সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এক সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র। ঋণ অনুমোদন, প্রসেসিং ফি, অ্যাকাউন্ট সচল করা এবং জীবন বিমাসহ নানা অজুহাতে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ধাপে ধাপে টাকা আদায় করা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের জাল কেবল দেশেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিস্তৃত। প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা অর্থ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে অপরাধীরা ‘মানি মিউল অ্যাকাউন্ট’ নামক এক বিশেষ কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। সম্প্রতি এই ধরণের ঋণের ফাঁদে পড়ে রাজধানী ডেমরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করেছেন মো. আনিসুর রহমান নামের এক ভুক্তভোগী। তিনি ফেসবুকে একটি পেজের চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে ঋণের জন্য যোগাযোগ করলে, কথিত লোন অফিসার তাকে সাত লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়া বাবদ প্রথমে সাত হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে বলে।
টাকা পাঠানোর পরপরই প্রতারকেরা কৌশলে জানায় যে তার অ্যাকাউন্ট নম্বর ভুল হওয়ায় তা ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। সেই সমস্যা সমাধানের কথা বলে পরবর্তীতে আরও ৪৩ হাজার টাকা এবং সার্ভার জটিলতার অজুহাতে আরও ১২ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরদিন ঋণের মূল টাকাসহ জমা দেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও নির্দিষ্ট সময়ে কোনো টাকা না দিয়ে উল্টো জীবন বিমা বাবদ নতুন করে আরও বাইশ হাজার টাকা দাবি করা হয়। এতে আনিসুরের সন্দেহ হলে তিনি আর টাকা না পাঠিয়ে অফিসের ঠিকানা ও নিজের জমাকৃত অর্থ ফেরত চাইলে প্রতারকেরা তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে রমনা থানায় আরেকটি জিডি করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিপাহি মো. শহীদুল ইসলাম। তাকে দুই লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার নাম করে ফাইল প্রসেসিংয়ের কথা বলে প্রথমে বত্রিশ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে আরও অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকেও মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, প্রতারকচক্রগুলো ফেসবুক বুস্টিং, মোবাইল অ্যাপ, এসএমএস, ভুয়া ওয়েবসাইট এবং পেশাদার কল সেন্টারের ছদ্মবেশ ধারণ করে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। তারা অত্যন্ত সুপ্রশিক্ষিত এজেন্টের মতো কথা বলে শুরুতেই ভুক্তভোগীদের গভীর আস্থা অর্জন করে। ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এক ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, অনেক সময় চক্রগুলো প্রথমে ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকার মতো ছোট অঙ্কের ঋণ দিয়ে গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জন করে। পরবর্তীতে ওটিপি বা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড নেওয়ার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং গ্যালারি থেকে ব্যক্তিগত তথ্য, সংবেদনশীল ছবি ও ভিডিও চুরি করে। এরপর সেই ব্যক্তিগত কনটেন্টগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে দফায় দফায় ব্ল্যাকমেইল করে বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। এই চক্রে জড়িত অপরাধীদের বেশির ভাগের বয়স ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে এবং তারা কথাবার্তার মাধ্যমেই বুঝে নেয় কার কাছ থেকে কীভাবে টাকা হাতিয়ে নেওয়া সহজ হবে।
তদন্তে ‘মানি মিউল অ্যাকাউন্ট’ ব্যবহারের চাঞ্চল্যকর কৌশল উঠে এসেছে। প্রতারকেরা নিজেদের আসল পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখতে অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি ব্যবহার করে ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের অ্যাকাউন্ট খোলে। অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিরীহ মানুষদের অল্প কিছু টাকার লোভ দেখিয়ে এই অ্যাকাউন্টগুলো তৈরি করা হয়, যার আসল ব্যবহার সম্পর্কে মূল মালিকেরা বিন্দুমাত্র টের পান না। অপরাধের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় দ্রুত সরিয়ে নিতে এই অ্যাকাউন্টগুলো ব্যবহৃত হয়। পূর্বে এই ধরণের অপরাধ কেবল নির্দিষ্ট কিছু জেলা বা ফরিদপুরকেন্দ্রিক থাকলেও, বর্তমানে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই নিখুঁত নেটওয়ার্কে আন্তঃজেলা চক্রের পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিশেষ করে এই অনলাইন ঋণ জালিয়াতির অপরাধে সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে চীনা নাগরিকেরা, যারা পর্দার আড়াল থেকে দেশীয় অপরাধীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছিল।
অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, লোকলজ্জা, সামাজিক অস্বস্তি এবং আইনি হয়রানির ভয়ে সিংহভাগ ভুক্তভোগী থানা পুলিশ বা আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে চান না, যার ফলে এই ভয়ংকর অপরাধগুলো আড়ালে থেকে যাচ্ছে এবং চক্রগুলো আরও দ্বিগুণ উৎসাহে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সাথে পুলিশের সাইবার তদন্ত সক্ষমতা আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি ঋণের নামে অনলাইন জালিয়াতি রোধে সরকারি উদ্যোগে ব্যাপক ও দেশব্যাপী জনসচেতনতামূলক প্রচারভিযান চালানো এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ