স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রাচীন, বিস্তৃত এবং জনঘনিষ্ঠ স্তর হলো ইউনিয়ন পরিষদ। গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের কাছে এই প্রতিষ্ঠানটি আক্ষরিক অর্থেই হাতের কাছের সরকার হিসেবে পরিচিত। জন্মনিবন্ধন ও নাগরিকত্ব সনদ থেকে শুরু করে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুষম বণ্টন এবং স্থানীয় পর্যায়ের ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে দেশের এই তৃণমূল শাসনব্যবস্থায় এক ধরনের প্রতিনিধিত্বের সংকট ও প্রশাসনিক স্থবিরতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের প্রায় প্রতিটি স্তরেই জনপ্রতিনিধি শূন্যতার সৃষ্টি হয়। বহু ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় এবং অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরিয়ে প্রশাসক কিংবা প্যানেল চেয়ারম্যান দিয়ে কাজ চালানোর ফলে সেবা প্রাপ্তিতে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের প্রায় চার হাজার তিনশটি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনের চূড়ান্ত পথনকশা ঘোষণা করেছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। নতুন সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২৭ মের মধ্যে মোট পাঁচটি ধাপে এই বিশাল নির্বাচনযজ্ঞ সম্পন্ন করা হবে।
তবে এই চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণার পেছনের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না; বরং বারবার তারিখ পরিবর্তন, রাজনৈতিক মতভিন্নতা এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যকার সমন্বয়হীনতার বিষয়টি একাধিকবার সামনে এসেছে। ফিরে তাকালে দেখা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে হবে নাকি জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগে হবে—তা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই সময় জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো দলগুলো জাতীয় নির্বাচনের আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জোর দাবি তুলেছিল এবং এ নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছিল। কিন্তু দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি শুরু থেকেই জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনের ঘোর বিরোধী ছিল। বিএনপির সেই অনড় অবস্থানের কারণে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার আর স্থানীয় নির্বাচনের পথে হাঁটেনি; বরং রাজনৈতিক বাস্তবতায় গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট সম্পন্ন করে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব এসে বর্তায় বর্তমান বিএনপি সরকারের ওপর।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও ইউপি নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। চলতি বছরের জুনের শুরুতে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, আগস্টেই ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে এবং অক্টোবর থেকে শুরু হতে পারে ভোটগ্রহণ। কিন্তু সেই প্রাথমিক ভাবনা বাস্তবের মুখ দেখেনি। এরপর গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের প্রাক-প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে, আগামী ১২ নভেম্বর থেকে শুরু করে সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইসির এই ঘোষণার পরদিনই বাধে নতুন বিপত্তি। ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম প্রকাশ্যেই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন যে, নির্বাচনের এই তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনাই করেনি। আইনগতভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের চাহিদা ও মতামতের প্রাধান্য থাকলেও দুই প্রতিষ্ঠানের এই প্রকাশ্য সমন্বয়হীনতা রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নতুন করে সংশয় তৈরি করে। সরকারের এই অনাগ্রহ এবং পরবর্তীতে ১৭ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে বৈঠকে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বার্ষিক পরীক্ষা, বিশ্ব ইজতেমা, দুটি ঈদ এবং পুলিশের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অসুবিধার কথা সামনে আসায় ইসি তাদের ১২ নভেম্বরের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। এমনকি ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে সংলাপের সূচি ঠিক করা হয়েছিল, সেটিও স্থগিত হয়ে যায়।
এক মাসের ব্যবধানে গত ১২ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন পুনরায় বৈঠকে বসে সাত ধাপের পরিবর্তে পাঁচ ধাপে নির্বাচনের নতুন এই সময়সূচি চূড়ান্ত করে। ঘোষিত নতুন সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপে দেশের ৮০টি উপজেলার প্রায় ৮০০টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ, ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপ, ১৩ মে চতুর্থ ধাপ এবং সর্বশেষ ২৭ মে পঞ্চম ধাপের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউপির মধ্যে নির্বাচন উপযোগী প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি পরিষদের নির্বাচন শেষ করা হবে। প্রতিটি ধাপের ভোটগ্রহণের দিন বৃহস্পতিবার নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এবার কেন্দ্রীয়ভাবে ইসি থেকে তফসিল ঘোষণা না করে ভোটের ৩৮ থেকে ৪৫ দিন আগে সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই স্থানীয়ভাবে তফসিল ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কৌশলগত কারণে শুরুতে জেলা সদরের কাছাকাছি এবং পরবর্তীতে উপজেলা সদরের আশপাশের ইউপিগুলোতে ভোট নেওয়া হবে, যাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সমন্বিতভাবে মোতায়েন করা সহজ হয়। এছাড়া এবারের নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার না করারও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
বারবার তারিখ পরিবর্তনের এই নাটকীয়তা শেষে নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হলেও, দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্বাচনের পরিবেশ ও গ্রহণযোগ্যতা। একসময় গ্রামবাংলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন মানেই ছিল পাড়ায়-মহল্লায় চায়ের দোকানে আড্ডা, পোস্টার-মাইকিং আর সর্বজনীন উৎসবের আমেজ। কিন্তু বিগত দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে স্থানীয় সরকারের এই প্রাণবন্ত নির্বাচনগুলোকে চরম প্রহসন ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ক্ষেত্র বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। বিশেষ করে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের প্রচলন করে গ্রামীণ সমাজকাঠামোর চিরায়ত ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সম্প্রীতিকে রাজনৈতিকভাবে বহুধাবিভক্ত ও ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের একক আধিপত্য বিস্তার, ভোটকেন্দ্র দখল, প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল মারা, বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার এক কলঙ্কজনক অপসংস্কৃতি চালু হয়েছিল। নির্বাচনী সহিংসতায় অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ও ঘরবাড়ি ভাঙচুরের সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনো সাধারণ মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। তৎকালীন নির্বাচন কমিশনগুলোর নতজানু ও আজ্ঞাবহ ভূমিকার কারণে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর থেকেই দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় নেমে গিয়েছিল।
সেই বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন বর্তমান নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা। আশার কথা হলো, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না। নির্দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ার ফলে তৃণমূলের প্রকৃত জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সামনে আসার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনও যেকোনো মূল্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে ইতিবাচক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই আলোকেই ইউপি নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায় কমিশন। নির্বাচনী অপরাধ দমনে এবার স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালায় বড় ধরনের সংশোধনী এনে কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালার ৮০(ক) বিধি অনুযায়ী, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কাজে বাধা দেওয়া, কিংবা গণমাধ্যমকর্মী ও পর্যবেক্ষকদের দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও তাদের সরঞ্জাম নষ্ট করাকে সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। একইসঙ্গে কোনো ভোটারকে কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া কিংবা কোনো প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র দাখিল বা প্রত্যাহারে বাধ্য করার চেষ্টা করলে অপরাধীকে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, দশ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মাঠপর্যায়ে জুডিশিয়াল ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের পাশাপাশি আচরণবিধি লঙ্ঘন পর্যবেক্ষণে বিশেষ মনিটরিং কমিটি গঠন করা হবে। কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্ট কিংবা তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্মতিতে কেউ পেশিশক্তি প্রদর্শন বা বিধিমালা লঙ্ঘন করলে তাৎক্ষণিক তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করার একচ্ছত্র ক্ষমতাও কমিশনের হাতে রাখা হয়েছে। এছাড়া কারচুপি বা বলপ্রয়োগের কারণে কোনো কেন্দ্রের ফলাফল পক্ষপাতদুষ্ট মনে হলে তাৎক্ষণিকভাবে ফল স্থগিত করে পুনরায় ভোটগ্রহণের নির্দেশ দিতে পারবে ইসি।
কাগজে-কলমে নির্বাচন কমিশনের এই কঠোর বিধিমালা ও হুঁশিয়ারি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং আশাজাগানিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতির বাস্তবতায় কেবল কঠোর আইন দিয়েই সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, যদি না এর পেছনে সরকারের আন্তরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনের শতভাগ নিরপেক্ষতা থাকে। মনে রাখতে হবে, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে, যেখানে কোনো বিশেষ দলের রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল না। কিন্তু আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি নির্বাচিত দলীয় সরকারের অধীনে। ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। এছাড়া জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মতো বিরোধী দলগুলো ইতিমধ্যে সরকার ও ইসির মধ্যকার সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে এনে সুষ্ঠু ভোট হওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে এবং এই নির্বাচনকে সরকার ও ইসির জন্য অ্যাসিড টেস্ট হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল বিএনপিও তাদের ৩১ দফার অঙ্গীকার অনুযায়ী শক্তিশালী স্থানীয় সরকার গঠনের কথা বলছে এবং তৃণমূলে একক প্রার্থী দেওয়ার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমও আশ্বস্ত করেছেন যে, সরকার প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ রেখেছে এবং কোনো ধরনের নির্বাচনী বিতর্ক বা কলঙ্কের দায় সরকার নিতে চায় না।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য ইউপি নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে এককভাবে কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের ওপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশন যেমন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তেমনি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে সরকারের কারিগরি, আর্থিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতাও অপরিহার্য। শুরুতে তারিখ ঘোষণা নিয়ে সরকার ও কমিশনের মধ্যে যে দূরত্বের চিত্র দেখা গিয়েছিল, তা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে একটি যৌক্তিক সময়ে পৌঁছানো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। নভেম্বর-ডিসেম্বরের পরিবর্তে জানুয়ারিতে নির্বাচন শুরুর সিদ্ধান্তটি আবহাওয়া, পাবলিক পরীক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতির বিচারে বেশ বাস্তবসম্মত। এখন প্রয়োজন পারস্পরিক দোষারোপ বা সন্দেহের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে সব পক্ষের একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা।
নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে তৃণমূল থেকে মজবুত করতে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সফল ও বিতর্কমুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। এই নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন থাকবে না এবং বড় দলগুলোর অলিখিত সমর্থন ও প্রভাব সেখানে স্বাভাবিক নিয়মেই কাজ করবে। এমতাবস্থায়, ক্ষমতাসীন দলকে যেমন নিজেদের নেতাকর্মীদের সংযত রেখে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের মানসিকতা থেকে দূরে থাকতে হবে, তেমনি বিরোধী দলগুলোকেও কেবল শঙ্কা প্রকাশ না করে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের মনোবলে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠে তাদের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া সরকারেরই দায়িত্ব। একইভাবে নির্বাচন কমিশনকেও কেবল বিধিমালা সংশোধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে তার নিরপেক্ষ ও সাহসী প্রয়োগ ঘটিয়ে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। কোনো বিশেষ পক্ষকে সুবিধা দেওয়া বা কাউকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ঘায়েল করার পুরোনো কৌশল বর্জন করে জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা গ্রামের সাধারণ ভোটারদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া উচিত। রক্তপাত, হানাহানি আর কেন্দ্র দখলের কালো অধ্যায় পেরিয়ে গ্রামবাংলায় আবারও ভোটের সেই চিরচেনা আনন্দমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরে আসুক—একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।