• শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ১০:১৭ পূর্বাহ্ন
Headline
বিনিয়োগে পালাবদল: ব্যাংকের এফডিআর ছেড়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ঝুঁকছেন সাধারণ মানুষ তহবিল শূন্য: অর্থ সংকটে উপজেলা পর্যায়ে ব্যাহত বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ জনবল ও বাজেট সংকটে ধুঁকছে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল: পড়ে আছে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন আব্দুল গনি রোড থেকে শেরেবাংলা নগর: যানজট ও স্থান সংকট এড়াতে পুরো সচিবালয় স্থানান্তরের নতুন ছক এসএসসির খাতা দেখছে শিক্ষার্থীরা: মূল্যায়নে চরম অব্যবস্থাপনা ও আইনি লঙ্ঘন উত্তেজনার মাঝেই ওয়াশিংটনে ইসরাইল-লেবানন শান্তি আলোচনা: একদিকে হামলা, অন্যদিকে কূটনীতি হরমুজের ‘অদৃশ্য ঘাতক’ ও ভূরাজনৈতিক দাবার চাল: কেন পিছপা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র? ঈদের পর বাড়ছে মন্ত্রিসভার কলেবর: নেতৃত্বে আসছে বড় রদবদল ব্রিগেডের জনসমুদ্রে আজ শপথ নিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন যুগের সূচনা বার্ড উইল সিং টুমরো

আব্দুল গনি রোড থেকে শেরেবাংলা নগর: যানজট ও স্থান সংকট এড়াতে পুরো সচিবালয় স্থানান্তরের নতুন ছক

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

রাজধানীর আব্দুল গনি রোডে অবস্থিত বাংলাদেশ সচিবালয় দীর্ঘকাল ধরে দেশের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সরকারের কর্মপরিধি ও দাপ্তরিক চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমান স্থানটি তীব্র আবাসন ও স্থান সংকটে ভুগছে। এই সমস্যা সমাধানে বর্তমান সচিবালয় প্রাঙ্গণেই ৬৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অত্যাধুনিক ২১ তলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদি ও ভবিষ্যৎমুখী চিন্তাভাবনা থেকে এই প্রকল্প বাতিল করেছে সরকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) দ্বিতীয় সভায় প্রকল্পটি ফেরত পাঠানো হয়। এর পরিবর্তে বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের মূল নকশা অনুসরণ করে পুরো সচিবালয় শেরেবাংলা নগরের সাবেক বাণিজ্য মেলার মাঠে স্থানান্তরের এক বৃহৎ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে এবং এর সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাতিল হওয়া ২১ তলা ভবন প্রকল্পের আদ্যোপান্ত

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমান সচিবালয়ে প্রায় ১০ লাখ বর্গফুট অফিস স্পেস রয়েছে, যা ক্রমবর্ধমান প্রশাসনিক চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে আরও প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট দাপ্তরিক জায়গার জরুরি প্রয়োজন। এই সুবিশাল ঘাটতি মেটানোর লক্ষ্যেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে ৬৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ২১ তলা বিশিষ্ট নতুন অফিস ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছিল।

বাতিল হওয়া এই মেগা প্রকল্পের আওতায় চার তলা বেজমেন্টের ওপর একটি সুপার স্ট্রাকচার নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। প্রস্তাবিত ভবনে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধার সন্নিবেশ ঘটানোর কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, আধুনিক অভ্যন্তরীণ পানি সরবরাহ ও সুয়ারেজ ব্যবস্থা, একটি সুবিশাল ভূগর্ভস্থ জলাধার এবং কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতে দুটি ২ হাজার কেভিএর সাব-স্টেশন এবং ব্যাকআপ হিসেবে দুটি ৫০০ কেভিএ ও তিনটি ৪০০ কেভিএ জেনারেটর স্থাপনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল। যোগাযোগ ও জরুরি নিরাপত্তার জন্য ৬টি প্যাসেঞ্জার লিফট, ৬টি ফায়ার লিফট এবং ২টি বেড লিফট সংযুক্ত করার কথা ছিল। পাশাপাশি মাল্টিমিডিয়া সুবিধাসম্পন্ন ২০টি অত্যাধুনিক কনফারেন্স রুম, অগ্নিনিরাপত্তা ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং প্রকল্প চলাকালীন সুরক্ষার জন্য সেফটি ক্যানোপি ও সেফটি নেট ব্যবহারের বিষয়টিও পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নতুন করে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৬ বর্গফুট অফিস স্পেস পাওয়া যেত, যা বর্তমান স্থান সংকটের প্রায় ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ মেটাতে সক্ষম হতো। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও সিনিয়র সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদ তার সুপারিশে উল্লেখ করেছিলেন, এই ভবনটি নাগরিক সেবা প্রাপ্তি সহজ ও দ্রুত করার পাশাপাশি সচিবালয়ের কর্মপরিবেশের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাবে এবং আধুনিক স্থাপত্যের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

যে কারণে বাতিল হলো বহুতল ভবন নির্মাণের প্রস্তাব

পরিকল্পনা কমিশন প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করলেও, একনেক সভায় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব শাকিল আখতারের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি প্রকল্প বাতিল হওয়ার বিষয় নয়; মূল সংকট লুকিয়ে আছে বর্তমান সচিবালয়ের ভৌগোলিক অবস্থানে। বর্তমান স্থানে নতুন ভবন নির্মাণ কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

সচিবালয় হলো সরকারের সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ ও নাগরিক সেবার পরিধি বাড়ার কারণে প্রতিদিন শুধু হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীই নন, বরং বিপুল সংখ্যক জনপ্রতিনিধি, বিদেশি কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিক সেবা নিতে এখানে আসেন। ফলে প্রতিদিন সকালে অফিস শুরুর সময় এবং বিকেলে ছুটির সময় চারদিক থেকে আসা যানবাহনের অস্বাভাবিক চাপে পুরো আব্দুল গনি রোড ও এর আশপাশের এলাকা স্থবির হয়ে পড়ে।

এই জনাকীর্ণ ও ঘিঞ্জি পরিবেশে নতুন করে ২১ তলা ভবন নির্মাণ করলে সাময়িকভাবে হয়তো কিছু কর্মকর্তার বসার জায়গা হতো, কিন্তু সামগ্রিক যানজট ও পরিবেশগত সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করত। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব স্পষ্ট করে জানান, আগামী ৫০ বছরের প্রশাসনিক চাহিদার কথা মাথায় রেখে বর্তমান স্থানে একের পর এক বহুতল ভবন তুলে কর্মকর্তাদের বসানোকে কোনোভাবেই টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে না সরকার।

শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের নতুন রূপরেখা ও স্থপতি লুই আই কানের নকশা

এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে চিরস্থায়ী উত্তরণের জন্য একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুরো সচিবালয়কে শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের ওপর বিশেষ জোর দেন। বিশেষ করে প্রখ্যাত মার্কিন স্থপতি লুই আই কান ঢাকার জন্য যে মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছিলেন, তার প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে এই প্রশাসনিক কাঠামো নতুন করে সাজানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত পুরোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় স্থাপন করা হতে পারে।

পরিকল্পনা বিভাগের সূত্রমতে, শেরেবাংলা নগরে সরকারের যে পরিমাণ নিজস্ব জমি রয়েছে, সেখানে অনায়াসেই ১০ থেকে ১২টি সুপরিসর বহুতল ভবন নির্মাণ করা সম্ভব। এটি করা গেলে প্রশাসনিক কাজে যেমন অভাবনীয় গতিশীলতা আসবে, তেমনি সরকারি জমির সর্বোচ্চ ও সুপরিকল্পিত ব্যবহারও নিশ্চিত হবে। এই বৃহৎ পরিকল্পনায় মনোনিবেশ করার কারণেই আপাতত নতুন ভবন নির্মাণের ধারণা থেকে সরে এসেছে পরিকল্পনা কমিশন।

সম্ভাব্যতা যাচাই ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

তবে পুরো দেশের প্রশাসনিক স্নায়ুকেন্দ্র শেরেবাংলা নগরে সরিয়ে নেওয়ার এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি হুট করে বাস্তবায়নের বিষয় নয়। প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার মাধ্যমে ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে কারিগরি, কৌশলগত এবং পরিবেশগত দিকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দিয়েছেন।

শেরেবাংলা নগর এলাকায় স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে ট্রাফিক ও জনসমাগম ব্যবস্থাপনাকে। ওই এলাকায় ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদ ভবন অবস্থিত, যেখানে নিয়মিত প্রায় ৩০০ জন সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্টরা যাতায়াত করেন। এছাড়া আগারগাঁও ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় আগে থেকেই অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি দপ্তর, হাসপাতাল এবং প্রতিষ্ঠান স্থাপিত রয়েছে। বিদ্যমান এই চাপের সাথে আব্দুল গনি রোডের পুরো সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দর্শনার্থীরা যদি প্রতিদিন সেখানে যাতায়াত শুরু করেন, তবে ওই এলাকায় নতুন করে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হতে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

এই যৌক্তিক কারণ ও আশঙ্কার কথা বিবেচনা করেই স্থানান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গণপূর্ত বিভাগকে একটি বিশদ কারিগরি সমীক্ষা চালাতে বলা হয়েছে। সচিবালয় স্থানান্তরিত হলে সেখানকার সামগ্রিক পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, প্রতিদিন ঠিক কত সংখ্যক মানুষের সমাগম হবে, যানবাহনের চাপ কতটা বাড়বে এবং সেই চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত ট্রাফিক কাঠামো সেখানে আছে কি না—তার একটি সঠিক হিসাব নিরূপণ করতে বলা হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগ এই সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করার পরই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হবে। তবে, এই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য এখনও কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি।

দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা থেকে গৃহীত সরকারের এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, সাময়িক স্থান সংকুলানের জন্য অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণের বদলে সুপরিকল্পিত ও টেকসই প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে রাষ্ট্র।

সূত্র: ঢাকা পোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category