• সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৮ অপরাহ্ন
Headline
জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সার্থক হয়েছে : হুমায়ুন ক‌বির দুদকের প্রেস ব্রিফিং চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আসিফ মাহমুদের রিট ১৮ দেশের বাজারকেন্দ্রিক রপ্তানি কৌশল প্রণয়ন করছে সরকার : বাণিজ্য সচিব চুয়াডাঙ্গায় ভারতীয় মাদক ও প্রসাধনসামগ্রী উদ্ধার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা প্রণয়ন করে প্রতিবেদন তৈরির সুপারিশ স্থায়ী কমিটির গুণী শিক্ষক সম্মাননা ১০০ জনে উন্নীত করা হচ্ছে: মাহ্দী আমিন আমিষের ঘাটতি পূরণে দেশের মুক্ত ও বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্য চাষ গুরুত্বপূর্ণ : স্পিকার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান পুনর্ব্যক্ত আইরিন খানের দেশে কোনো বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফেনীতে প্রধানমন্ত্রীর প্রকল্প উদ্বোধনের ভেন্যু পরিদর্শনে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

উপাচার্য নিয়োগে ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলা: অস্থিতিশীলতার মুখে দেশের উচ্চশিক্ষা

Reporter Name / ৪ Time View
Update : রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি জাতির মেধা, মনন ও উচ্চশিক্ষার প্রধান কেন্দ্র এবং এই বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক কর্মযজ্ঞের প্রশাসনিক ও একাডেমিক নেতৃত্ব সরাসরি নির্ভর করে উপাচার্যের ওপর| নিয়ম অনুযায়ী একজন উপাচার্যকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়, যাতে তিনি একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারেন| কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ এবং মেয়াদপূর্তির আগেই আকস্মিকভাবে তা বাতিলের যে হিড়িক পড়েছে, তা দেশের উচ্চশিক্ষার কাঠামোর জন্য এক গভীর অশনিসংকেত| উপাচার্য পদটিকে যেন এক প্রকার ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলায় পরিণত করা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক একাডেমিক ও প্রশাসনিক পরিবেশকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলেছে|

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় উপাচার্যকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগের ঘটনাটি এই নীতিহীন অস্থিরতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ| অব্যাহতিপ্রাপ্ত উপাচার্য যখন বিশ্ববিদ্যালয়েরই দাপ্তরিক কাজে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন, ঠিক তখন তাকে সরানোর এই আকস্মিক ও অঘোষিত সিদ্ধান্তে খোদ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম বিস্ময় ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে| ফলস্বরূপ, সেখানে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন ও সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচির মতো কঠোর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে| একই দৃশ্যপট দেখা যাচ্ছে সদ্য গঠিত ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়েও| সেখানকার উপাচার্যকে আচমকা সরিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের এক অধ্যাপককে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে ক্যাম্পাসে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়া থেকে মুক্ত থাকার দাবিতে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গিয়ে এমন নিয়োগ দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা রাজপথ দখলের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন| এমনকি শিক্ষার্থীদের চলমান মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র হিসেবেও তারা এই আকস্মিক রদবদলকে দেখছেন| এর আগে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও মাত্র ৩৭ দিনের মাথায় উপাচার্য বদল করে তাকে অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছিল| একজন উপাচার্য দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার আগেই যদি তাকে এভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেই প্রতিষ্ঠান কীভাবে তার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন করবে, তা এক বিরাট প্রশ্ন|

শিক্ষাবিদরা অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, উপাচার্য পদটি নিছক কোনো আলংকারিক বা দাপ্তরিক পদ নয়| এর সঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ, পরীক্ষা গ্রহণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে| দায়িত্ব নেওয়ার এত অল্প সময়ের মধ্যে বারবার এই রদবদল বিশ্ববিদ্যালয়ের চেইন অব কমান্ড ভেঙে দিচ্ছে এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নষ্ট করছে| চুয়েট বা ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির চলমান আন্দোলন সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আমলাতান্ত্রিক এই অদূরদর্শিতার চরম মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের| তাদের মূল্যবান শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে এবং অপ্রত্যাশিত সেশনজটের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে| প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ যথার্থই বলেছেন, যাকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে এবং কেন তাকে নিয়োগ দেওয়া হলো—সে বিষয়ে নিয়োগকর্তার কাছে একটি পরিষ্কার ও স্বচ্ছ ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়| রাজনৈতিক বা অদৃশ্য কোনো ইশারায় উপাচার্য নিয়োগ ও অপসারণ করা হলে তা উচ্চশিক্ষার বৃহত্তর স্বার্থকেই কেবল ক্ষুণ্ন করে|

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল| বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ এস এম ফয়েজ আক্ষেপ করে জানিয়েছেন যে, প্রার্থীদের সিভি সংগ্রহ করে শর্টলিস্ট তৈরি এবং প্রয়োজনে ভাইভা নিয়ে একটি দক্ষ পোল তৈরির যে মহান উদ্দেশ্য নিয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়েছিল, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না| যদিও বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী দাবি করেছেন যে, সার্চ কমিটির মাধ্যমেই সব নিয়ম মেনে উপাচার্য নিয়োগ সম্পন্ন হচ্ছে, তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে| যদি নিয়ম মেনেই সব নিখুঁতভাবে হয়ে থাকে, তবে কেন এক মাসের মাথাতেই সরকার বা মন্ত্রণালয়কে তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হচ্ছে| কেনই বা নিয়োগের পরপরই সাধারণ শিক্ষার্থীদের বারবার রাজপথে নামতে হচ্ছে|

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রশাসনিক অস্থিরতার পরীক্ষাগার বানানো কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না| শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে নিতে হলে উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা, মেধাভিত্তিক যাচাই ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে| মেধা, দক্ষতা ও সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ চূড়ান্ত করার পর অন্তত তাদের কাজের মেয়াদ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন| আকস্মিক, অপরিকল্পিত ও খেয়ালখুশিমতো উপাচার্য বদলের এই আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে সরকারকে এখনই বেরিয়ে আসতে হবে| অন্যথায়, দেশের উচ্চশিক্ষার কাঠামোগত যে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হবে, তার ঐতিহাসিক দায়ভার সংশ্লিষ্ট কেউই এড়াতে পারবেন না|


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category