ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ নামক একটি ছোট্ট জনপদ থেকে যে ঐতিহাসিক ইসলামী শিক্ষাধারার সূচনা হয়েছিল, প্রায় দেড় শতাব্দী পর এসে সেই ধারার বৈশ্বিক মানচিত্রে সবচেয়ে বড় ও প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, শিক্ষার্থীর বিপুল সমাগম এবং কাঠামোগত সম্প্রসারণের গতির বিচারে বর্তমানে এই দেশ দেওবন্দি শিক্ষার মূল আদিভূমি ভারত এবং প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানকেও বহুদূরে ছাড়িয়ে গেছে। ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক সিপাহি বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে মুসলিম সমাজে ধর্মীয় বুনিয়াদি শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের লক্ষ্য নিয়ে মাওলানা কাসিম নানুতাবির নেতৃত্বে ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দারুল উলুম দেওবন্দ। পরবর্তীতে এই ধারার শিক্ষা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশভাগের পর ভৌগোলিক সীমানায় পৃথকভাবে এর বিকাশ ঘটে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কওমি শিক্ষার সবচেয়ে দ্রুত ও নজিরবিহীন বিস্তার ঘটেছে বাংলাদেশের মাটিতে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে সারা বিশ্বে দেওবন্দি বা কওমি ধারার মাদরাসায় অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৬০ শতাংশই এ দেশের, যা পাকিস্তানের মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।
দেশের বৃহত্তম কওমি শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সর্বশেষ দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, তাদের অধীনে বর্তমানে নিবন্ধিত মাদরাসার সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার ৭৩০টি এবং এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ৭০ লাখ। এর বাইরেও দেশে অন্যান্য ছোট-বড় কওমি বোর্ডের অধীনে আরও ১০ হাজারেরও বেশি মাদরাসা পরিচালিত হচ্ছে, যার ফলে দেশে কওমি ধারার মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪০ হাজার পার হয়ে গেছে। অন্যদিকে, ভারতের জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অধীন অল ইন্ডিয়া দ্বীনি তালীমি বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাদের আওতায় ২০ হাজার ৯০০টি প্রতিষ্ঠান এবং প্রায় ২৩ লাখ ৭১ হাজার শিক্ষার্থী ছিল। পাকিস্তানের বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার অধীনে রয়েছে ২৭ হাজার ৪৮টি মাদরাসা এবং সেখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৪ লাখ ২ হাজার ৩২৩ জন। এই তুলনামূলক চিত্র থেকে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ এখন বিশ্ব দেওবন্দি শিক্ষার বৃহত্তম রাজধানী। শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই নয়, প্রতি বছর এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বেফাকের তথ্যমতে, চলতি বছর তাদের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬ জন পরীক্ষার্থী, যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেশি। শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চরম দারিদ্র্য এবং সাধারণ শিক্ষায় অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণেই কওমি মাদরাসাগুলো এখন নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী পরিবারের জন্য একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প নিখরচায় আবাসিক শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে এই কওমি শিক্ষার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯০১ সালে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ভারতের দেওবন্দের আদর্শ ও সিলেবাস অনুসরণে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে দেশজুড়ে কওমি শিক্ষার বিস্তার ঘটে। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, দেশের এই বিশাল শিক্ষাধারা এবং হাজার হাজার কওমি মাদরাসা এখনো মূলধারার সরকারি নিবন্ধন কাঠামোর সম্পূর্ণ বাইরে রয়ে গেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে দেওবন্দি মাদরাসাগুলোর পরিচালনাকারী সংস্থা ‘শূরা সোসাইটি’ সে দেশের সোসাইটি অ্যাক্টের অধীনে আইনিভাবে নিবন্ধিত এবং সংবিধান স্বীকৃত সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়। পাকিস্তানেও কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর সরকার কর্তৃক সরাসরি স্বীকৃত। অথচ বাংলাদেশে কওমি শিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে এর সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির সীমাবদ্ধতাকে। যদিও দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০১৮ সালে কওমি শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদিস’কে সাধারণ শিক্ষার মাস্টার্স সমমান হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং ছয়টি বড় বোর্ডকে নিয়ে ‘আল-হাইআতুল উলইয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ গঠন করা হয়। কিন্তু প্রাথমিক, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের বাকি বিশাল অংশ এখনো সরকারি স্বীকৃতির বাইরে থাকায় দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারা লাখ লাখ শিক্ষার্থী মূলধারার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও চাকরির বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্য ও সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
কওমি মাদরাসার এই দ্রুত অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ এবং সরকারি নিবন্ধনের প্রশ্নে খোদ দেশের আলেম সমাজের মধ্যেই তীব্র মতভেদ ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে। একাংশের মতে, আলিয়া মাদরাসাগুলোর মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়ায় সাধারণ মানুষের আস্থা এখন কওমি মাদরাসার ওপর এবং এটিই ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণের একমাত্র কার্যকর মাধ্যম। অন্যদিকে প্রগতিশীল আলেম ও শিক্ষাবিদেরা মনে করেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে একই ধরনের ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন দুটি পৃথক সমান্তরাল ধারায় পরিচালিত হওয়া জাতীয় শিক্ষানীতির জন্য চরম ক্ষতিকর। তাই কওমি মাদরাসাগুলোকে রাষ্ট্রীয় অডিট, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক কর্মমুখী শিক্ষাক্রম প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি যৌথ কাঠামোর আওতায় আনা জরুরি। তবে সিলেট অঞ্চলের কওমি শিক্ষা বোর্ড আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালিম বাংলাদেশের মতো কিছু বোর্ডের নেতাদের আশঙ্কা, সরকারি নিবন্ধনের আওতায় এলে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে কওমি শিক্ষার আদি স্বকীয়তা ক্ষুণ্ন হতে পারে এবং সরকার তাদের ওপর নিজস্ব সিলেবাস বা ধর্মনিরপেক্ষ পাঠ্যবই চাপিয়ে দিতে পারে, যা মৌলিক ইসলামী শিক্ষার আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক।
সরকারি স্বীকৃতি ও আধুনিক কর্মমুখী শিক্ষার এই অভাবের কারণে কওমি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এক প্রকার অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যার প্রমাণ মিলেছে বিভিন্ন সাম্প্রতিক গবেষণায়। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, কওমি মাদরাসা থেকে পড়ালেখা শেষ করা শিক্ষার্থীদের মাত্র ২ দশমিক ১৭ শতাংশ মূলধারার সরকারি বা বেসরকারি আনুষ্ঠানিক চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। তাদের প্রায় ৪৬ দশমিক ৫৫ শতাংশই বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসায় ইমাম, মুয়াজ্জিন বা শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত কম বেতনে কর্মসংস্থান খুঁজে নেন এবং বাকিরা জীবিকার তাগিদে ক্ষুদ্র ব্যবসা বা অনানুষ্ঠানিক শ্রম পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হন। দাওরায়ে হাদিস পাস করার পর যৎসামান্য বেতনে সংসার চালাতে না পেরে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে প্রিন্টিং বা মুদি ব্যবসার মতো ভিন্ন পেশা বেছে নিতে হচ্ছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলা ও সমন্বয়হীনতার কথা স্বীকার করে বেফাকের মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী জানিয়েছেন যে, দেশে যথাযথ তদারকি ও নীতিমালা ছাড়াই ব্যক্তিগত উদ্যোগে যত্রতত্র কওমি মাদরাসা গড়ে উঠছে, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা নষ্ট করছে এবং শিশু অধিকারের সুরক্ষাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অমিত সম্ভাবনাকে মূলধারার জাতীয় অর্থনীতিতে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা বজায় রেখে অনতিবিলম্বে একটি সমন্বিত, আধুনিক ও স্বচ্ছ নিবন্ধন ও পাঠ্যক্রম কাঠামো গড়ে তোলা রাষ্ট্রের জন্য সময়ের দাবি।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা