• বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:১১ অপরাহ্ন
Headline
লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জারদের বৈদেশিক মুদ্রা জমায় নতুন সুবিধা রফতানি ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা, রিজার্ভ ৩৬.২৫ বিলিয়ন ডলার সিটি গ্রুপকে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিতে আইন শিথিল করল বাংলাদেশ ব্যাংক সিঙ্গাপুরে প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ ৩৫ সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে চীনা মন্ত্রীর সাক্ষাৎ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারের আহ্বান ঋণ সহায়তার বাইরে কোরিয়ার সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব চায় বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনা ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্পপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে : মাহদী আমিন আর্টিলারি রেজিমেন্টের অধিনায়ক সম্মেলন ও পুনর্মিলনীতে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও গভীর করতে চীনের অঙ্গীকার: লিউ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে কাজ করবে সংসদীয় ককাস

আমদানিতে বড় ধরনের নয়ছয়: বিপিসির ৫৬টি জাহাজ থেকে প্রায় ৩০ লাখ লিটার জ্বালানি তেল উধাও

Reporter Name / ২ Time View
Update : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

দেশের জ্বালানি খাতের আমদানিতে এক বড় ধরনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, যা দেশের অর্থনীতিতে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা জ্বালানি তেল নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা থাকলেও খালাসের সময় কাগজপত্রের হিসাবের সঙ্গে বাস্তব প্রাপ্তির হিসাবে বিরাট গরমিল ধরা পড়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির আমদানি করা জ্বালানি তেলবাহী জাহাজগুলোর খালাস প্রক্রিয়ায় এই বড় ঘাটতির ঘটনা ধরা পড়েছে। বিল অব লেডিং বা বিএল নথির সুনির্দিষ্ট পরিমাণের তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস হওয়া ৫৬টি জাহাজ থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল কম পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য বিদেশ থেকে আমদানি করা এসব জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের সময় মোট দুই হাজার চার শ উনপঞ্চাশ টন জ্বালানি কম পাওয়া গেছে। বিপিসির নির্ধারিত এবং প্রচলিত রূপান্তর হিসাব অনুযায়ী মেট্রিক টন থেকে লিটারে রূপান্তর করলে এই জ্বালানি ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় উনত্রিশ লক্ষ পঁয়ষট্টি হাজার লিটার। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী উধাও হয়ে যাওয়া এই বিশাল পরিমাণ জ্বালানি তেলের আর্থিক মূল্য প্রায় পঁয়চল্লিশ কোটি টাকার কাছাকাছি। রাষ্ট্রীয় খাতের এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ হ্রাসের ঘটনায় বিপিসির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা নড়েচড়ে বসেছেন এবং পুরো বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও গভীর পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।

বিপিসির অভ্যন্তরীণ গোপন নথিপত্র এবং বন্দর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে যে আলোচিত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস হওয়া ওই ৫৬টি জাহাজে বিল অব লেডিং অনুযায়ী মোট ১৭ লক্ষ সিলিং বা টনেরও বেশি জ্বালানি থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে বন্দর থেকে যখন সম্পূর্ণ খালাস সম্পন্ন হয়, তখন দেখা যায় যে মোট প্রাপ্তির পরিমাণ ১৭ লক্ষ ৪৯ হাজার টনের সামান্য বেশি। অর্থাৎ কাগজে-কলমে আমদানির যে হিসেব দেখানো হয়েছিল, তার তুলনায় প্রায় আড়াই হাজার টন জ্বালানি কম বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেড বা এমপিএল এই জাহাজগুলোর খালাস কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল।

জ্বালানির ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এই ঘাটতির সিংহভাগ জুড়েই রয়েছে দেশের শিল্প ও যাতায়াত খাতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হাই স্পিড ডিজেল বা এইচএসডি। কেবল ডিজেলের ক্ষেত্রেই দুই হাজার ছাব্বিশ টনেরও বেশি বা প্রায় চব্বিশ লক্ষ লিটার জ্বালানি কম পাওয়া গেছে। বিপিসির নিজস্ব রূপান্তর হার অনুযায়ী প্রতি টন ডিজেলের বিপরীতে এক হাজার একশ ছিয়াশি লিটার হিসাব করা হয়। এছাড়া পেট্রল এবং অকটেনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রেও প্রায় তিন লক্ষ পঁচাশি হাজার লিটার ঘাটতি রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে বিমান চলাচলে ব্যবহৃত জেট এ-১ জ্বালানিতেও প্রায় এক লক্ষ পঁচাত্তর হাজার লিটার কম পাওয়ার সত্যতা মিলেছে।

জাহাজভিত্তিক হিসাব নিকাশ পর্যালোচনা করলে কিছু কিছু চালানে অস্বাভাবিক এবং রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতির ভয়ংকর চিত্র ফুটে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়মান এমটি টর্ম অ্যাগনেস নামক জাহাজটি থেকে প্রায় ২৬৩ টন ডিজেল কম পাওয়া গেছে। একইভাবে এমটি টর্ম লুইস এবং এমটি লিয়ান সং হু নামক দুটি জাহাজ থেকেও যথাক্রমে ২২২ টন ও ২১৪ টন ডিজেল হাওয়া হয়ে গেছে। এছাড়া বিগত বছরের জুলাই মাসে পিভিটি সোলানা নামক একটি জাহাজে দুই শ টনেরও বেশি মোটর অয়েল কম পাওয়ার ঘটনা পুরো খালাস প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।

এই অস্বাভাবিক ঘাটতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে খালাস কাজের দায়িত্বে থাকা মেঘনা পেট্রোলিয়ামের অপারেশন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মুজিবুর রহমান চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে কিছু জাহাজে পরিমাণের কম পাওয়ার বিষয়টি সত্য। তবে তাঁর দাবি অনুযায়ী এই ঘাটতির হার বিপিসির নির্ধারিত গ্রহণযোগ্য ও সহনীয় সীমার মধ্যেই রয়েছে, যার কারণে এটিকে বড় কোনো অনিয়ম হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তবে দায়িত্বশীল মহলের এই ধরনের দায়সারা বক্তব্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে, কারণ নির্ধারিত সীমার কথা বললেও নির্দিষ্ট কয়েকটি জাহাজে যেভাবে অস্বাভাবিক পরিমাণের তেল উধাও হয়েছে, তাকে কোনোভাবেই সাধারণ ত্রুটি হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে কয়েকটি জাহাজে রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতির বিষয়টি সামগ্রিক গড় হিসাবের আড়ালে লুকিয়ে ফেলার সুপরিকল্পিত চেষ্টা চলছে। তথাকথিত সহনীয় মাত্রার কথা বলে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ তছরুপের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে জাহাজ থেকে তেল খালাসের সময় তাপমাত্রা, ঘনত্ব বা পরিমাপযন্ত্রের সামান্য তারতম্য হওয়া স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হলেও ৫৬টি জাহাজের মধ্যে কয়েকটি জাহাজে অস্বাভাবিক ঘাটতি এবং সাতটি জাহাজে অতিরিক্ত তেল পাওয়ার ঘটনা সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে গভীরভাবে সন্দেহজনক করে তুলেছে।

দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি পরিমাপ ও হিসাব সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আধুনিক অটোমেশন বা মেইন পয়েন্ট ইনস্টলেশন চালুর কথা বলা হলেও রহস্যজনক কারণে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি। পরিমাপ ও তদারকির দায়িত্বে সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল পদ্ধতি বহাল থাকায় জ্বালানি খালাসের প্রতিটি ধাপে কারচুপি বা চুরির সুযোগ থেকে যাচ্ছে। আমদানির বন্দর থেকে শুরু করে ডিপো পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে যদি নির্ভুল ও স্বয়ংক্রিয় হিসাব রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই ধরনের আর্থিক ক্ষতি রোধ করা কখনোই সম্ভব হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বিপিসির পরিচালক ও অপারেশন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে বিষয়টি নিয়ে তারা বর্তমানে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন এবং সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি ধাপে আধুনিক প্রযুক্তি চালুর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে কেবল কথার কথা না বলে বাস্তবে যদি কঠোর মনিটরিং এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা না হয়, তবে দেশের জ্বালানি আমদানির এই লুকোচুরি খেলা বন্ধ হবে না।

আমদানি করা পণ্যের সঠিক ওজন ও পরিমাণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।

ডিপোগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের সময়ও অনেক সময় সঠিক পরিমাপের ব্যত্যয় ঘটে যা সামগ্রিক হিসাবকে আরও জটিল করে তোলে।

জ্বালানি বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে যা সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উচিত অবিলম্বে এই আমদানিকৃত জ্বালানি তেল চুরির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

জাতীয় অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা সুরক্ষায় এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

পরিশেষে বলা যায় যে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থে আমদানিকৃত এই মহামূল্যবান জ্বালানি তেল দেশের স্বার্থে সুরক্ষিত রাখতে হলে বিপিসির অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার কোনো বিকল্প নেই।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category