• শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩২ অপরাহ্ন

এশীয় মুদ্রাবাজারে ডলারের দাপট ম্লান করে টাকার অভাবনীয় স্থিতিশীলতা

Reporter Name / ২ Time View
Update : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এশিয়ার অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে যখন ডলারের একচেটিয়া আধিপত্য এবং স্থানীয় মুদ্রাগুলোর চরম অবমূল্যায়নের চিত্র প্রবল, ঠিক তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নজির স্থাপন করেছে বাংলাদেশের টাকা। গত এক বছরে এশিয়ার প্রথম সারির একাধিক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মুদ্রা যখন মার্কিন ডলারের বিপরীতে তাদের স্বাভাবিক মান ধরে রাখতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশী মুদ্রা টাকা তার অবস্থান শক্তভাবে ধরে রেখেছে। শুধু স্থিতিশীল থাকাই নয়, বরং ডলারের বিপরীতে টাকার মান অতি সামান্য হলেও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আঞ্চলিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত ‘এক্সচেঞ্জ রেট অ্যান্ড ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট ডায়নামিকস’ শীর্ষক এক বিস্তারিত ও তথ্যবহুল প্রতিবেদনে এশিয়ার এগারোটি দেশের মুদ্রার এক বছরের বিনিময় হারের এই তুলনামূলক চিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে আইএমএফ, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাটিস্টিকস এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত অত্যন্ত সুচারুভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রার মান প্রায় ১১ শতাংশ কমে গেছে। একই সময়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের রুপি এবং দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকার রুপির মান প্রায় ১০ শতাংশ করে অবমূল্যায়িত হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়ার মুদ্রার মানও কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ। ভিয়েতনামের মুদ্রার প্রায় ১ শতাংশ দরপতন হয়েছে এবং সিঙ্গাপুর ও কম্বোডিয়ার মুদ্রা সামান্য অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছে। তবে এই চরম অস্থিরতার মধ্যেও এশিয়ার চারটি দেশের মুদ্রা ডলারের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে। এই দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়ার রিঙ্গিত এবং চীনের ইউয়ানের মান প্রায় ৪ শতাংশ করে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাকিস্তানের রুপির মান বেড়েছে ২ শতাংশ। আর বাংলাদেশের আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে টাকার মান প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে একটি চমৎকার স্থিতিশীলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের ১ জুন যেখানে প্রতি ডলারের গড় বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৯৬ পয়সা, ঠিক এক বছর পর চলতি বছরের ১ জুন তা প্রায় ২১ পয়সা কমে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় স্থির হয়েছে।
টাকার এই শক্ত অবস্থানের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ এবং প্রবাসীদের পাঠানো বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির মতো বৈরী পরিবেশের মধ্যেও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখাকে একটি বিশাল সাফল্য হিসেবে দেখছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, গত এক বছরে ভারতসহ এশিয়ার অনেক শক্তিশালী দেশের স্থানীয় মুদ্রার ব্যাপক পতন হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঠিক সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, গত অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজার নিয়ন্ত্রণে এক ডলারও বিক্রি করতে হয়নি, বরং বাজার থেকে উল্টো প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার কিনে নেওয়া হয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি বিনিময় হারও স্থিতিশীল রয়েছে। প্রবাসীদের অবদানের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করে তিনি জানান, গত অর্থবছরে প্রবাসীরা রেকর্ড সাড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন এবং চলতি অর্থবছরে সেই ধারা আরও বেগবান হয়েছে।
বর্তমানের এই স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতির একটি অন্ধকার অতীতও রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে এখনো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ২০২২ সালের পর থেকে পরবর্তী তিন বছরে টাকার বিনিময় হারে প্রায় ৪৫ শতাংশেরও বেশি অবমূল্যায়ন ঘটেছিল। অত্যন্ত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এত বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে ওঠার মতো সক্ষমতা দেশের অর্থনীতির ছিল না। সেই ভয়াবহ অবমূল্যায়নের প্রত্যক্ষ প্রভাবেই দেশে মূল্যস্ফীতির হার দুই অংকের ঘর ছাড়িয়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম সংকটে ফেলে দেয়। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমলেও তা এখনো পুরোপুরি সহনশীল বা নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এর পাশাপাশি দেশে চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন খাত ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যার ফলে বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকার যে সুফল দেশের পাওয়ার কথা ছিল, তা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, প্রতিবেশী দেশ ভারতের অর্থনীতি বর্তমানে মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে বেশ চাপের মুখে রয়েছে। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, গত এক বছরের ব্যবধানে ভারতীয় রুপির প্রায় ১০ শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটেছে। এই সময়ের মধ্যে ডলারের বিপরীতে রুপির মান সর্বনিম্ন ৮৭ দশমিক ৬০ রুপি থেকে কমতে কমতে একপর্যায়ে ৯৭ রুপিতে গিয়ে ঠেকেছিল। বর্তমানে ভারতের বাজারে প্রতি ডলার প্রায় ৯৬ রুপিতে লেনদেন হচ্ছে। ভারতীয় বাজার বিশ্লেষকরা এর পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। বিশেষ করে বাজারে ডলারের জোগানের তুলনায় চাহিদা অনেক বেশি। বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ক্রমাগত ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে তাদের বিপুল পরিমাণ মূলধন প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় তেল আমদানিতে ভারতকে প্রচুর ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। তবে এত বড় অবমূল্যায়নের পরও ভারতের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি অনেকটাই তাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে, যা গত আগস্ট মাসেও মাত্র ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ ছিল। প্রায় একই রকম ১০ শতাংশ অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছে শ্রীলংকার রুপি। তবে ২০২২ সালের মার্চ মাসের পর দেশটিতে যখন ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছিল এবং ডলারের মূল্য ২০০ রুপি থেকে ৩৫০ রুপি ছাড়িয়ে গিয়েছিল, সেই দেউলিয়া অবস্থার তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই ভালো এবং প্রতি ডলার এখন ৩৩০ রুপির নিচেই রয়েছে।
বাংলাদেশের এই অভাবনীয় স্থিতিশীলতার সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রবাসী আয়ের ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, এশিয়ার দেশগুলোর মুদ্রার ওঠানামার সঙ্গে বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী যখন ডলারের চাহিদা ও মূল্য ঊর্ধ্বমুখী, তখন বাংলাদেশে প্রতি মাসে আসা প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের বিপুল রেমিট্যান্স একাই দেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তবে তিনি বিনিময় হারের এই স্বস্তির পাশাপাশি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বড় চ্যালেঞ্জগুলোর বিষয়েও নীতিনির্ধারকদের কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং বাণিজ্য ঘাটতিও প্রসারিত হচ্ছে। দেশে দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি খাতে যে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে, জ্বালানি সংকটের কারণে তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠে বেসরকারি খাত যখন আবার পূর্ণোদ্যমে ঘুরে দাঁড়াবে, তখন শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যাবে। সেই বিশাল চাহিদার মুহূর্তে ডলারের বিনিময় হার কতটা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই যেকোনো আকস্মিক অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এখন থেকেই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেই বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও উৎসাহব্যঞ্জক খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডি’স রেটিংস। সংস্থাটি সম্প্রতি বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস বা আউটলুক ‘নেতিবাচক’ পর্যায় থেকে উন্নীত করে ‘স্থিতিশীল’ পর্যায়ে নির্ধারণ করেছে। দেশে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ধারাবাহিক শক্তিবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজমান দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমে আসার ফলেই মুডি’স তাদের মূল্যায়নে এই ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। তবে বৈশ্বিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী এই সংস্থাটি বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান আগের মতোই ‘বি২’ পর্যায়ে অপরিবর্তিত রেখেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, মুডি’সের এই স্থিতিশীল পূর্বাভাস আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহের সৃষ্টি করবে। আর দেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে তা ডলারের সরবরাহ বাড়াবে, যা দীর্ঘমেয়াদে টাকার বিনিময় হারকে আরও বেশি স্থিতিশীল ও সুদৃঢ় করতে প্রত্যক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category