• মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৯ অপরাহ্ন
Headline
শ্বশুরবাড়ির সাথে সম্পর্ক: অভিজ্ঞতা থেকে ৬টি পরামর্শ বিপিএলে ফিক্সিং : সাবেক পরিচালকসহ তিনজন নিষিদ্ধ থার্ড টার্মিনালের র‌্যাম্প থেকে পিকআপ পড়ে বিমানবাহিনীর ৩ সদস্য নিহত সরকারি অর্থের অপচয় মেনে নেয়া হবে না: অর্থমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী সীমান্ত নজরদারিতে যুক্ত হচ্ছে থার্মাল ও নাইট ভিশন ড্রোন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক বরখাস্ত বেআইনি: হাইকোর্ট যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে ফিরলে ইরানও প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে আইপিইউ: শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের জীবিকার নিশ্চয়তায় ওয়েজ বোর্ড নিয়ে দ্রুত কাজ করবে সরকার : ডা. জাহেদ

অবসরপ্রাপ্তদের পেনশনও বাড়ছে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত: সরকারিতে বেতন বাড়ল দ্বিগুণেরও বেশি

Reporter Name / ১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দীর্ঘ প্রায় এক যুগের প্রতীক্ষা ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় বেতন স্কেল বা নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে সরকার| সোমবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী বৈঠকে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়| এই নতুন বেতন কাঠামোর ফলে সরকারি চাকুরেদের মূল বেতন এক লাফে ১০০ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে| বিশেষ করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এই সিদ্ধান্ত এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে| দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি চাকরিজীবীরা যে আর্থিক চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন, এই নতুন ঘোষণার মাধ্যমে তাদের সেই কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা|
নতুন অনুমোদিত এই বেতন কাঠামোর বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এখানে মূলত নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের আর্থিক সুরক্ষার দিকে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে| এই কাঠামোর আওতায় সরকারের প্রথম গ্রেড অর্থাৎ সচিব পদমর্যাদা থেকে শুরু করে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মরত সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মূল বেতন সরাসরি দ্বিগুণ বা ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে| অন্যদিকে, ১২তম গ্রেড থেকে শুরু করে সবচেয়ে নিচের স্তর অর্থাৎ ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মরত কর্মচারীদের মূল বেতন ১১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে| টাকার অঙ্কে হিসাব করলে দেখা যায়, বর্তমানে প্রথম গ্রেডের বা সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার মূল বেতন যেখানে ৭৮ হাজার টাকা ছিল, তা এক লাফে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে| একইভাবে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে অর্থাৎ ২০তম গ্রেডে কর্মরত একজন সাধারণ কর্মচারীর মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে| শুধু বেতন বৃদ্ধিই নয়, নতুন এই কাঠামোতে উচ্চ ও নিম্ন পদের বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রেও একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে| মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে তথ্য মন্ত্রণালয়ের পিআইডি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের মধ্যকার যে পূর্ববর্তী অনুপাত ১ অনুপাত ১ দশমিক ৯৪৫ ছিল, সেটি কমিয়ে এবার ১ অনুপাত ১ দশমিক ৭৮ নির্ধারণ করা হয়েছে|
এত বিশাল সংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত জাতীয় অর্থনীতিতে নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে| এই বিপুল আর্থিক দায়ের কথা মাথায় রেখে সরকার অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে এই নতুন বেতন কাঠামো একযোগে বাস্তবায়ন না করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে| সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নতুন এই কাঠামো বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ২৪ লাখ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হবেন| একই সঙ্গে সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীও এই বিপুল সুবিধার আওতাভুক্ত হবেন| এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে সরকারের কোষাগার থেকে প্রতি বছর আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ভার বহন করতে হবে| দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যাতে হঠাৎ করে কোনো বড় ধরনের ধাক্কা না লাগে, সে জন্য চলতি অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু করে আগামী ২০২৭ থেকে ২৮ অর্থবছরের মধ্যে মোট তিনটি ধাপে এই বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর করা হবে| মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি তার বক্তব্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, এই ধাপভিত্তিক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত স্বল্প আয়ের মানুষদের অর্থাৎ ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে| মূল বেতন আগামী ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেও বর্ধিত ভাতাসমূহ একযোগে কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে|
নতুন এই বেতন কাঠামোতে কেবল কর্মরত চাকরিজীবীদেরই নয়, বরং যারা নিজেদের কর্মজীবন শেষে অবসরে গেছেন, সেই প্রবীণ ও অবসরভোগী পেনশনধারীদের জীবনযাত্রার মান এবং বৃদ্ধ বয়সের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে| অবসরপ্রাপ্তদের জন্য স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা| নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যেসব অবসরভোগী বর্তমানে মাসিক ৯ হাজার টাকার কম নিট পেনশন উত্তোলন করেন, তাদের নিট পেনশন এক লাফে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে| যাদের নিট পেনশনের পরিমাণ ৯ হাজার এক টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত, তাদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার হবে ৭৫ শতাংশ| একইভাবে ২০ হাজার এক টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনভোগীদের জন্য ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার এক টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনভোগীদের জন্য ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার এক টাকা বা তার চেয়েও বেশি অঙ্কের নিট পেনশন উত্তোলনকারীদের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ হারে পেনশন বৃদ্ধি করা হবে| এর পাশাপাশি এই প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানদের জন্য একটি অনন্য ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে| এই যুগান্তকারী উদ্যোগের ফলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারী মাসিক ৩ হাজার টাকা করে বিশেষ ভাতা প্রাপ্য হবেন| এছাড়া বর্তমান যুগের তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তৃতি এবং ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগের অপরিহার্যতার কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার মোবাইল ভাতার আওতা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করেছে| এতদিন পর্যন্ত সরকারের শুধুমাত্র ৫ম গ্রেডের কর্মচারীরা এই মোবাইল ভাতা পেয়ে আসতেন, কিন্তু জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী এখন থেকে সরকারের সব গ্রেডের কর্মচারীরাই এই মোবাইল ভাতার সুবিধা ভোগ করবেন|
সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সর্বশেষ অষ্টম বেতন কাঠামোটি অনুমোদিত হয়েছিল ২০১৫ সালে| এরপর দীর্ঘ প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়নি| বিগত দিনে জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় একটি নতুন বেতন কাঠামোর দাবি জোরালো হয়ে উঠেছিল| এই দাবির প্রেক্ষিতে প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে প্রধান করে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট ‘নবম জাতীয় বেতন কমিশন’ গঠন করে| এই কমিশন দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান হার এবং কর্মচারীদের জীবনমান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে একটি যৌক্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ বেতন কাঠামোর রূপরেখা তৈরি করে| দীর্ঘ পরিশ্রমের পর চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশন তাদের মূল ও চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি জমা দেয়| সেই প্রতিবেদনের আলোকেই বর্তমান সরকার এই নতুন স্কেল চূড়ান্ত করেছে| অন্যদিকে, জুডিশিয়াল সার্ভিস বা বিচার বিভাগে কর্মরতদের জন্য সরকার একটি পৃথক কমিটি গঠন করেছে| মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন যে, ওই নির্দিষ্ট কমিটির সুপারিশ ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতন স্কেলও অতি শিগগিরই অনুমোদন করা হবে, যা জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর মতো একইভাবে গত ১ জুলাই থেকেই ধাপে ধাপে কার্যকর বলে গণ্য করা হবে|
সরকারি খাতের এই বিশাল বেতন বৃদ্ধির ঘোষণার পর দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মিশ্র ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন| গতকাল মন্ত্রিসভায় এই নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের পর গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক বিশেষ প্রতিক্রিয়ায় বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমদ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন| তিনি বলেন, সময়ের কঠোর প্রয়োজন ও বাস্তবতার নিরিখেই তারা বিগত সময়ে এই বেতন কমিশন গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন| তিনি মনে করেন, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে নতুন এই বেতন কাঠামোটি দেশে আরও অনেক আগেই বাস্তবায়ন হওয়া উচিত ছিল| তবে একই সঙ্গে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও দেশবাসীকে সতর্ক করেছেন| তিনি উল্লেখ করেন যে, সরকারি খাতে বেতন এতটা বৃদ্ধির ফলে অনিবার্যভাবেই দেশের বিশাল বেসরকারি খাতের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত চাপ তৈরি হবে| বর্তমানে বাজারে যে মাত্রাতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে, সেটি আমলযোগ্য এবং সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেসরকারি খাতের সব জায়গাতেই বেতন বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে| এমনকি দেশের সংবাদমাধ্যম বা গণমাধ্যমকর্মীদের জন্যও নতুন একটি বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি বলে তিনি মত প্রকাশ করেন| পরিশেষে তিনি একটি কাঠামোগত সংস্কারের পরামর্শ দিয়ে বলেন, বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি খাতে কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন এবং যেসব জায়গায় অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত লোকবল রয়েছে, তা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর থেকে চাপ কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে|
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category