• শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৯ অপরাহ্ন

ইনানীতে রিসোর্টে আগুনে পুড়ে একই পরিবারের ৬ জনসহ নিহত ১০

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

পর্যটন নগরী কক্সবাজারের উখিয়ায় সমুদ্র সৈকতসংলগ্ন মেরিন ড্রাইভ সড়কের একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের ছয় সদস্যসহ অন্তত ১০ পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় দগ্ধ ও গুরুতর আহত অবস্থায় আরও ছয়জনকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে সাতজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেলেও বাকি তিনজনের মরদেহ আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হওয়ায় তাদের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। এদিকে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় বিকেলে রিসোর্টের ম্যানেজারকে আটক করেছে পুলিশ। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, কাঁচামাল ও কাঠের তৈরি ওই দোতলা রিসোর্টটির কোনো বৈধ অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। এমনকি গত জুন মাসে অগ্নিনিরাপত্তা ঝুঁকি চিহ্নিত করে সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও তা আমলে না নিয়েই অবৈধভাবে পর্যটকদের আবাসন ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল কর্তৃপক্ষ।

প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল সোয়া সাতটার দিকে কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে উখিয়া উপজেলার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় সমুদ্রের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট’-এ আকস্মিক এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। ঘটনার খবর পেয়ে উখিয়া ও কক্সবাজার সদর ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট দ্রুত উদ্ধার অভিযানে নামে। তবে নিকটস্থ ফায়ার স্টেশন থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার হওয়ায় গাড়ি পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে। ফায়ার সার্ভিসের দমকলকর্মীরা প্রায় সোয়া আটটার দিকে পরিস্থিতি আংশিক নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও সকাল ১০টা নাগাদ মূল আগুন আয়ত্তে আসে এবং দীর্ঘ প্রায় চার ঘণ্টার চেষ্টায় বেলা ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়। ততক্ষণে দোতলা রিসোর্টটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, সৈকতঘেঁষা দৃষ্টিনন্দন ওই রিসোর্টের কাঠামোটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দোতলা এই ভবনের নিচতলায় রেস্তোরাঁ ও রান্নাঘর এবং ওপরের তলায় ছিল পর্যটকদের থাকার সুব্যবস্থা। ভবনটির একপাশে ইটের পাকা দেয়াল থাকলেও বাকি বেশিরভাগ অংশ কাঠ, বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। শনিবার সকালে যখন নিচতলার দিক থেকে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে, তখন দোতলার অতিথি কক্ষগুলোতে পর্যটকরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। কাঠের তৈরি দ্রুত প্রজ্বলনীয় অবকাঠামো হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই আগুনের শিখা পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে এবং ওপরের তলার যাত্রীদের বের হওয়ার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ঘুমন্ত অবস্থাতেই ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ও আগুনে পুড়ে করুণ মৃত্যুর শিকার হন পর্যটকরা। আগুন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রিসোর্টে কর্মরত কর্মচারীরা পর্যটকদের উদ্ধারের কোনো চেষ্টা না করেই ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

উদ্ধার অভিযানের পর ঘটনাস্থল থেকে একে একে ১০ জনের অঙ্গার হওয়া মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায় ফায়ার সার্ভিস। নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত সাতজনের সুনির্দিষ্ট পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তারা হলেন রাজধানীর রামপুরা বনশ্রী এলাকার ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁও এলাকার লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিস তেহামী (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও তার পাঁচ বছরের শিশুসন্তান ফায়িজান আহম্মেদ এবং আশুলিয়ার নাসরিন আকতার মুক্তা (২৮)। নিহতদের মধ্যে লায়লা জাহান নাবিলা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং নাফিস তেহামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। বাকি তিনটি মরদেহ আগুনে এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বয়স বা লিঙ্গ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুল আহাদ সরকার জানান, নিহতদের মধ্যে ছয়জনই তার একই পরিবারের সদস্য। তারা সম্পর্কে তার খালাতো ও ফুফাতো ভাইবোন এবং তাদের সন্তান। তিনি জানান, ঢাকা থেকে ছুটি কাটাতে তারা সবাই একসঙ্গে ইনানীর এই রিসোর্টে উঠেছিলেন। শনিবার সকালেই সবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার চূড়ান্ত কথা ছিল। ব্যাগ গুছিয়ে সকালের গাড়ির জন্য অপেক্ষা ও বিশ্রামের সময় হঠাৎ এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড ঘটে। অন্যদিকে রিসোর্টে থাকা পর্যটকদের মধ্যে দুজন ঘটনার ঠিক কিছুক্ষণ আগে সকালে সমুদ্রের পারে হাঁটতে বের হওয়ায় তারা অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ ও আহত ছয়জনকে দ্রুত উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আহতরা হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডাক্তার শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিসা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) এবং সামিদা (৩২)। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে চারজনের শরীরে মারাত্মক পোড়ার ক্ষত থাকায় তাদের ভর্তি রেখে নিবিড় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং বাকি দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে পাটুয়ারটেক এলাকা থেকে টুপটুপ রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে পুলিশ। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘটনার পর কর্মচারীরা আত্মগোপন করলেও অভিযান চালিয়ে ম্যানেজারকে আটক করা হয়েছে। তাকে থানায় নিয়ে অগ্নিনিরাপত্তার অভাব, অতিথি তালিকা এবং রিসোর্টের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ঘটনায় অবহেলাজনিত মৃত্যু ও নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের দায়ে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

অন্যদিকে দুপুরে রাজধানীর গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়ায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানান, টুপটুপ রিসোর্টের কোনো অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স বা ফায়ার ছাড়পত্র ছিল না। তিনি উল্লেখ করেন, গত জুন মাসেই ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক দল রিসোর্টটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে মারাত্মক অগ্নিঝুঁকি চিহ্নিত করেছিল এবং দ্রুত সুরক্ষাব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে সতর্কবার্তা ও আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রিসোর্ট মালিকপক্ষ সেই সতর্কবার্তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে অনুমোদন ছাড়াই পর্যটন কার্যক্রম চালু রেখেছিল। মহাপরিচালক আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে কাঠের তৈরি অপরিকল্পিত স্থাপনায় নিচতলায় রেস্তোরাঁ ও ওপরের তলায় আবাসন তৈরি করায় ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এসব অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এ মান্নান ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয়রা কেউ কেউ রেস্তোরাঁর রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার বা চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করলেও তদন্ত ছাড়া সুনির্দিষ্ট কারণ বলা যাবে না। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং প্রশাসনিক দায়দায়িত্ব নির্ধারণে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানিয়েছেন, স্থানীয় ও রেজিস্ট্রি সূত্রে জানা গেছে শুক্রবার রাতে রিসোর্টটিতে ২০ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন, যাদের মধ্যে দুজন সকালে আগেই চেকআউট করে চলে যান। ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময় ভেতরে ১৮ জন উপস্থিত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা অজ্ঞাত বাকি তিনটি মরদেহের পরিচয় নিখুঁতভাবে নিশ্চিত করতে দ্রুত ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category