• শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৮ পূর্বাহ্ন
Headline
উন্নয়নের মরীচিকা ও মেগা প্রকল্পের ফাঁদ: প্রতিশ্রুতির আড়ালে একই খাদের কিনারে অর্থনীতি মোংলা বন্দর ঘুরে দেখলেন প্রধানমন্ত্রী আমি শোকর করি, কারণ… রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আগুন, ৪০ রোগী আহত পিএইচপির ত্রুটি: ঝুঁকিতে লাখো ওয়েবসাইট, বিশ্বজুড়ে সাইবার সতর্কতা ধেয়ে আসছে সুপার টাইফুন, ঘণ্টায় গতিবেগ ২২৭ কিলোমিটার ৫৯২ কোটি টাকায় দুই কূপ খনন, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ‘বিপুল গ্যাস’ প্রধানমন্ত্রীর সফরে টোকিওতে থাকবেন না রাষ্ট্রদূত, সমন্বয়ে পররাষ্ট্রসচিব রূপগঞ্জে ট্রাকের ধাক্কায় অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত, আহত ৩ ৭ দল নিয়ে ‘সমমনা ইসলামী দল’ ঘোষণা, একসঙ্গে চলার অঙ্গীকার

উন্নয়নের মরীচিকা ও মেগা প্রকল্পের ফাঁদ: প্রতিশ্রুতির আড়ালে একই খাদের কিনারে অর্থনীতি

রিন্টু আনোয়ার / ০ Time View
Update : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

মানুষের মনস্তত্ত্ব বড়ই অদ্ভুত। আমরা চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ছোটখাটো অনিয়ম বা দুর্নীতিতে যতটা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাই, বিশাল আকারের রাষ্ট্রীয় লুটপাটের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই নির্বিকার থাকি। এর কারণ সম্ভবত এই যে, একটি নির্দিষ্ট সীমার পর বড় সংখ্যার অংকগুলো সাধারণ মানুষের কাছে কেবলই কিছু শূন্যের সমাহার বলে মনে হয়। তারা সেই সংখ্যার প্রকৃত বিশালত্ব অনুধাবন করতে পারেন না। ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার যে ভয়াবহ তথ্য সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং খোদ রাষ্ট্রযন্ত্রের গবেষণায় উঠে এসেছিল, তা নিয়ে জনপরিসরে বা চায়ের দোকানে তেমন কোনো উত্তাপ ছড়ায়নি। অথচ সেই একই সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের ভল্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের ৮৩২ ভরি স্বর্ণ পাওয়ার খবরে সারা দেশ তোলপাড় হয়েছিল। সাড়ে আট কোটি টাকার স্বর্ণ মানুষের মনে যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, ২৮ লাখ কোটি টাকার পাচার তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি। এমনকি জনপ্রতিনিধিদের খেজুরের হিসাব নিয়ে মফস্বলে যে তুমুল বিতর্ক হয়েছিল, রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে উধাও হয়ে যাওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে তার সিকিভাগ আলোচনাও হয়নি। একজন সাধারণ মানুষ, যিনি জীবনে হয়তো একসঙ্গে দশ লাখ টাকাও দেখেননি, তার কাছে এক হাজার কোটি টাকা আর আঠাশ লাখ কোটি টাকার মধ্যে গুণগত কোনো পার্থক্য নেই। দুই-ই তার কাছে শুধুই ‘অনেক টাকা’। আর এই মনস্তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতার সুযোগটিই যুগে যুগে কাজে লাগিয়ে আসছে আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের মদদপুষ্ট আমলাতন্ত্র।

অর্থনীতিবিদরা প্রায়শই একটি কথা বলেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতি বা লুটপাট করার সবচেয়ে মোক্ষম, ধ্রুপদী এবং নিরাপদ হাতিয়ার হলো ভৌত অবকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার নির্মাণ। শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, গবেষণা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা দারিদ্র্য বিমোচনের মতো মানবিক খাতগুলোতে বিনিয়োগ না করে, কংক্রিটের ইমারত আর পিচঢালা রাস্তার মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়ার পেছনে যে কেবলই দেশের উন্নয়ন ভাবনা কাজ করে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক নিখুঁত ও ঝুঁকিহীন বন্দোবস্ত। আর এই বন্দোবস্তের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সাধারণ জনগণ, যাদের ঘামের টাকায় এই ঋণের বোঝা শোধ করতে হয়।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার পরিবর্তন হয়, নতুন নেতৃত্ব আসে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার মজ্জায় লুকিয়ে থাকা লুটপাটের এই মেগা সংস্কৃতি কি আদৌ বদলায়? এই প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বিগত নির্বাচনের আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের শেষের দিকে, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বারবার একটি জোরালো বার্তা দেওয়া হয়েছিল। দলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, “বিএনপির অন্যতম লক্ষ্য হলো আমরা কোনো মেগা প্রকল্পে যাব না। মেগা প্রকল্প মানেই মেগা দুর্নীতি। রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্যের উন্নতির পেছনে খরচ করতে হবে।” তারও আগে, বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলে কংক্রিটের মেগা প্রকল্পের বদলে দেশের মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের ওপর জোর দেবেন। জনবান্ধব ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখানো এই প্রতিশ্রুতিগুলো সাধারণ মানুষকে দারুণভাবে আশান্বিত করেছিল।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সরকার গঠনের মাত্র তিন মাসের মাথাতেই সেই প্রতিশ্রুতির উল্টো পথে হাঁটা শুরু করেছে নতুন প্রশাসন। একের পর এক মেগা প্রকল্পের অনুমোদন এবং বিগত সরকারের নেওয়া অবাস্তব প্রকল্পগুলোর ব্যয় দ্বিগুণ করে তা চালিয়ে নেওয়ার যে প্রবণতা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা রীতিমতো অশনিসংকেত। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তড়িঘড়ি করে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই প্রকল্পের কারিগরি দিক নিয়ে কোনো হালনাগাদ গবেষণা হয়নি। ২০১৩ সালে করা একটি সেকেলে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ওপর ভিত্তি করে এক যুগ পর এত বড় একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। গত এক যুগে নদীর গতিপথ, নাব্যতা এবং সামগ্রিক ইকোসিস্টেমে যে বিপুল পরিবর্তন এসেছে, তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এই ব্যারাজ নির্মাণ কতটা আত্মঘাতী হতে পারে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

মেগা প্রকল্পের এই মোহ এখানেই থেমে নেই। সম্প্রতি তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার, যার সম্মিলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট’-এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে, বিগত সরকারের আমলে নেওয়া দুটি প্রকল্প—বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর ও পূর্বাচল পর্যন্ত ‘এমআরটি লাইন-১’ এবং হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ‘এমআরটি লাইন-৫ নর্দান রুট’-এর ব্যয় সংশোধন করে প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। সংশোধিত ব্যয় অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-১ এর পেছনে খরচ হবে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকার বেশি এবং নর্দান রুটের পেছনে যাবে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। অথচ প্রাথমিকভাবে এই দুই প্রকল্পের ব্যয় ছিল যথাক্রমে ৫২ হাজার ও ৪১ হাজার কোটি টাকার মতো।

এই বিপুল অংকের টাকার হিসাবটা একটু সহজ করে বোঝা যাক। চালের কেজি যদি ৭০ টাকাও ধরা হয়, তবে দেশের ২০ কোটি মানুষকে তিনবেলা ভরপেট ভাত খাওয়াতে এক বছরে খরচ হবে ৯৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি কিংবা বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত একেকটি মেট্রোরেল বানাতে যে পরিমাণ টাকা খরচ করা হচ্ছে, তা দিয়ে সারা বাংলাদেশের মানুষকে এক বছর বিনা পয়সায় খাওয়ানো সম্ভব। অথচ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালা হচ্ছে ঢাকা শহরের উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং সংলগ্ন এলাকার গুটিকয়েক সুবিধাভোগী মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য। দেশের বাকি ৯৯.৯৯ শতাংশ মানুষের এই মেট্রোরেলের সাথে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই, তারা হয়তো জীবনে কোনোদিন এই রেলে চড়তেও আসবেন না। কিন্তু তাদের পকেট কেটেই এই ঋণের কিস্তি শোধ করা হবে।

সবচেয়ে ভয়াবহ প্রহসনটি হচ্ছে এমআরটি লাইন-১ অর্থাৎ বিমানবন্দর-কমলাপুর এবং পূর্বাচল রুটের ক্ষেত্রে। এই রুটে যানজট নিরসনের নামে আমরা ইতোমধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেছি। কমলাপুরকে সরাসরি বিমানবন্দরের সাথে যুক্ত করতে ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’র প্রথম ধাপের কাজ শেষ হয়েছে, যার বাকি কাজ চলমান। অন্যদিকে, বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচল যাওয়ার জন্য ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ে। অর্থাৎ, এই পথে যানজট থাকার কোনো যৌক্তিক কারণই নেই। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, যানজটমুক্ত এই একই রুটে এখন ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করে মেট্রোরেল বানানো হচ্ছে। এমনকি ১৪ হাজার কোটি টাকায় বানানো ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ের একটি অংশ ভেঙে সেখানে মেট্রোরেলের পিলার বসানোর মতো আত্মঘাতী কাজও করা হচ্ছে। একই রুটে এতগুলো সমান্তরাল মেগা প্রকল্পের এই বিপুল অপচয় বিশ্বের আর কোনো দেশে সম্ভব কি না, তা গবেষণার দাবি রাখে।

অনেকেই ভাবতে পারেন, একজন বেকার যুবক বা সাধারণ গৃহিণী তো আর সরকারকে সরাসরি আয়কর দেন না, তাহলে মেগা প্রকল্পের এই ব্যয়ে তাদের কী আসে যায়? এটি একটি মস্ত বড় ভুল ধারণা। রাষ্ট্রের প্রতিটি মেগা প্রকল্পের মাশুল সাধারণ মানুষকে কড়ায় গণ্ডায় মেটাতে হয়। আপনি যখন বাজার থেকে একটি সাবান কেনেন, তখন আপনি ভ্যাট দেন। সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের বিপুল ঘাটতি মেটাতে দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে আপনার সাংসারিক খরচের ওপর। জ্বালানির দাম বাড়লে বাড়ে পরিবহন খরচ, ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের দাম আকাশ ছুঁয়ে যায়। বছরের পর বছর ব্যাংকে জমানো আপনার টাকার মান কমে যায় মূল্যস্ফীতির কারণে। এভাবেই এক কলমের খোঁচায় আপনার অজান্তেই আপনার পকেট, আপনার আলমারি লুট হয়ে যায় মেগা প্রকল্পের নামে।

আমাদের গণমাধ্যমে প্রায়ই একটি কথা অত্যন্ত সাবলীলভাবে প্রচার করা হয় যে, অমুক প্রকল্পে জাইকা, এডিবি বা বিশ্বব্যাংক এত হাজার কোটি টাকা ‘দিবে’। খবরটি এমনভাবে পরিবেশন করা হয়, যেন বিদেশি সংস্থাগুলো আমাদের ভালোবেসে অনুদান বা সাহায্য দিচ্ছে। বাস্তবতা হলো, এগুলো সবই কঠিন শর্তযুক্ত ঋণ। আজ থেকে দশ বা পনেরো বছর পর সুদসহ এর প্রতিটি পয়সা দেশের মানুষকে পরিশোধ করতে হবে। শুধু তাই নয়, ঋণ দেওয়ার সময় এই বিদেশি সংস্থাগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে শর্ত জুড়ে দেয় যে, দরপত্রে দেশীয় বা কম খরচে কাজ করতে সক্ষম এমন কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারবে না। ফলশ্রুতিতে, বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যে দাতা দেশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেই (যেমন- জাপানি বা কোরিয়ান কোম্পানি) কাজ দিতে হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় কৃত্রিমভাবে কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

মেগা প্রকল্পের ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক কারসাজির আরও একটি ভয়ংকর দিক হলো ‘হিডেন কস্ট’ বা লুক্কায়িত ব্যয়। ধরুন, আপনি একটি বাড়ি বানাবেন। বাড়ি তৈরির মোট খরচের মধ্যে ইট-বালু-সিমেন্টের পাশাপাশি গাছ কাটা, জমি তৈরি, সংযোগ সড়ক নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন টানার খরচও অন্তর্ভুক্ত থাকে। কেউ জিজ্ঞেস করলে আপনি সামগ্রিক খরচটাই বলবেন। কিন্তু আমাদের দেশের প্রকল্পগুলোতে মূল অবকাঠামোর খরচটি সামনে এনে আনুষঙ্গিক খরচগুলোকে সুকৌশলে আড়াল করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমরা জানি পদ্মা সেতু নির্মাণে ৩০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু এই সেতুর জন্য নদী শাসন, জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, সংযোগ সড়ক নির্মাণ, পরিবেশের ক্ষতি প্রশমন এবং জাদুঘর নির্মাণের জন্য যে আলাদা আলাদা ডজনখানেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তার হিসাব মূল ব্যয়ে দেখানো হয় না। সব মিলিয়ে ওই সেতুর পেছনে প্রকৃত ব্যয় হয়তো ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। মেট্রোরেলের ক্ষেত্রেও আমরা ঠিক একই প্রতারণার শিকার হচ্ছি। সেনাবাহিনী দিয়ে ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর, জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন এবং পরিবেশ রক্ষার নামে যে হাজার হাজার কোটি টাকার আলাদা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, তা মূল প্রকল্পের ব্যয়ে দেখানো হচ্ছে না।

প্রকল্পের মেয়াদ এবং ব্যয় বৃদ্ধির সংস্কৃতি তো আমাদের মজ্জাগত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০৩৪ সালে যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা, আমরা নিশ্চিতভাবে জানি সেটি ২০৪২ সালের আগে শেষ হবে না। ষাট শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর নকশায় ভুল বা অন্য কোনো ঠুনকো অজুহাতে আমলারা ঠিকই প্রকল্পের বাজেট আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে নেবেন।

উন্নয়নের এই ভ্রান্ত দর্শনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাদের নগর পরিবহন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির প্রকৃত অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও প্রকৌশলীরা বারবার সতর্ক করে আসছেন। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হকের মতে, ঢাকার যানজট নিরসনে মেট্রোরেল কোনো জাদুর কাঠি নয়। শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধানের জন্য বাস রুট রেশনালাইজেশন, ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালু করা এবং ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নের মতো অত্যন্ত জরুরি অথচ স্বল্প ব্যয়ের কাজগুলো না করে সরাসরি মেগা প্রকল্পে হাত দেওয়াটা বোকামি। কোনো শক্ত ভিত্তি ছাড়া ওপরের স্তরের এই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হবে না।

অন্যদিকে, মেগা প্রকল্পের সুযোগ ব্যয় বা ‘অপরচুনিটি কস্ট’ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যে বিষয়টি সামনে এনেছেন, তা বর্তমান নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। একটি ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার মেট্রোরেল বা ৮৩ হাজার কোটি টাকার ‘কর্ডলাইন’ রেলপথ নির্মাণের বিপরীতে আমরা যদি সেই অর্থ দিয়ে সারা দেশের লাখ লাখ কিলোমিটার ভাঙাচোরা গ্রামীণ সড়ক সংস্কার করি, তবে তার সুফল দেশের প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছাবে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে গতি সঞ্চারিত হবে, তা একটি উড়ালপথের চেয়ে বহুগুণ বেশি জাতীয় প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। তীব্র আর্থিক সংকটের এই সময়ে, যখন সরকারের রাজস্ব আদায়ে বিশাল ঘাটতি এবং জিডিপির তুলনায় ঋণের বোঝা ক্রমশ ভারী হচ্ছে, তখন নতুন করে মেগা প্রকল্পের ফাঁদে পা দেওয়াটা হবে অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী।

সরকারকে বুঝতে হবে, ঢাকা শহর আজ বসবাসযোগ্যতার দিক থেকে পৃথিবীর তলানিতে অবস্থান করছে। দূষিত বায়ু আর দূষিত নদীর এই জনারণ্যে নতুন করে মেট্রোরেল বানিয়ে আরও দুই কোটি মানুষকে টেনে আনার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। প্রকৃত উন্নয়ন চাইলে ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। প্রশাসনিক সদর দপ্তর, হাইকোর্টের বেঞ্চ, বড় বড় হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ঢাকার বাইরে অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরে ছড়িয়ে দিতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বেকারত্ব দূরীকরণের বদলে কেবল রড আর কংক্রিটের মেগা প্রজেক্ট কখনোই একটি জাতির স্থায়ী মুক্তির পথ হতে পারে না।

ক্ষমতাসীনদের মনে রাখা প্রয়োজন, মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। বিগত সরকারের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল লাগামহীন দুর্নীতি আর মেগা লুটপাটের প্রতি জনরোষ। প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করে বর্তমান সরকারও যদি সেই একই আমলাতান্ত্রিক চক্রান্তে পা দেয় এবং বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর প্রলোভনে মেগা প্রকল্পের নামে ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়, তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে সময় লাগবে না। সময় থাকতে উন্নয়নের সংজ্ঞাকে ঢেলে সাজানো এবং কংক্রিটের বদলে মানুষের মানবতায় ও দক্ষতায় বিনিয়োগ করাই হোক নতুন বাংলাদেশের একমাত্র দর্শন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category