• সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৫৬ অপরাহ্ন
Headline
নুসরাত হত্যা মামলায় দুজনের ফাঁসি, চারজনের যাবজ্জীবন বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারকেও দায়িত্বশীল হতে হবে: জামায়াত আমির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় ক্লাবে পরিণত করেছে বিএনপি দেশে বেকার টাই-পরা লোকের সংখ্যা বাড়ছে: এনামুল হক ভূমিকে অর্থনৈতিক ও উন্নয়নগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে: পরিবেশমন্ত্রী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হুমায়ুন ও শামার দায়িত্ব বণ্টন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌদি রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ মেয়েদের জন্য সর্বজনীন উপবৃত্তি পুনর্বহালের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর আগের চেয়ে ভালো স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার প্রত্যাশা সিইসির সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কমিটি গঠনের নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

হাদি হত্যাকাণ্ডে রাজনৈতিক চক্রান্তের নতুন মোড়

Reporter Name / ৩ Time View
Update : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম অগ্রণী কণ্ঠস্বর এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একের পর এক নেপথ্যের চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক তথ্য বেরিয়ে আসছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের এই স্বতন্ত্র প্রার্থীর ওপর চালানো সশস্ত্র হামলাটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও ঠান্ডা মাথায় পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার সাম্প্রতিক বিশদ মূল্যায়নে প্রকাশ পেয়েছে যে কীভাবে দিনের পর দিন ছদ্মবেশে হাদির ওপর নজরদারি চালানো হয়েছিল, নিখুঁত সময়ে গুলি করে হত্যা নিশ্চিত করার পর কীভাবে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্রের মাধ্যমে সীমান্ত পাড়ি দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে প্রতিবেশী ভারতে পরিচয় গোপন করে আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত শীর্ষ রাজনৈতিক মদদদাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী ও আশ্রয়দাতাদের ভূমিকা এবং ভারতে আটক প্রধান শুটারদের দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সৃষ্ট আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতার বিষয়গুলোও তদন্তে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা প্রণয়ন ও অর্থায়নের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন যুবলীগের পলাতক নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পী। ঘটনার বেশ আগেই ভ্রমণ ভিসা নিয়ে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাড়ি জমান এই নেতা এবং পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় নিজের নাম-পরিচয় পরিবর্তন করে অবস্থান নেন। তিনি সেখানে নিজের নাম ‘মো. মহিদউদ্দিন চৌধুরী’ এবং পিতার নাম আংশিক পরিবর্তন করে স্থানীয় আধারকার্ড ও প্যানকার্ড তৈরি করে আত্মগোপনে থাকেন। বাপ্পীর প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও সমন্বয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদকে প্রধান শুটার এবং স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মোহাম্মদ আলমগীর শেখকে মোটরসাইকেল চালক হিসেবে ভাড়া করা হয়। হামলার অন্তত চার থেকে পাঁচ দিন আগে থেকেই শুটাররা রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ ভোটারের ছদ্মবেশ ধারণ করে হাদির নিরাপত্তা বলয়, চলাচলের রুট ও ব্যক্তিগত বৈঠকের ওপর টানা রেকি চালাতে থাকে। এমনকি সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে একটি ঘরোয়া বৈঠকেও ছদ্মবেশে তাদের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
ঘটনার দিন অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর দুপুরে পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে হাদির ওপর সেই নৃশংস হামলা চালানো হয়। মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় থেকেই মোটরসাইকেল নিয়ে হাদির পিছু নেয় ঘাতক চক্র। নামাজ শেষে তিনি যখন অটোরিকশায় ওঠেন, তখন যানজটের সুযোগ নিয়ে ডিআর টাওয়ারের সামনে দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে মোটরসাইকেলের পেছন থেকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে খুব কাছ থেকে ৭.২ বোরের রিভলবার দিয়ে হাদিকে গুলি করে ফয়সাল। মারাত্মক রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে দ্রুত উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল, পরে বেসরকারি হাসপাতাল এবং সর্বশেষ উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে স্থানান্তর করা হলেও ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হামলার পর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী মানব পাচারকারী ও চোরাচালান চক্রের সহায়তায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে খুনিরা অনায়াসে ভারতে প্রবেশ করে। সেখানে স্থানীয় ভারতীয় নেটওয়ার্কের সহায়তায় আত্মগোপনে থাকলেও পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে বিশেষ টাস্কফোর্সের হাতে ফয়সাল ও আলমগীর গ্রেপ্তার হয়।
মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রথম থেকেই নানা নাটকীয়তা লক্ষ করা গেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ মাত্র ২১ দিনের মাথায় তড়িঘড়ি করে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিলেও তাতে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করে হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চ। তাদের স্পষ্ট অভিযোগ ছিল যে মূল নির্দেশদাতা, রাজনৈতিক মাস্টারমাইন্ড ও অর্থদাতাদের আড়াল করতেই অত্যন্ত দায়সারা তদন্ত করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিবারের নারাজি আবেদনের ভিত্তিতে আদালত পুরো মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডির ওপর ন্যস্ত করেন। সিআইডি এই হত্যাকাণ্ডে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার পাশাপাশি ১২০(বি) বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারা যুক্ত করে সার্বিক নেটওয়ার্ককে উন্মোচনের চেষ্টা চালাচ্ছে। অস্ত্র সরবরাহ, গোপন আশ্রয় দেওয়া এবং অর্থায়নের অভিযোগে ফয়সালের স্ত্রীসহ একাধিক সহযোগীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তবে ভারতের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে বিলম্ব হওয়ায় সিআইডির প্রতিবেদন জমার সময়সীমা বারবার পিছিয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতে আটক দুই মূল আসামির আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের দ্বিপক্ষীয় বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি বিদ্যমান থাকলেও আসামিদের সরাসরি ফেরত আনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু জটিল আইনি বাধা তৈরি হয়েছে। ভারতের ভূখণ্ডে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পরিচয় জালিয়াতির দায়ে তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় আদালতে মামলা চলমান রয়েছে, যা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের হস্তান্তর প্রক্রিয়া আটকে আছে। এছাড়া বাংলাদেশের আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকায় ভারতীয় আদালতে সম্ভাব্য মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অপরাধের প্রশ্ন তুলে প্রত্যর্পণ ঠেকানোর চেষ্টা করা হতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। এই অচলাবস্থা ভাঙতে উচ্চপর্যায়ের জোর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং দুই দেশের আদালতের মধ্যস্থতায় সমন্বিত আইনি উদ্যোগের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বিলম্বিত হওয়াকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ও অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চ ইতোমধ্যে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করে অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে অনড় অবস্থান ব্যক্ত করেছে। তদন্ত ও বন্দি প্রত্যর্পণে দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দিলে বিরোধীরা একে সরকারের দুর্বলতা ও সদিচ্ছার অভাব হিসেবে চিহ্নিত করে বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনের ইস্যু বানিয়ে ফেলতে পারে বলে গোয়েন্দা সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে জাতীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনরোষ প্রশমনে হাদি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করে দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিত করাই এখন প্রধানতম অগ্রাধিকার।
তথ্যসূত্র: মানব জমিন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category