• রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৮ অপরাহ্ন
Headline
জিয়াউর রহমানকে গুলি করেন মতিউর, হত্যার আগে ঘটনাস্থলে যান এরশাদ জ্বালানি খাতে শেভরনের আরও বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ লিফট রেখে সিঁড়ি বেয়ে বৈঠকে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হলে সকল সম্প্রদায়ের অধিকার নিশ্চিত হবে : রাষ্ট্রপতি সবার জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে গুরুত্বারোপ ডা. জুবাইদা রহমানের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে: রাষ্ট্রপতি সরকার নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শঙ্কায় ভবিষ্যৎ সেচ: দ্রুত নামছে ভূগর্ভের পানির স্তর স্পট মার্কেটে সিন্ডিকেটের থাবা: ৫ কোম্পানির কবজায় এলএনজি ‘আগেই ভালো ছিলাম’ বয়ানের নেপথ্যে

‘আগেই ভালো ছিলাম’ বয়ানের নেপথ্যে

Reporter Name / ১ Time View
Update : রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রাজধানীর গুলশানের মতো অতি স্পর্শকাতর ও কূটনৈতিক সুরক্ষা বলয়ভুক্ত এলাকায় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের আকস্মিক ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে| সন্ত্রাস ও গণহত্যার দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া একটি রাজনৈতিক শক্তির এমন প্রকাশ্য তৎপরতা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে| এই ঘটনায় ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষ নেতৃত্ব গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন| তাঁদের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ—প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দায়িত্বে অবহেলা ও আগাম সতর্কতার শৈথিল্য না থাকলে এ ধরনের চরম ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসূচির কোনো সুযোগ তৈরি হতে পারত না| তবে এই প্রকাশ্য প্রশাসনিক ব্যর্থতার আলোচনার পাশাপাশি দলটির অভ্যন্তরেও নতুন করে শুরু হয়েছে আত্মবিশ্লেষণ| সরকার পরিচালনার ব্যস্ততায় তৃণমূল পর্যায়ে তৈরি হওয়া সাংগঠনিক শূন্যতা, নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তা এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের আশঙ্কা নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে এক গভীর রাজনৈতিক টানাপড়েন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে|
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত শুক্রবার দুপুরে, যখন রাজধানীর গুলশান-৩ নম্বর সড়কের একটি গলিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের প্রায় দেড় শতাধিক নেতাকর্মী হঠাৎ জড়ো হয়ে মিছিলের চেষ্টা চালান| স্পর্শকাতর কূটনৈতিক এলাকায় এই ঝটিকা কর্মসূচি চলাকালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বাধা দিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে| পুলিশের দাবি অনুযায়ী, মিছিলকারীদের পক্ষ থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুটি রাবার বুলেট ছোড়া হয় এবং এতে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়| পরবর্তীতে গুলশান থানা পুলিশ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা থেকে মিছিলে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করে|
তবে এই গ্রেপ্তার তৎপরতা দিয়ে মূল নিরাপত্তা ঝুঁকির বিতর্ক ধামাচাপা দেওয়া যাচ্ছে না| বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন| তাঁর মতে, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যথাসময়ে সজাগ ও তৎপর থাকলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কোনোভাবেই ঘটতে পারত না| গুলশান একটি আন্তর্জাতিক মানের সংরক্ষিত ও কূটনৈতিক এলাকা, যেখানে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতেও বিএনপি কখনো কর্মসূচি নিয়ে প্রবেশ করেনি; সর্বোচ্চ দুই নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত সীমারেখা মেনে চলেছে| এমন একটি সুরক্ষিত এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের অনুপ্রবেশ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রকাশ্য হুমকি| তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আদালতে যাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা রয়েছে এবং যাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেই ফ্যাসিবাদের যদি পুনরায় উত্থান ঘটে তবে দেশের কোনো নাগরিকই নিরাপদ থাকবে না| একই সঙ্গে অরাজক শক্তি যাতে সুযোগ না পায়, সেজন্য জাতীয় স্বার্থে অন্যান্য বিরোধী দলগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি|
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজরদারির ঘাটতি নিয়ে আরও তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন দলটির অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারা| বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামছুজ্জামান দুদু সাফ জানিয়েছেন, এটি কোনো রাজনৈতিক শূন্যতার ফল নয়, বরং এটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সরাসরি ব্যর্থতা| দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী বিষয়টিকে সামগ্রিক জননিরাপত্তার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যও এক বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন| তিনি মনে করেন, প্রশাসনকে কর্মনিষ্ঠ ও কঠোর হওয়ার পাশাপাশি যেকোনো অপতৎপরতা রুখতে বিএনপির বিশাল সাংগঠনিক শক্তিকেও সক্রিয় রাখতে হবে| বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স প্রশ্ন তুলেছেন, প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে একটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল এমন জমায়েত করার সাহস পায়; যার জন্য সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত| ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের পক্ষ থেকেও গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ জানানো হয়েছে| তাদের অভিযোগ, অতীতে এ ধরনের যেকোনো অপতৎপরতার তথ্য গোয়েন্দা সূত্রে আগেভাগে পাওয়া গেলেও এবার সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্যে রাখা হয়েছে, যা এক গভীর রহস্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে|
প্রশাসনিক দুর্বলতার এই দৃশ্যপটের পাশাপাশি আরেকটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চক্রান্তের দিকে ইঙ্গিত করছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা| সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে নতুন একটি বয়ান তৈরির সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যার মূল সুর হলো ‘আগেই ভালো ছিলাম’| পতিত স্বৈরাচারের শাসনামলের দীর্ঘ গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং বিরোধী মতের ওপর অবর্ণনীয় দমন-পীড়নের ইতিহাস আড়াল করে কৃত্রিম এই বয়ান ছড়ানো হচ্ছে| প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন এই অপপ্রচারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, যারা এই ধরনের বক্তব্য প্রচার করছে তারা মূলত ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মা ছাড়া আর কিছুই নয়| বর্তমান সরকার যখন জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও চলমান বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের মতো জাতীয় সংকটগুলো আন্তরিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করছে, তখন সংকটকে পুঁজি করে অতীতের গুম-খুনের শাসনব্যবস্থাকে জাস্টিফাই করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে| তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সংসদে যেখানে বিরোধী দলও সরকারের আন্তরিকতার কথা বলছে, সেখানে যারা ‘আগেই ভালো ছিলাম’ বলছে তারা কি প্রকারান্তরে হাসিনার খুন-খারাবির আমলকেই সমর্থন করছে?
তবে সংকটের শিকড় কেবল বাইরের অপপ্রচার বা প্রশাসনিক ব্যর্থতায় সীমাবদ্ধ নয়; বিএনপির তৃণমূল থেকে খোদ নিজেদের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক কাঠামোর দুর্বলতা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে| সরকার পরিচালনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে আসায় দলটির কেন্দ্রীয় ও দায়িত্বশীল বহু পরিচিত নেতা এখন আর মাঠের রাজনীতিতে আগের মতো সার্বক্ষণিক সময় দিতে পারছেন না| ফলে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে নিয়মিত সাংগঠনিক যোগাযোগ, নেতাকর্মীদের পারস্পরিক সমন্বয় ও স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তিতে এক ধরনের স্থবিরতা ও ঢিলেঢালা ভাব তৈরি হয়েছে| এই সাংগঠনিক শূন্যতার সুযোগে নিষিদ্ধ সংগঠনের সুবিধাবাদী অংশ ও স্থানীয় স্বার্থান্বেষী চক্র নানা কায়দায় মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে| আরও আশঙ্কাজনক অভিযোগ হলো, অতীতে আওয়ামী লীগের আমলে বিভিন্ন সুবিধাভোগী ও বিতর্কিত ব্যক্তিরা সরাসরি রাজনৈতিক মঞ্চে না এলেও ব্যবসা-বাণিজ্য, পেশাজীবী সংগঠন ও সামাজিক উদ্যোগের আড়ালে নিজেদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চালাচ্ছেন| এমনকি বিএনপির কিছু স্থানীয় নেতার সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সমীকরণ বা ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক আঁতাত তৈরির অভিযোগও তৃণমূলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করছে|
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে বিএনপির হাইকমান্ড অবশ্য বিষয়টিকে অত্যন্ত কঠোর নজরদারিতে রেখেছে| দলের কোনো স্তরের নেতা বা কর্মী অতীতে নিপীড়ন চালানো কোনো বিতর্কিত ব্যক্তির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বা রাজনৈতিক সখ্য গড়ে তুলছেন কি না, তা যাচাই করতে দলের বিশেষ টিমের পাশাপাশি নিরপেক্ষ গোয়েন্দা চ্যানেলের মাধ্যমেও সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে| হাইকমান্ড থেকে স্পষ্ট বার্তা রয়েছে—কারো বিরুদ্ধে এ ধরনের অশুভ আপসের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিললে সাংগঠনিক শাস্তির পাশাপাশি কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে| দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামছুজ্জামান দুদু অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন যে, আসন্ন জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের অভ্যন্তরীণ যাবতীয় ত্রুটি, বিশৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের শূন্যতাগুলো দ্রুত দূর করে সংগঠনকে ইস্পাতকঠিন রূপ দেওয়া হবে|
চূড়ান্ত বিচারে, নিষিদ্ধ শক্তির এই আকস্মিক মাথাচাড়া দেওয়া প্রমাণ করে যে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপর অন্ধ নির্ভরতা ক্ষমতাসীন দলের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে| ২৪ ঘণ্টার জন্য বর্গমাইলের পর বর্গমাইল এলাকা পাহারা দেওয়া কোনো একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে সম্ভব নয়; তার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের গোয়েন্দা সংস্থাকে নিরপেক্ষ ও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে| একই সাথে গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যেকার অনাকাঙ্ক্ষিত বিভাজন ও অহেতুক সংঘাত পরিহার করে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য রক্ষা করা এখন সময়ের প্রধান দাবি| রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে প্রশাসনকে যেমন তার শৈথিল্য ঝেড়ে ফেলে শতভাগ সতর্ক হতে হবে, তেমনি ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপিকেও তাদের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক ত্রুটি সারিয়ে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ ও সজাগ রাখতে হবে—অন্যথায় প্রশাসনিক অসতর্কতা ও রাজনৈতিক অসচেতনতার ফাঁক গলে অরাজক শক্তির পুনরুত্থানের ঝুঁকি থেকেই যাবে|
তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category