• বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ০৭:১১ অপরাহ্ন

আরাকান আর্মিতে পাহাড়ি তরুণরা অস্ত্রসহ দেশে ফিরছে

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্ত পরিবেশ ও সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে এক বিপজ্জনক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম, রুমা কিংবা থানচির দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে একদল পাহাড়ি তরুণ সীমান্ত পার হয়ে মিয়ানমারে পাড়ি জমাচ্ছে। সেখানে তারা মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র হয়ে সরাসরি সশস্ত্র লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছে। ওপারে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আগুনে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসব যুবকেরা এখন শুধু যুদ্ধের অভিজ্ঞতাই অর্জন করছে না, বরং সঙ্গে করে নিয়ে আসছে একে-৪৭ এর মতো স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, রকেট লঞ্চার এবং অ্যান্টি-পার্সোনাল মাইনের মতো মরণাস্ত্র। আন্তর্জাতিক সীমান্তে ওপার থেকে আনা এসব অবৈধ ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র এখন দেশের অভ্যন্তরে সেনা টহল ও সীমান্ত রক্ষীদের ওপর হামলায় ব্যবহৃত হচ্ছে, যা গোটা পার্বত্য অঞ্চলে এক চরম অনিশ্চিত ও ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিনের তীব্র সংঘাতে জান্তা বাহিনী তাদের অবস্থান হারালে বুথিডং ও মংডোর মতো কৌশলগত সীমান্ত অঞ্চলগুলোর পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে যায় শক্তিশালী বিদ্রোহী দল আরাকান আর্মির হাতে। সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় জান্তা বাহিনীর এই চরম পরাজয় ও প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে স্বার্থান্বেষী আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো। জাতিগত ও ভৌগোলিক নৈকট্যের অজুহাত দেখিয়ে এবং আধুনিক অস্ত্রের প্রলোভন দিয়ে পাহাড়ি যুবকদের মগজধোলাই করে আরাকান আর্মিতে ভেড়ানো হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে ওপারে যাওয়ার পর তাদের দেওয়া হচ্ছে উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ। সেখানে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র চালানো, বিস্ফোরকের ব্যবহার, নিখুঁত মাইন স্থাপন এবং আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের জটিল সব কৌশল শেখানো হচ্ছে, যা তাদেরকে একেকজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধায় পরিণত করছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব তরুণেরা যখন পাহাড়ি পথ ও নাফ নদীর অরক্ষিত রুট ব্যবহার করে দেশে ফিরছে, তখন তারা কেবল একা ফিরছে না; সীমান্ত পাহারার চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে নিয়ে আসছে মারাত্মক সব সামরিক অস্ত্রের বড় বড় চালান। এর আগে পার্বত্য এলাকার আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর হাতে মূলত সাধারণ ও হালকা মানের অস্ত্র দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে এই অবৈধ সীমান্ত রুটের মাধ্যমে তাদের হাতে অনায়াসে পৌঁছে যাচ্ছে উচ্চ ক্ষমতার রকেট লঞ্চার ও দূরপাল্লার স্বয়ংক্রিয় মরণাস্ত্র। ওপার থেকে আসা এই অদৃশ্য শক্তি ও ভারী অস্ত্রের মদদে পাহাড়ি সংগঠনগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে, যা নিয়মিত সেনা টহলে আকস্মিক হামলা এবং পাহাড়ি-বাঙালি সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য পাহাড়ের এই আকস্মিক উত্তাপ বা অস্থিরতা কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ অপরাধের ঘটনা নয়। এটি মূলত একটি ত্রিমুখী জাতীয় নিরাপত্তা সংকটের রূপ নিয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশি তরুণরা ভিনদেশী সশস্ত্র গোষ্ঠীর ছায়ায় থেকে উচ্চতর যুদ্ধকৌশল শিখছে। দ্বিতীয়ত, মিয়ানমার এবং পার্শ্ববর্তী দেশের সীমান্ত পথকে ব্যবহার করে দেশের ভেতর সামরিক মানের ভারী অস্ত্রের গোপন অনুপ্রবেশ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তৃতীয়ত, অরক্ষিত সীমান্ত এবং লাখ লাখ রোহিঙ্গার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অপরাধী চক্রগুলো অস্ত্র ও মাদকের বিশাল বাজার তৈরি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। যুদ্ধ ফেরত এসব তরুণেরা যখন স্বদেশে ফিরে আঞ্চলিক পাহাড়ি ক্যাডারদের শক্তিবৃদ্ধি করছে, তখন তা কেবল আঞ্চলিক শান্তিশৃঙ্খলার বিষয় থাকছে না; এটি সরাসরি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর এক বড় হুমকি বা ‘রেড অ্যালার্ট’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

পার্বত্য অঞ্চলের এই বিপজ্জনক আগুন নেভাতে হলে কেবল সাময়িক সেনা টহল বা সাধারণ নজরদারি যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছেন গোয়েন্দা ও সামরিক বিশ্লেষকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রকে বহুমাত্রিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সর্বপ্রথমে যেসব মধ্যস্থতাকারী বা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাহাড়ি তরুণেরা সীমান্তের ওপারে যাচ্ছে, সেই রিক্রুটমেন্ট চেইন চিহ্নিত করে দ্রুত উপড়ে ফেলতে হবে। একই সাথে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ অস্ত্রের গোপন রুট ও সন্ত্রাসীদের আস্তানাগুলো চিরতরে নির্মূল করা প্রয়োজন। সীমান্ত সুরক্ষায় কূটনৈতিক স্তরে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে সংলাপ জোরদার করার পাশাপাশি অরক্ষিত পুরো সীমান্তে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া এবং আধুনিক ড্রন ও নজরদারি প্রযুক্তি স্থাপন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় তাগিদ। সীমান্তে চলা এই ধ্বংসাত্মক খেলা অনতিবিলম্বে বন্ধ করা না গেলে দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম যেকোনো মুহূর্তে এক নিয়ন্ত্রহীন ও ভয়াবহ বিস্ফোরক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category