কয়েক মাস ধরে দেশে চাল, ডাল, তেল, চিনি, ডিম ও দুধসহ প্রায় সব ধরনের মৌলিক নিত্যপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে| কাঁচামালের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির তীব্র অভিঘাত এবার সরাসরি এসে পড়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বেকারি শিল্পের প্রস্তুতকৃত খাদ্যপণ্যের বাজারে| সকালের নাশতার রুটি-পরোটা, দুপুরের সাধারণ ভাত-তরকারি কিংবা বিকেলে ফুটপাতের এক কাপ চা—সব ধরনের তৈরি খাবারের দামই বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা| ক্ষেত্রবিশেষে এই মূল্যবৃদ্ধি ১০ শতাংশের ঘর ছাড়িয়ে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে| এতদিন পণ্যের ওজন বা আকার কিছুটা সংকুচিত করে অর্থাৎ ‘শ্রリンクফ্লেশন’-এর মাধ্যমে বাড়তি উৎপাদন খরচ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন ব্যবসায়ীরা| তবে কাঁচামালের অব্যাহত মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বাণিজ্যিক গ্যাস ও বিদ্যুতের বাড়তি শুল্ক এবং পরিবহন ব্যয় কয়েক দফা বেড়ে যাওয়ায় এখন আর আকার কমানোর সুযোগ নেই| ফলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সরাসরি খাবারের মূল্য সমন্বয়ের পথেই হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন খাদ্য প্রস্তুতকারকরা|
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হালনাগাদ বাজারদর বিশ্লেষণ করলে কাঁচামালের এই লাগাতার ঊর্ধ্বমুখিতার চিত্র স্পষ্ট ধরা পড়ে| মাত্র এক মাসের ব্যবধানে খোলা ও প্যাকেটজাত ময়দার দাম ৮ থেকে প্রায় ১১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮৫ টাকায় পৌঁছেছে| নিত্যব্যবহার্য আটা, খোলা সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, মসুর ডাল ও চিনির দাম বেড়েছে ২ থেকে ৬ শতাংশের বেশি| সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে সাধারণ মানুষের প্রোটিনের অন্যতম উৎস ডিমে; ফার্মের লেয়ার মুরগির ডিমের দাম হালিতে ৩ থেকে ৬ টাকা বেড়ে এখন ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে| এছাড়া ছোলার দাম কেজিতে প্রায় ১১ শতাংশ বেড়ে ১০০ থেকে ১১০ টাকায় এবং চা পাতা ও প্যাকেটজাত গুঁড়ো দুধের দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে| কাঁচামালের এই সমন্বিত মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবেই এতদিন ৮ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হওয়া রেস্তোরাঁর প্রতি পিস পরোটা এখন মানভেদে ১০ থেকে ২০ টাকায় উঠেছে| প্রতি প্লেট সাদা ভাতের দাম বেড়েছে অন্তত ৫ টাকা এবং ফুটপাত থেকে শুরু করে মাঝারি মানের রেস্তোরাঁয় প্রতি কাপ চায়ের দাম ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে|
শুধু কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিই নয়, বরং পরিচালন ব্যয়ের অন্যান্য অনুষঙ্গও খাদ্য প্রস্তুতকারকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে| চট্টগ্রাম হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, কেবল চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলাতেই প্রায় ১২ হাজার হোটেল-রেস্তোরাঁ রয়েছে, যার বড় অংশই এখন অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে ভুগছে| ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইপলাইনে প্রয়োজনীয় গ্যাস না থাকায় উৎপাদন চালু রাখতে গিয়ে চড়া দামে বাণিজ্যিক সিলিন্ডার বা এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা রান্না ও বেকিংয়ের খরচ প্রায় দ্বিগুণ করে দিচ্ছে| এর সঙ্গে দফায় দফায় বাণিজ্যিক বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি যুক্ত হয়ে উৎপাদন খরচের বোঝা ভারী করেছে| খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, খাবারের মেন্যুতে কোনো আনুষ্ঠানিক মূল্য তালিকা ঝুলিয়ে না দিলেও লাভ-লোকসানের অংক মেলাতে গিয়ে তারা ধীরে ধীরে প্রতিটি পদের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন|
বিশ্ববাজারের অস্থিরতাও এই স্থানীয় খাদ্য সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে| খাতুনগঞ্জভিত্তিক আমদানিকারক ও মোড়কজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, ইউরোপের তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে আন্তর্জাতিক দুগ্ধ উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নেমেছে| এর ফলে বৈশ্বিক জিডিটি (গ্লোবাল ডেইরি ট্রেড) নিলামে টানা কয়েক দফায় নন-ফ্যাট ও ফুলক্রিম দুধের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে| পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে জাহাজ ভাড়ার অস্থিরতা খাদ্যশস্য ও বেকারি কাঁচামাল আমদানির সামগ্রিক ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে| শুরুতে আমদানিকারকরা পুরোনো মজুত দিয়ে দাম ধরে রাখলেও এখন বাধ্য হয়েই স্থানীয় পাইকারি ও খুচরা বাজারে সেই বাড়তি ব্যয়ের সমন্বয় করছেন| অন্যদিকে বিরিয়ানি ও পেস্ট্রি জাতীয় খাবারের ক্ষেত্রে সুগন্ধি চাল ও বাদামসহ ড্রাই ফ্রুটসের অস্বাভাবিক দামের কারণে উৎপাদন ব্যয় অন্তত ১০ থেকে ১২ শতাংশ বেড়েছে|
এই বহুমুখী মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছেন দেশের বড় বড় নগরীর সাধারণ শ্রমজীবী, নিম্নমধ্যবিত্ত ও কর্মজীবী মানুষ| রাজধানী ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের মতো মেগাসিটিতে রিকশাচালক, দিনমজুর, পোশাক শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং বেসরকারি চাকরিজীবীদের একটি বিশাল অংশের প্রতিদিনের খাবারের ভরসা মূলত ফুটপাতের ছোট দোকান ও সাধারণ হোটেল-রেস্তোরাঁ| চা, বিস্কুট, পাউরুটি বা দুপুরের খাবারের পেছনে তাঁদের দৈনিক যে ব্যয় হতো, প্রস্তুতকৃত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে তা এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে| খাবারের দাম খুব বেশি বাড়ালে নিয়মিত ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি থাকে, আবার দাম অপরিবর্তিত রাখলে নিশ্চিত লোকসানের মুখে পড়তে হয়—এমন উভয়সংকটের মুখে পড়ে খাবার প্রস্তুতকারকরা কোনোমতে সীমিত পরিসরে দাম বাড়িয়ে বাজারে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছেন| কিন্তু এর চূড়ান্ত বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার পকেটকেই খালি করছে|