবল হল দখল, চাঁদাবাজি ও জাতীয় রাজনীতির পেশিশক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার হওয়া হয়, তবে ফ্যাসিবাদবিরোধী রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মূল চেতনা ভূলুণ্ঠিত হবে। ফ্যাসিবাদী কাঠামোর পতনের পর ক্ষমতা ও পরিচয়ের পালাবদল ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক রূপান্তর এখনও বহু দূর। ক্যাম্পাসের পবিত্র পরিবেশ রক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার সুরক্ষায় দলকানা আধিপত্যের রাজনীতি পরিহার করে সুস্থ, সহনশীল ও জবাবদিহিতামূলক ধারার ছাত্ররাজনীতি গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দাবি।