শিক্ষা খাতের অন্যতম বড় পাবলিক পরীক্ষা উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের একটি বিশাল অংশের অনুপস্থিতি এক নেতিবাচক রেকর্ডের জন্ম দিয়েছে। সরকারি তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুই বছর আগে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশই এবার চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। প্রতি বছরই এই স্তরের পাবলিক পরীক্ষায় কিছু শিক্ষার্থী নানা কারণে ফর্ম পূরণ করা থেকে বিরত থাকে, তবে এবারের অনুপস্থিতির এই উচ্চ হারকে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং চরম উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করছেন। প্রায় সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থীর এই আকস্মিক ছিটকে পড়া দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর কোনো সংকট বা কাঠামোগত দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
১১টি শিক্ষা বোর্ডের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০ Screen২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর দেশজুড়ে প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে নিজেদের নাম সরকারিভাবে নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেছিল। কিন্তু দুই বছরের মাথায় এসে দেখা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে কেবল সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমানের চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য ফর্ম পূরণ সম্পন্ন করেছে। অর্থাৎ, বাকি সাড়ে ৫ লাখ নিয়মিত শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাজীবনের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি সম্পূর্ণ করার আগেই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা থেকে দূরে সরে গেছে। গত বছরের তুলনায় এই ঝরে পড়ার হার প্রায় ৭ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে শিক্ষার আলো সব শিক্ষার্থীর কাছে সমানভাবে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কোথাও বড় ধরনের অন্তরায় তৈরি হয়েছে।
বোর্ডভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে শোচনীয় ও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ক্ষেত্রে। এই বোর্ডে নিবন্ধিত নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থী চূড়ান্ত পরীক্ষার ফর্মই পূরণ করেনি। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৩৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৪৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ নিয়মিত শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষা দেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে বাইরে রয়ে গেছে। প্রতিটি বোর্ডেই গত বছরের তুলনায় এই অনুপস্থিতির হার ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। কেবল ফর্ম পূরণের সময়ই এই ঘাটতি সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরীক্ষার প্রথম দিনেই হাজার হাজার শিক্ষার্থীর কেন্দ্রে অনুপস্থিত থাকার যে ক্রমবর্ধমান প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে।
কেন এত বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী শিক্ষাজীবনের মাঝপথ থেকে আকস্মিকভাবে হারিয়ে যাচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক কোনো কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করতে পারেনি শিক্ষা বিভাগ। তবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে অতীতে মাধ্যমিক পর্যায়ের অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের ওপর করা একটি ক্ষুদ্র গবেষণা থেকে এই সংকটের কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ আঁচ করা যায়। সেই বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল, পরীক্ষা না দেওয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ—প্রায় ৪১ শতাংশ—বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছিল। ছাত্রীদের ক্ষেত্রে অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ের এই সামাজিক ব্যাধি যেমন শিক্ষার পথে বড় বাধা, তেমনি ছাত্রদের ক্ষেত্রে পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে অল্প বয়সেই উপার্জনের জন্য শ্রমবাজারে বা কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়া আরেকটি প্রধান কারণ। এর বাইরে, ক্লাসের পড়াশোনা বুঝতে না পারা এবং চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবকেও অনেকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের নীতিনির্ধারকদের মতে, দুই বছরের দীর্ঘ সময়ে এই শিক্ষার্থীরা ঠিক কোন মুহূর্তে পড়াশোনা থেকে ছিটকে যাচ্ছে, তা নিখুঁতভাবে জানার জন্য একটি বড় পরিসরের গবেষণা জরুরি।
এই সংকটজনক বাস্তবতার মধ্যেও দেশজুড়ে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণে ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে। পরীক্ষা পদ্ধতিকে আরও স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবার বেশ কিছু নতুন প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এবারই প্রথম নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে সম্পূর্ণ অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, এবং আগামী বছর থেকে মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের ক্ষেত্রেও আবশ্যিক বিষয়গুলোর প্রশ্ন অভিন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরীক্ষার নিরাপত্তা ও প্রশ্ন ফাঁসের মতো অপপ্রচার রোধে কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে বিশেষ ‘বডি-ওর্ন ক্যামেরা’ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও পরীক্ষা চলাকালীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেকোনো ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ঝরে পড়ার এই অনাকাঙ্ক্ষিত চিত্র নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, শিক্ষা ব্যবস্থার এই বড় ধরনের দুর্বলতা ও ফাঁকফোকরগুলো চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে। মাঠপর্যায়ের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আগামী দিনে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষার্থীকে মাঝপথ থেকে এভাবে হারিয়ে যেতে না হয়। দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা না দেওয়ার বিষয়টি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেবল পরীক্ষা-কেন্দ্রিক না করে তা যাতে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার মতো আকর্ষণীয় ও অর্থবহ হয়, সেদিকেই এখন নীতিনির্ধারকদের মূল মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো