আগামীকাল নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন। আর সেই নতুন সূর্যোজ্জ্বল দিনটির অপেক্ষায় আজ দেশের জাতীয় সংসদে পাস হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিনে আজ সংসদ অধিবেশনে বাজেট পাসের প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ দেখা যাবে। অর্থবিল পাসের মধ্য দিয়ে কর ও শুল্কসংক্রান্ত জটিল প্রস্তাবগুলোর আইনি ভিত্তি পাওয়ার পর, আজ স্পিকারের কণ্ঠভোটে বাজেট পাস হওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বাজেট পাসের আগে কিছু বিষয়ে পরিবর্তন ও পরিমার্জন আনা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ী মহলে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আলোচনা ও সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে হওয়া সর্বশেষ বৈঠকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এটি মাথায় রাখতে হবে যে, এবারের বাজেটের মূল কাঠামো, আকার কিংবা সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। মূলত দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর যেন অতিরিক্ত চাপের বোঝা চেপে না বসে, সেই লক্ষ্যেই কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। আগামীকাল পহেলা জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন অর্থবছরের জন্য এই সংশোধিত বাজেটই হবে পথপ্রদর্শক।
বাজেট পাসের এই দিনে সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবরটি হলো ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো। মূল্যস্ফীতির তীব্র কষাঘাতের মুখে থাকা সাধারণ মানুষকে কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচার সুযোগ করে দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। ফলে যাদের বার্ষিক বেতনভিত্তিক আয় ৬ লাখ টাকার কম, তারা এখন করের আওতামুক্ত থাকবেন। উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে এই সীমা ছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে এই সীমা পর্যায়ক্রমে ৫ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এটি নিম্ন আয়ের চাকরিজীবীদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।
তবে করমুক্ত সীমা বাড়লেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন যে, সামগ্রিকভাবে করদাতাদের করের বোঝা খুব একটা কমছে না। এর পেছনের কারণ হলো বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সুযোগ ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া সঞ্চয়পত্র, এফডিআর ও সরকারি সিকিউরিটিজের সুদের ওপর কাটা উৎসে করকে এখন আর চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করা হবে না। রিটার্ন দাখিলের সময় এসব ক্ষেত্রে অগ্রিম কর হিসেবে সমন্বয় করার বাধ্যবাধকতা থাকায় অনেক করদাতাকেই হয়তো অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হতে পারে। তাই করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল কতটা সাধারণ মানুষ পাবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কিছুটা সংশয় রয়েই গেছে।
আরেকটি বড় বিতর্কের অবসান ঘটছে আজ। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য টিআইএন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংক গ্রাহক, ব্যবসায়ী সংগঠন ও অর্থনীতিবিদরা প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাদের দাবি ছিল, এই নিয়ম বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের অনীহা তৈরি হবে এবং অনেক প্রান্তিক মানুষ ব্যাংকিং সেবা থেকে দূরে সরে যাবে। এই বাস্তবতাকে বিবেচনা করে সরকার আজ বাজেট পাসের দিন সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে। ফলে ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক আর থাকছে না। এটি সাধারণ মানুষের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় স্বস্তি।
আবাসন খাতের জন্য আজকের দিনটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থবিলে ‘স্বতঃপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শন’ নামে একটি বিতর্কিত বিধান যুক্ত করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে দলিলে কম মূল্য দেখানো জমি বা ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য প্রদর্শনের সুযোগ ছিল। তবে এতে দলিল মূল্য ও প্রকৃত মূল্যের পার্থক্যের ওপর উচ্চ হারে মূলধনি করের যে জটিল বিধান রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা ছিল। সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্টদের আপত্তির মুখে সরকার আজ সেই বিধানটি পুরোপুরি বাতিল করে দিচ্ছে। এই সিদ্ধান্তটি আবাসন খাতে এক ধরনের স্থবিরতা কাটাতে এবং করদাতাদের হয়রানি কমাতে সহায়তা করবে।
পুঁজিবাজারের জন্য আজকের বাজেট পাসে সুখবর রয়েছে। প্রস্তাবিত অর্থবিলে লভ্যাংশ আয়ের ওপর বিদ্যমান ২০ শতাংশ করহার বাতিল করে কর্পোরেট করহার আরোপের প্রস্তাব ছিল, যা পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারত। বিনিয়োগকারীদের জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আগের ২০ শতাংশ করহারই বহাল রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর ০.২০ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপের যে প্রস্তাব ছিল, সেটিও আজ প্রত্যাহার করা হচ্ছে। দেশের খুচরা ব্যবসায়ীদের টিকে থাকতে এবং করজাল সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
আজকের বাজেটে স্বর্ণের মূলধনি কর কমানোর বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে। বর্তমান বিশ্ববাজারে স্বর্ণের উচ্চমূল্যের প্রেক্ষাপটে এর ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনি কর আরোপের প্রস্তাব ছিল। তবে সেটি পুনর্বিবেচনা করে আজ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজসহ তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ কর অর্ধেক করে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হতে পারে। এই সিদ্ধান্তগুলো শিক্ষা ও উচ্চতর সেবা খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সবশেষে বলা যায়, আজকের বাজেট পাস কেবল একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং দেশের অর্থনীতির গতিপথের নির্দেশক। তবে করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি বা টিআইএন শিথিলকরণের মতো উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয় হলেও, অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির জন্য আরও স্পষ্ট ও ধারাবাহিক নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য সরকারকে এখন থেকে আরও বেশি সজাগ থাকতে হবে। এনবিআরের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জটি বেশ কঠিন। এখন দেখার বিষয়, বাজেট পাসের পর আগামী অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে এসব পরিবর্তন মাঠপর্যায়ে কত দ্রুত কার্যকর হয়। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকার ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টাই হবে আগামী দিনের সাফল্যের চাবিকাঠি। আজ যে বাজেট পাস হচ্ছে, তা দেশের আগামী এক বছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করবে—এটাই প্রত্যাশা।