• শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ১১:৪২ অপরাহ্ন

এরা অধরা প্রজাতি, নইলে সরকারই এদের কব্জায়: প্রসঙ্গ শ্রমবাজার।

Reporter Name / ৪০ Time View
Update : শনিবার, ২৯ জুন, ২০২৪

-রিন্টু আনোয়ার

সোনালী আঁশ, চা, চামড়া শেষ বহু আগেই। নিভু নিভু করে টিকে আছে তৈরি পোশাক শিল্প-গার্মেন্টস। সেটারও যায় যায় দশা। নানা খাতের এমন সর্বনাশের মাঝে ভরসার জায়গা হিসেবে টিকেছিল রেমিট্যান্স, মানে শ্রম রপ্তানি বাজারও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় সোয়া কোটি বাংলাদেশি কঠোর পরিশ্রম করে প্রচুর রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখছেন। পরিবারে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নিয়ে আসা এবং একটু স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে প্রতিবছর বিদেশে পা বাড়ায় দশ লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করে, বৈদেশিক রিজার্ভ সমৃদ্ধ করে বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীরা। আর সেটাকে শেষ করে ফেলার যাবতীয় বন্দোবস্ত করে ফেলেছে বর্তমান সরকারের খাস ঘরানার একটি চিহ্নিত চক্র। এরা অজানা-অচেনা নয়। একবারে শিনা টান করে ঘুরে বেড়ানো ফ্রাঙ্কেইনস্টাইন দানব। অবিশ্বাস্য তথা বম্বের সিনেমেটিক ক্রিয়াকর্ম তাদের। সম্প্রতি এরা মোটামোটি প্রমাণ করে দিয়েছে, হয় এরা অধরা প্রজাতি, নইলে সরকারই এদের কব্জায়।
প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের জুনে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতেই বিশাল স্বপ্ন নিয়ে দেশটিতে যেতে শুরু করেন বাংলাদেশি কর্মীরা। দ্রুত সময়ের মধ্যে ৫ লাখ ২৭ হাজার কর্মী পাঠাতে বৈধ সব রিক্রুটিং এজেন্সিকে যুক্ত করার দাবি ওঠে তখন। তবে প্রায় দুই হাজার এজেন্সির মধ্যে মাত্র ১০১টি এজেন্সির সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আর বেঁধে দেয়া ৭৯ হাজার টাকার পরিবর্তে প্রতি কর্মীর কাছ থেকে অন্তত সাত গুণ টাকা নিয়েও ৩০ হাজার কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠাতে পারেনি এজেন্সিগুলো।
কী আচানকে চোখের সামনে প্রকাশ্যে এরা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বরবাদ করে দিয়েছে! হাজার হাজার মোনুষের সর্বনাশ করে হাজার-হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে এরা এ কাজটি করেছে। সরকারকে বানিয়ে ফেলেছে অসহায়। আর দেশের ইজ্জত শেষ তো করেছেই। এই গুণধরদের কায়কারবারে এখন মধ্যপ্রাচ্যের অবশিষ্ট শ্রমবাজারও হারানোর অপেক্ষায়! এর অনেক দূর এরা সেরে ফেলেছে। কোমর বেধে মাঠে তৎপর এই চক্রের সঙ্ঘবদ্ধ সাঙ্পাঙ্গরা। বাহরাইন ও ওমানের বন্ধ শ্রমবাজার চালু না হওয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিসানীতির কড়াকড়িতে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে এমনিতেই নানামুখী বিপর্যয়।  কিন্তু, এতে চক্রটির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মালয়েশিয়ায় এতো বড় কুকর্মের পরও তাদের একটি কেশেও কোনো টোকা না পড়া তাদের জন্য একটি প্রণোদনা ও সামনে আরো অপকর্মে চালিয়ে যাওয়ার গ্রিন সিগনাল বা নো অবজেকশন সার্টিফিকেট-এন্ওসি।
তাদের অপর্মেরে জেরে গত ৩১ মে’র মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার ই-ভিসাপ্রাপ্ত বাংলাদেশি দেশটিতে যেতে পারেনি। দালাল চক্রের হাত বদল হয়ে এসব কর্মীদের কাছ থেকে প্রায় ৫ লাখ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছে সিন্ডিকেট চক্র। এসব ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের ভাগ্যে কি আছে তা’ কেউ কিছু নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। আরো প্রায় বিশ হাজার কর্মী অনুমোদন পেয়েও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেশটিতে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সিন্ডিকেট চক্র মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের কাছ থেকে জনপ্রতি সাড়ে চার লাখ টাকা করে এবং প্রায় দশ লাখ কর্মীর মেডিকেল পরীক্ষা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অথচ বিপুল সংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারলো না।
যে সব কর্মী মালয়েশিয়া যাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের পাঠাতে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং এর কারণ খুঁজতে গঠিত তদন্ত কমিটিকে আরও সময় দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী।  আসলে এটা তার বলার জন্যই বলা। কিছু একটা না বললে কী হয়? ঢাকায় নিযুক্ত মালয়েশিয়ান হাইকমিশনার হাজনাহ মোহাম্মদ সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিয়েছেন,এই হতভাগাদের জন্য সময় বাড়ানোর আর কোন সুযোগ নেই। এরপরও আমাদের মন্ত্রী হহোদয়ের কিছু একটা বলার জন্য বলা: এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। আরো মজার এবং বিনোদিত হবার বচনও দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, দায়ীদের ধরা তো হবেই। এখন মূল কাজ হচ্ছে দোষীদের খুঁজে বের করা। প্রশ্ন হলো,ধরার জন্য সংশ্লিষ্ট দায়ী বা দোষীদের কি খুঁজতে হয়? সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে যাদের নাম এসেছে, লোটাস কামাল, মাসুদ চৌধুরী, হাজারি, বেনজীরদেরকে কি খুঁজতে হয়? তারা কি নিরুদ্দেশ-নিখোঁজ? সংসদে এই নামের দেখা যা্ওয়া, নিয়মিত সরকারের ও দলের বিভিন্ন কাজে অবদান রাখা এই নামের বিশিষ্টজনরা তাহলে কারা? এটাও কি বেসিক ব্যাংকের শেখ আবদুল হাই বাচ্চু কাহিনী? ব্যাংকটিকে খেয়ে দেয়ে শেষ করে তিনি দিব্যি ঘুরছেন। কিন্তু, বছরের পর বছর পুলিশ, দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে খুঁজে পায় না! দেশের শ্রম বাজার বরবাদ হয়ে যাচ্ছে, হাজার হাজার সাধারণ মানুষদের নিঃস্ব করে হাজার-হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে দেশের ইমেজ বরবাদ করা মহাশয়রা দিব্যি মোজ মাস্তিতেই থাকবেন!
মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, ৩১ মে পর্যন্ত দেশটিতে ৫ লাখ ২৬ হাজার ৬৭৬ জন বাংলাদেশি কর্মীকে পাঠানোর অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ছাড়পত্র দেয় প্রায় ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৬৪২ জনকে। অজ্ঞাত কারণে বাদ দেয়া হয় ৩২ হাজার কর্মীকে। কথা ছিল, জনপ্রতি ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা করে দেবেন কর্মীরা। এ খরচের ভেতর আছে: পাসপোর্ট খরচ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিবন্ধন ফি, কল্যাণ ফি, বিমাকরণ, স্মার্ট কার্ড ফি ও সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির সার্ভিস চার্জ। আর ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার উড়োজাহাজ ভাড়াসহ ১৫টি খাতের খরচ বহন করবে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। এ অবস্থায় তালিকাভুক্ত ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৪২ জনের কাছ থেকে সিন্ডিকেট করে মালয়েশিয়ার আমিন নুর ও দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো হাতিয়ে নেয় নির্ধারিত ফি বাদে গড়ে পৌনে ৫ লাখ টাকা করে, যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা।
এই অপকর্মের ইজারা প্রাপ্তরা সবাই হেভিওয়েট। তাদের শিরোমনিরা তো গোটা দেশের এক এক জন কর্ণধার। সাবেক অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল এমপিসহ সেই এক-এগারোর আলোচিত চরিত্র, বর্তমান সরকারের বদান্যতায় সংসদ সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাসুদউদ্দিন চৌধুরী, নিজাম হাজারী, বেনজীর আহমেদ এমপি কী যেনতেন ব্যাপার? তাদের আশপাশে দাঁড়িয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা দূর থাক, তাদেরকে আদাব-সালাম দেয়াও এখন বাংলার মানুষের জন্য একটি সৌভাগ্যের ব্যাপার? এরপরও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মালয়েশিয়ার ঘটনায় দায়ীদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। সবার বিরুদ্ধে নেয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ ধরনের হুঙ্কার এলে ভুক্তভোগী মানুষ একটু হলেও কলিজায় পানি পায়। কিন্তু, দুস্কর্মের হোতারা কিন্তু এর ফের বোঝে-জানে। আর জানে বলেই তাদের চোখ এখন  আরো সামনে মধ্যপ্রাচ্যসহ নানান দিকে।
বিদেশে জনশক্তি রফতানির উল্লেখযোগ্য অংশেরই চোখ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সউদী আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইনের দিকে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কোরিয়ার দিকেও নজর কারো  কারো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশ সউদী আরবে। দেশটিতে বর্তমানে ২৫ লক্ষাধিক বাংলাদেশি শ্রমিক কঠোর পরিশ্রম করে প্রচুর রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। কিন্তু সউদী আরবের পরিবর্তিত অভিবাসন আইন ও বৈশ্বিক মন্দাসহ নানা কারণে হাজার হাজার প্রবাসী চাকরি হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বর্তমানে আমাদের সর্ববৃহৎ শ্রমবাজার সউদী আরবে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর কাজ নেই। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে আউটসোর্সিং কোম্পানি খুলে হাজার হাজার কর্মী নিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে মাসের পর মাস। এসব বাংলাদেশি কর্মীরা দেশের আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে খাবার কিনে খেতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে আদম কারবারি নামে কথিত দুর্বৃত্তদের কাছে এটি কোনো ঘটনাই নয়।
এরা মালয়েশিয়া অ্যাপিসোড শেষ করে এদর থাবা এখন মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের দিকে। সাফল্যের হাতছানি সেখানেও । এরইমধ্যে অনেক দূর এগিয়েও গেছে তারা। জায়গায় জায়গায় তাদের লোক সেট করা আছে। নিজস্ব উদ্ভাবিত আরো বহু কায়দাকানুন তাদের জানা। যুক্তরাজ্য, দুবাইথেকে শুরু করে পাকিস্তান-ও ভারতেও তাদের চেইন আছে। রাজধানী ঢাকায় জটলা না পাকিয়ে এমএলম তরিকায় দেশের জেলায় জেলায়ও ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তাদের প্রতিনিদের। এই প্রতিনিধিদের মাথার ওপরে সেট করা হয়েছে এমপি,চেয়ারম্যান, মেয়রসহ স্থানীয় অনেক জনপ্রতিনিধিদেরকে।
দেশের বাস্তবতায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডে কাউকে দায় নিতে হয় না। সাত গুণ বেশি টাকা দিয়েও কাদের দোষে মালয়েশিয়া যেতে পারলেন না ৩০ হাজার কর্মী? বর্তমানে সংবাদ সম্মেলন করে এমন প্রশ্নে একে অপরের ওপর দায় চাপাতে ব্যস্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। তবে মন্ত্রণালয় ও রিক্রুটিং এজেন্সি সংগঠন বায়রার গাফিলতিকে দুষছেন এ খাতের প্রবীণ  অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা। তবে এত পরিমান ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীর স্বপ্নভঙ্গে সরকারের কোনো দায়েই দেখছেন না প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী। দায় বা যন্ত্রণার পুরোটাই যেন ভুক্তভোগীদেরই। তারা এতো টাকা দিয়ে প্রতারিত হতে যায় কেন?-এভাবে খোলাসা করে বলে দিলেই বোধদয় হয়ে যায়। বিষয়টা সোজাসাপ্টা জানিয়ে দেয়াই ভালো। এতো ছল-চাতুরি-তামাশা, কথার মারপ্যাঁচ দরকার পড়ে না। কষ্ট করে মুখ খরচ করে বলতে হয় না- কাউকে ছাড় দেয়া হবে না! খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে। কী দরকার এ ধরনের হুমকি-ধমকির মশকরার? বলে দিলেই হয় যে, কিছু খোদার খাশি ছেড়ে দেয়া হয়েছে, যার যার ক্ষেত-ফসল সামলে রাখা যার যার দায়িত্ব। সরকার, মন্ত্রণালয়, এজন্সি, অ্যাসোসিয়েশনসহ নানা প্রতিষ্ঠান এগুলো রাখতে হয় তাই রাখার জন্যই রাখা!

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
rintu108@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category