• মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:২৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ

উপদেষ্টাদের বাসা ও লাল পাসপোর্ট ছাড়ার কী মাজেজা : রিন্টু আনোয়ার

Reporter Name / ৫ Time View
Update : সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

কয়েকদিন ধরে সরকারি বাসভবন ও কূটনৈতিক পাসপোর্ট সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ফেরত দেওয়া শুরু করেছেন উপদেষ্টারা। এরইমধ্যে দু-তিনজন উপদেষ্টা তাদের বসবাসের জন্য সরকার থেকে দেওয়া বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। বাসা বুঝে নিতে চিঠি দিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে।  ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সরকারি বাসা ছেড়ে দেবেন এবং কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেবেন। চুক্তিতে নিযুক্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন। এ তালিকায় পুলিশ মহাপরিদর্শক-আইজিপি বাহারুল আলমও রয়েছেন। কয়েকজন সচিব ও হাইকোর্টের বিচারপতিও রয়েছেন। লাল পাসপোর্ট সমর্পণ করে তারা সাধারণ বা প্রাইভেট পাসপোর্টের আবেদন প্রক্রিয়া শেষ করেছেন বলে নানা সূত্রের আভাস।

কঠিন বাস্তবতা হলো, না চাইলেও সরকারি বাসভবন ও লাল পাসপোর্ট ছাড়তে হবে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের। দুই দিন আগে-পরে, তা তাদের ছাড়তেই হবে। কিন্তু, সেটা আগেভাগে কেন? কোনো সমস্যা আঁচ করছেন? ক্লান্ত হয়ে গেছেন? না-কি পালাতে হবে? প্রশ্নজট অনেকের মাঝে। হয়ে থাকতে পারে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরবর্তী সময়ে বিদেশ ভ্রমণে আইনি বা দাপ্তরিক জটিলতা এড়াতেই তাদের এই ব্যতিক্রমী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। ১২ ফেব্রুয়ারিই তারা সাবেক হয়ে যাচ্ছেন না। দায়িত্বে থাকবেন আরো কয়েকদিন নতুন সরকারের শপথ না নেয়া পর্যন্ত। দায়িত্বে ছাড়ার পর এয়ারপোর্ট ট্রাভেল করতে গেলে ইমিগ্রেশন এনওসি (অনাপত্তি সনদ) চাইবে। এনওসি না হলে তো অফিশিয়াল পাসপোর্টে যেতে পারবেন না। এ কারণে প্রাইভেট পাসপোর্ট তাদের করতেই হবে। কারো কারো মতে, দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর সাধারণ পাসপোর্ট পেতে দীর্ঘসূত্রতা এবং ইমিগ্রেশনে অনাপত্তি সনদ সংক্রান্ত আইনি জটিলতা এড়াতেই এমন পদক্ষেপ তাদের। পদে থাকাকালে আবেদন করলে দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে। আজ পাঠালে কালই তার পাসপোর্ট হয়ে যাবে।  সাধারণ বা সিভিল হয়ে গেলে তখন তা একটু জটিল হয়ে যায়। পাসপোর্ট অফিস যে তাকে কত দিনে পাসপোর্ট দেবে, সেই গ্যারান্টি নেই। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কূটনৈতিক পাসপোর্টের মেয়াদ পাঁচ বছর।
পদত্যাগ বা দায়িত্ব পালন শেষে এই পাসপোর্ট হস্তান্তর করা বাধ্যতামূলক। একটু আগে ছাড়তে কোনো সমস্যা নেই। তবে, নিজের পাসপোর্ট জমা দেওয়া নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জন নাকচ করে দিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তার স্ত্রীও কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেননি। উল্লেখ্য, ই-পাসপোর্ট চালু হওয়ার পর থেকে কূটনৈতিক পাসপোর্টের মেয়াদ পাঁচ বছর করা হয়েছে। তবে, পদের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই পাসপোর্টের কার্যকারিতা বিশেষ নিয়মের অধীনে চলে যায়। মানে দায়িত্ব শেষে পাসপোর্ট হস্তান্তর করতে হয়। এমন স্বাভাবিক বিষয়ের পরও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ওগুঞ্জন থেমে নেই। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে কয়েকজন উপদেষ্টার এমন পদক্ষেপ নিয়ে সন্দেহ বা প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিকও নয়। তারপরও সময় বলে কথা। নির্বাচনোত্তর পরিবেশের সাথে রিলেট করার সুযোগ আছে। যথেষ্ট সুযোগ আছে সন্দেহ করার। প্রশ্ন ছোঁড়ার। গসিপে তো নিষেধ নেই। তবে দায়িত্ব চলমান থাকা অবস্থায় কূটনৈতিক পাসপোর্ট না থাকলে তার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা চলে আসবে। এছাড়া এমন উদাহরণ অতীতে তেমন নেই।

বাংলাদেশে পাসপোর্ট সংক্রান্ত প্রধান আইন হলো বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩ এবং পাসপোর্ট বিধিমালা, ১৯৭৪। এর অধীনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর ই-পাসপোর্ট ইস্যু করে, যা আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা বা আইসিএও-এর মানসম্মত। পাশাপাশি কূটনৈতিক পাসপোর্ট বা লাল পাসপোর্টের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় অনুসরণীয় নীতিমালা জারি করে সরকার। এছাড়া যোগ্যতার ভিত্তিতে এই পাসপোর্ট কারা পাবেন সেই তালিকাও নির্দিষ্ট।

বাংলাদেশ সরকার মূলত তিন ধরনের পাসপোর্ট ইস্যু করে। রংও তিন রকমের। সাধারণ মানুষের জন্য সবুজ, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নীল এবং কূটনীতিকদের জন্য লাল রংয়ের। কূটনৈতিক বা ‘লাল’ পাসপোর্ট সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, সচিব, এবং বিদেশে কর্মরত কূটনীতিকদের জন্য ইস্যু করা হয়। দেশের বাইরে কূটনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বা রাষ্ট্রীয় কূটনীতিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের জন্যও এই ক্যাটাগরির পাসপোর্ট ইস্যু করতে পারে সরকার। তবে, পদ বা মেয়াদ শেষ হলে এই পাসপোর্ট বাতিল বা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। আন্তর্জাতিক দায়মুক্তি, দ্রুত কাস্টমস চেক এবং ভিসা সুবিধাসহ বেশ কিছু সুবিধা পান এই ধরণের পাসপোর্ট বহনকারীরা। কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকলে যেকোনো দেশে ঝট করে চলে যাওয়া যায়, বেশিরভাগ দেশেই ভিসার প্রয়োজন পড়ে না।”
তবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকলেই সব ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে বিষয়টি এমনও নয়। কেবল দায়িত্বরত কূটনীতিকরাই এটি পান। একজন কূটনীতিক যে দেশে দায়িত্বরত আছেন সেই দেশে তিনি যে সুবিধা পাবেন, অন্য দেশে সবগুলো পাবেন না।এছাড়া সরাসরি কূটনৈতিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নন এমন ব্যক্তিরও এই ধরনের পাসপোর্ট থাকতে পারে। “মন্ত্রী, এমপি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব তারা কূটনৈতিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নন, কিন্তু তাদেরকে কূটনৈতিক পাসপোর্ট দেওয়া হয়। ওগুলো স্পেশাল ক্যাটাগরি। বিদেশ যাওয়ার সময় একটি লেটার অব ইনট্রোডাকশন সরকার দেয় যেটি জিও হিসেবে গণ্য হয়। তবে “কূটনৈতিক হিসেবে কোনো দেশে একজন দায়িত্বরত অবস্থায়, এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে চান তখন আর জিও দরকার হয় না। গড়ে পাসপোর্টের র‍্যাংকিং বিশ্বের সপ্তম দুর্বল অবস্থানে বাংলাদেশ। হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সের ২০২৬ সালের জানুয়ারির হালনাগাদ তথ্যে এমন অবস্থান দেখা গেছে। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পঞ্চম দুর্বল হিসেবে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট। সম্প্রতি  হেনলি অ্যান্ড পার্টনারস তাদের সর্বশেষ পাসপোর্ট ইনডেক্স প্রকাশ করেছে। সেই আলোকে সেখানে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা এখন বিশ্বের ৩৭টি দেশে ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন। তালিকায় মোট ১০১টি অবস্থানের মধ্যে বাংলাদেশের পাসপোর্ট ৯৫তম স্থানে রয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারি সংস্করণে ১০৬টি অবস্থানের মধ্যে বাংলাদেশ ১০০তম স্থানে ছিল।

এই ইনডেক্স বৈশ্বিক ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুযোগের ভিত্তিতে র‍্যাংকিং তৈরি করা হয়। পাসপোর্ট র‌্যাংকিংয়ে এবারও এককভাবে শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ১৯২টি দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন। র‌্যাংকিংয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। এসব দেশের পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ১৮৮টি দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পাঁচটি দেশ– ডেনমার্ক, লুক্সেমবার্গ, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড। এসব দেশের পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ১৮৬টি দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ড ও নরওয়ে। এসব দেশের পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ১৮৫টি দেশে ভিসা ছাড়া যেতে পারেন।পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে হাঙ্গেরি, পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এসব দেশের পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের ১৮৪টি দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশ করতে পারেন।পাসপোর্ট ইনডেক্সের একেবারে তলানিতে রয়েছে পাকিস্তান (৯৮তম), ইয়েমেন (৯৮তম), ইরাক (৯৯তম), সিরিয়া (১০০তম) ও আফগানিস্তান (১০১তম)। এসব দেশের নাগরিকরা যথাক্রমে ৩১, ২৯, ২৬ ও ২৪টি গন্তব্যে ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে মালদ্বীপের পাসপোর্ট। মালদ্বীপের নাগরিকরা ভিসা ছাড়াই ৯২টি গন্তব্যে ভ্রমণ করতে পারেন।হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সে ১৯৯টি পাসপোর্ট ও ২২৭টি গন্তব্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। একটা সময় পর্যন্ত ধারণা ছিল, যত বেশি দেশ ভ্রমণ করা যাবে এবং পাসপোর্টে যত বেশি দেশের ভিসা থাকবে, পাসপোর্ট তত বেশি ‘ভারী’ হবে। উন্নত দেশগুলো সহজে ভিসা দেবে। তবে, দিন বদলে গেছে। বর্তমানে সবুজ মলাটের বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে অধিকাংশ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেরই যেন ‘অ্যালার্জি’। ভিসা দেওয়া তো দূরের কথা, যেসব দেশে ভিসা ‘অন-অ্যারাইভাল’ নিয়ম চালু আছে, সেসব দেশও বাংলাদেশিদের প্রবেশ করতে না দিয়ে বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দিচ্ছে।
গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো জনপ্রিয় গন্তব্যেও বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা পাওয়া কঠিন হচ্ছে। এসব দেশের ভিসা প্রক্রিয়াকরণের সময় দীর্ঘ হচ্ছে, প্রত্যাখ্যানের হার বাড়ছে এবং পুরোনো সুবিধাগুলো সীমিত করা হচ্ছে। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে ভিসা পেলেও অনেক বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীকে ইমিগ্রেশনে নানা কারণে ‘অফলোড’ করে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।পাসপোর্টের গুরুত্ব কমে যাওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যখন নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কার মতো পর্যটননির্ভর দেশগুলোও বাংলাদেশিদের বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেয়। অথচ এসব দেশে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণসাপেক্ষে ভিসা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা চালু আছে, অর্থাৎ নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে বিমানবন্দর থেকে মুহূর্তেই ভিসা দেওয়ার কথা। পাসপোর্টের গুরুত্ব কমে যাওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যখন নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কার মতো পর্যটননির্ভর দেশগুলোও বাংলাদেশিদের বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সরকার পরিবর্তনের পর দায়িত্ব নিয়ে প্রায় দুই বছর পর,নির্বাচনের আগ মুহূর্তে উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্যের এমন পদক্ষেপ মানুষের মধ্যে সন্দেহের তৈরি করতে পারে।
এছাড়া প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নিয়ে উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসেব দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন সেটিও এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি
সব মিলিয়ে প্রশ্ন তৈরির সুযোগ রয়েছে বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এই সরকারের উপদেষ্টারা নিজেরাই অতীতে লম্বা সময় ধরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা বলেছেন। ফলে জাতি আশা করেছিলাম যে, তারা সেটার একটা উদাহরণ সৃষ্টি করে যাবেন। সেই সুযোগ তাদের হাতে ছিল, যা এখন হাতছাড়া হতে চলেছে!

লেখক: সাবাদিক ও কলামিস্ট।
rintu108@gmail.com

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category