দেশে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়া হচ্ছে| তবে এর উল্টো এবং চরম হতাশাজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশের ২৮তম গ্যাসক্ষেত্র জকিগঞ্জে| দীর্ঘ পাঁচ বছর আগে ঘটা করে এই গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হলেও, এখন পর্যন্ত সেখানকার এক ছটাক গ্যাসও জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি| পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২১ সালের ৯ আগস্ট ‘জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস’-এর এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এই গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন| কিন্তু আবিষ্কারের পর অর্ধ দশক পেরিয়ে গেলেও শুধুমাত্র একটি সঞ্চালন পাইপলাইনের অভাবে মাটির নিচেই পড়ে আছে অমূল্য এই প্রাকৃতিক সম্পদ| জাতীয় গ্রিডের সাথে সংযোগ না থাকায় উৎপাদনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও এই গ্যাস দেশের কোনো কাজেই আসছে না| বর্তমানে জকিগঞ্জ-১ নামক কূপটি থেকে দৈনিক ১০ থেকে ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার শতভাগ সক্ষমতা রয়েছে| তা সত্ত্বেও শুধুমাত্র একটিমাত্র কূপের ওপর নির্ভর করে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করা অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক হবে, সেই হিসাব মেলাতেই পার হয়ে গেছে দীর্ঘ পাঁচটি বছর|
জকিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রের এই বিপুল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে প্রয়োজন প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সঞ্চালন লাইন| পেট্রোবাংলা এবং বাপেক্স সূত্রে জানা যায়, গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কারের পর পরই এই পাইপলাইন নির্মাণের প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল| কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বা ফিজিবিলিটি স্টাডির হিসাব| একটি গ্যাস ফিল্ড থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস সরবরাহের জন্য যে পরিমাণ প্রাথমিক অবকাঠামো ও পাইপলাইন নির্মাণ করতে হয়, তার ব্যয় অনেক বেশি| জকিগঞ্জে যেহেতু কেবলমাত্র একটি উৎপাদনক্ষম কূপ রয়েছে, তাই সেই একটিমাত্র কূপ থেকে উৎপাদিত গ্যাস বিক্রি করে সঞ্চালন চার্জ বা পাইপলাইন নির্মাণের বিশাল ব্যয় তুলে আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে শুরু থেকেই তীব্র সন্দিহান ছিল গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)| অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের এই দোলাচলের একপর্যায়ে স্থানীয় বিতরণ কোম্পানি জালালাবাদ গ্যাসের মাধ্যমে এই সঞ্চালন লাইনটি নির্মাণের একটি বিকল্প পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছিল পেট্রোবাংলা| কিন্তু সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণে শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগটিও আর আলোর মুখ দেখেনি|
দীর্ঘসূত্রতার কারণে এই প্রকল্পের ব্যয় কীভাবে বেড়ে যাচ্ছে, তার একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায় নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের তথ্যে| জানা যায়, ২০২২ সালের দিকে জকিগঞ্জের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্যে সঞ্চালন লাইন নির্মাণের জন্য ১৩৯ কোটি টাকার একটি প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি তৈরি করা হয়েছিল| কিন্তু সম্ভাব্য ব্যয়ের বিপরীতে ওই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রটি থেকে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত হবে বিবেচনা করে জিটিসিএল শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি আর সামনের দিকে এগিয়ে নেয়নি| অথচ গত কয়েক বছরে নির্মাণসামগ্রী ও অন্যান্য খাতের ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে একই পাইপলাইন নির্মাণ করতে গেলে কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে| এমন একটি জটিল পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র একটি কূপের ওপর ভরসা না করে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ বাড়িয়ে পাইপলাইন নির্মাণকে অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক ও লাভজনক করার একটি নতুন পথ খুঁজছে সরকার| আর সেই লক্ষ্যেই জকিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রে নতুন করে আরও দুটি কূপ খননের এক সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)| ইতিমধ্যে এই নতুন দুটি কূপ খননের জন্য একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিয়েছে বাপেক্স, যদিও প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেনি|
জকিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রে মজুত থাকা গ্যাসের পরিমাণ ও এর বর্তমান বাজারমূল্য হিসাব করলে এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশের যে বিশাল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়| বাপেক্সের নিজস্ব ভূতাত্ত্বিক হিসাব অনুযায়ী, জকিগঞ্জে বর্তমানে ৫২ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ২০০ কোটি ঘনফুট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত রয়েছে| যদিও ২০২১ সালে যখন প্রথম এই গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কার করা হয়, তখন সেখানে ৬৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত থাকার আশাবাদী হিসাব দেওয়া হয়েছিল| সেই সময়কার বাজারদর অনুযায়ী, প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম মাত্র ৩ মার্কিন ডলার হিসাব করে জকিগঞ্জের এই গ্যাসের মোট আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা| কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন| আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের আকাশচুম্বী দাম এবং বর্তমান বাজারমূল্যের সাথে তুলনা করলে জকিগঞ্জের মাটির নিচে আটকে থাকা এই গ্যাসের প্রকৃত মূল্য এখন কয়েক হাজার কোটি টাকারও বেশি| দেশীয় গ্যাস ব্যবহার না করে বিদেশ থেকে চড়া দামে এলএনজি আমদানি করার এই নীতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যে বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে, জকিগঞ্জের গ্যাস উত্তোলন করা গেলে তা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হতো|
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জকিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রে নতুন করে যে দুটি কূপ খননের প্রস্তাব বাপেক্স দিয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে এই গ্যাসক্ষেত্রের সার্বিক চিত্রই বদলে যেতে পারে| বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নতুন এই কূপ দুটি সফলভাবে খনন করার পর প্রাপ্ত ত্রিমাত্রিক সিসমিক তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষেত্রটির মোট গ্যাসের মজুত ৮৭ বিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়াতে পারে| প্রস্তাবিত এই নতুন প্রকল্পটির জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩১৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা| ডিপিপি বা প্রকল্প প্রস্তাবে আগামী ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু করে ২০২৮ সালের জুন মাসের মধ্যে এই কূপ দুটির খননকাজ সফলভাবে শেষ করার একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে| নতুন এই কূপগুলো উৎপাদনে গেলে জকিগঞ্জ থেকে দৈনিক গ্যাস উত্তোলনের পরিমাণ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে, যা তখন জিটিসিএল-এর জন্য একটি ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণকে শতভাগ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তুলবে|
নতুন কূপ খননের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি জকিগঞ্জের বর্তমান এক নম্বর কূপটিকেও সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে| বাপেক্স সূত্রে জানা যায়, তাদের নিজস্ব বিজয়-১২ রিগ বা খননযন্ত্র ব্যবহার করে জকিগঞ্জ-১ কূপটির ওয়ার্কওভার বা মেরামত কার্যক্রম অত্যন্ত সফলতার সাথে ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছে সংস্থাটি| এই নিবিড় মেরামতের মাধ্যমে কূপটিকে দৈনিক ১০ থেকে ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট হারে পরীক্ষামূলকভাবে গ্যাস উত্তোলনের জন্য শতভাগ উপযোগী করে তোলা হয়েছে| এই কূপটির ওয়ার্কওভার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাপেক্স ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে একটি সুনির্দিষ্ট প্রকল্প হাতে নিয়েছিল এবং একই বছরের ডিসেম্বর মাসেই এর যাবতীয় কারিগরি কার্যক্রম সফলভাবে শেষ করা হয়| বাপেক্সের আনুষ্ঠানিক তথ্যমতে, জকিগঞ্জ-১ কূপে বর্তমানে যে পরিমাণ গ্যাস মজুত রয়েছে, তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং শুধুমাত্র একটি পাইপলাইনের অপেক্ষায় রয়েছে|
পুরো পরিস্থিতিটি নিয়ে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক অত্যন্ত আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন| তিনি গণমাধ্যমকে স্পষ্টভাবে জানান যে, জকিগঞ্জের একটি কূপ থেকেই বর্তমানে দৈনিক ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব এবং বাপেক্স সেই কূপটিকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে রেখেছে| তবে উৎপাদন সক্ষমতা আরও বহুগুণ বাড়াতে সেখানে অচিরেই নতুন করে আরও দুটি কূপ খননের কাজ শুরু হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন| অন্যদিকে, পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব পুরো বিষয়টির পেছনের অর্থনৈতিক কারণগুলো অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন| তিনি জানান, জকিগঞ্জে ১০ থেকে ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের জন্য প্রস্তুত থাকলেও শুধুমাত্র পাইপলাইনের অভাবেই তা আটকে আছে| একটিমাত্র কূপ থেকে যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ হবে, তা দিয়ে সঞ্চালন কোম্পানির মার্জিন বা মুনাফা উঠবে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা দূর করতেই নতুন দুটি কূপ খনন করা হচ্ছে| এই নতুন কূপগুলো থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হলেই খুব দ্রুত সেখানে পাইপলাইন নির্মাণের কাজও শুরু করা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন|
বর্তমান সরকার দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে স্থলভাগের পাশাপাশি সাগরেও ব্যাপক অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে| এরই অংশ হিসেবে সারা দেশে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ১৫০টি নতুন কূপ খননের একটি বিশাল উদ্যোগও সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে| অথচ এমন একটি ইতিবাচক সময়ে জকিগঞ্জের মতো একটি সম্পূর্ণ আবিষ্কৃত ও প্রস্তুত গ্যাসক্ষেত্রের মূল্যবান গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে না পারাটা নিঃসন্দেহে জ্বালানি খাতের একটি বড় ধরনের কাঠামোগত ব্যর্থতা| জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, জকিগঞ্জের এই গ্যাস দিয়ে হয়তো দেশের সামগ্রিক বিশাল গ্যাস সংকটের পুরোটা মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়, কিন্তু বর্তমানের এই চরম সরবরাহ ঘাটতির পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১০ থেকে ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের অবদানও কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়| আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাইপলাইন নির্মাণের অর্থনৈতিক জটিলতাগুলোর সমাধান করে জকিগঞ্জের এই আটকে থাকা গ্যাস অবিলম্বে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি|
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা