উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়ে হাজার হাজার মাইল দূরে পাড়ি জমানো তরুণদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও নিজস্ব আবাসন একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবেই বিবেচিত হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে সেই নিরাপদ আশ্রয়ই পরিণত হয়েছিল এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে। জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি নামের এই দুই মেধাবী শিক্ষার্থীকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে লিমনেরই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন রুমমেট হিশাম সালেহ আবুগারবিয়াকে। তবে এই ঘটনার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও আক্ষেপের বিষয় হলো, এই নির্মম হত্যাকাণ্ড হয়তো এড়ানো যেত। মর্মান্তিক এই ঘটনার ঠিক পনেরো দিন আগে অভিযুক্তের অস্বাভাবিক ও উগ্র আচরণের বিষয়ে আবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন নিহত লিমন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেই অভিযোগ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে যায়, যার চরম মূল্য চোকাতেও হলো দুটি তরতাজা প্রাণ দিয়ে।
নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্য এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত হিশামের সঙ্গে জামিল লিমনের সম্পর্ক মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। হিশামের আচরণ প্রথম থেকেই ছিল অত্যন্ত রুক্ষ, অসামাজিক এবং সন্দেহজনক। লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ জানিয়েছেন যে, লিমন প্রায়ই তার পরিবারের কাছে রুমমেটের এই অস্বাভাবিক আচরণের কথা বলতেন। এমনকি হিশামকে একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত বা সাইকোপ্যাথ বলেও সন্দেহ করতেন তিনি। পরিস্থিতির অবনতি হলে লিমন তার আরেক ভারতীয় রুমমেটকে সঙ্গে নিয়ে ‘অ্যাভালন হাইটস’ নামক ওই আবাসন ব্যবস্থাপনার কাছে একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, এত গুরুতর একটি অভিযোগ পাওয়ার পরও কর্তৃপক্ষ অভিযুক্তকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া বা কোনো ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সামান্যতম উদ্যোগও নেয়নি। পরিবারের অভিযোগ, কোনো শিক্ষার্থীর অতীত ইতিহাস বা ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই না করেই এমন একজন বিপজ্জনক ব্যক্তিকে লিমনের রুমমেট হিসেবে নির্বাচন করেছিল আবাসন কর্তৃপক্ষ, যা তাদের চরম দায়িত্বহীনতারই প্রমাণ।
অনুসন্ধানে ও ফ্লোরিডা পুলিশের তদন্তে অভিযুক্ত হিশাম সালেহ আবুগারবিয়ার এক অন্ধকার ও সহিংস অতীতের কথা উঠে এসেছে। ছাব্বিশ বছর বয়সী এই মার্কিন তরুণের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, হিশামের নিজের পরিবারই তার উগ্রতা ও সহিংসতার হাত থেকে বাঁচতে একাধিকবার আইনি সুরক্ষা চেয়েছিল। এমনকি তার মা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে স্বীকার করেছেন যে, হিশাম চরম রাগী এবং অতীতে সে পরিবারের সদস্যদের ওপরও আক্রমণ করেছে। নিজের ছোট বোনের ওপর মারাত্মক হামলার ইতিহাসও তার রয়েছে। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা, অন্যায়ভাবে কাউকে আটকে রাখা, তথ্যপ্রমাণ ধ্বংস করাসহ অন্তত ছয়টি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এমন একজন দাগী অপরাধীকে কীভাবে একটি আন্তর্জাতিক মানের ছাত্রাবাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে থাকার অনুমতি দেওয়া হলো, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি হঠাৎ করেই নিখোঁজ হন। এরপরই পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক সব তথ্য। সিসিটিভি ফুটেজে হিশামের গাড়ির সন্দেহজনক গতিবিধি নজরে আসার পর পুলিশ হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে প্লাস্টিকের ব্যাগে মোড়ানো অবস্থায় লিমনের খণ্ডিত দেহাংশ উদ্ধার করে। অন্যদিকে ইন্টারস্টেট-২৭৫ মহাসড়ক সংলগ্ন একটি জলাশয় থেকে আরও একটি দেহাবশেষ পাওয়া যায়। ফ্লোরিডা পুলিশের জোর তল্লাশিতে অভিযুক্ত হিশামের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে নাহিদা বৃষ্টির ডিএনএ-এর আলামত এবং রক্তের দাগ পাওয়া যায়। এই ডিএনএ প্রমাণের ভিত্তিতেই বৃষ্টির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তজা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্তও বোনের মৃত্যুর দুঃসংবাদটি নিশ্চিত করেছেন। তদন্তে জানা গেছে, এই হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল এক সুপরিকল্পিত নীল নকশার অংশ। হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন আগে থেকেই হিশাম বড় আকারের ময়লা ফেলার ব্যাগ ও ডাক্ট টেপ কিনে রেখেছিল। এমনকি অনলাইনে সে মৃতদেহ গুম করার বিভিন্ন উপায় নিয়েও বিস্তর পড়াশোনা করেছিল, যা তার অপরাধী মানসিকতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ।
এই অকল্পনীয় ক্ষতিতে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে নিহতদের পরিবার, বন্ধুমহল এবং গোটা প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজ। নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবার এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা ঘাতক হিশামের সর্বোচ্চ শাস্তির পাশাপাশি ‘অ্যাভালন হাইটস’ কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির বিচার চেয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের যৌক্তিক প্রশ্ন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ক্যামেরা, নৈশপ্রহরী এবং সঠিক ব্যাকগ্রাউন্ড চেকের মতো মৌলিক বিষয়গুলো কেন একটি ছাত্রাবাসে অনুপস্থিত ছিল? প্রথম অভিযোগ পাওয়ার পর কেন ঘাতককে তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে দেওয়া হলো না? পাশাপাশি তারা ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী নিহতদের মৃতদেহ দাফনের জন্য দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তাদের স্মরণে একটি স্মারক স্থাপনের জোর দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে লিমনের এক নিকটাত্মীয় ফ্লোরিডায় অবস্থান করে পুরো আইনি প্রক্রিয়া এবং মৃতদেহ দেশে আনার বিষয়টি তদারকি করছেন।
বিদেশের মাটিতে পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা এই শিক্ষার্থীরা একে অপরের জন্যই ছিলেন পরিবারের মতো। লিমনের বন্ধু রিফাতুল ইসলাম আক্ষেপ করে জানান, বাড়ি থেকে আট হাজার মাইল দূরে এই বন্ধুরাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। অথচ নিজেদের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা বলে বিবেচিত নিজেদের রান্নাঘরেই তাদের এভাবে খুন হতে হবে, তা কেউ দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি। লিমনের আরেক বন্ধু সালমান সাদিক শুভর মতে, লিমন ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও হাসিখুশি একজন মানুষ, আর নাহিদাও ছিলেন ভীষণ অমায়িক। এমন নিরপরাধ ও প্রাণবন্ত দুটো মানুষের এমন মর্মান্তিক পরিণতি পুরো কমিউনিটিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর অসংখ্য শিক্ষার্থী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের জোরে তারা জায়গা করে নেন প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টিও ছিলেন সেই স্বপ্নবাজ তরুণদেরই প্রতিনিধি। কিন্তু তাদের এই অকাল মৃত্যু পুরো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সমাজের মধ্যে এক গভীর আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। অনেক অভিভাবক এখন তাদের সন্তানদের বিদেশে পাঠাতে কিংবা বিদেশের মাটিতে তাদের বর্তমান নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করছেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ভিনদেশে খাপ খাইয়ে নেওয়া এমনিতেই একটি বড় মানসিক চ্যালেঞ্জ। তার ওপর যদি নিজ ঘরেই সহপাঠী বা রুমমেটের হাতে জীবননাশের হুমকি থাকে, তবে সেই পরিবেশ কোনোভাবেই শিক্ষার অনুকূল হতে পারে না।
গ্রেফতারের পর অভিযুক্ত হিশামকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক লোগান মারফি তার জামিন আবেদন সরাসরি নাকচ করে দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি প্রিট্রায়াল শুনানিতে অভিযুক্ত উপস্থিত না থাকলেও আদালত তাকে বিনা জামিনে আটকে রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। এদিকে আবাসন কর্তৃপক্ষ এক দায়সারা বিবৃতিতে কেবল শোক প্রকাশ করে জানিয়েছে যে তারা তদন্তকারীদের পূর্ণ সহযোগিতা করছে। এর বাইরে চলমান তদন্তের অজুহাতে তারা আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
বর্তমানে তদন্তকারী কর্মকর্তারা নিখুঁত চার্জশিট গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছেন এবং আগামী মাসেই মামলাটি গ্র্যান্ড জুরির সামনে উপস্থাপন করা হবে। সেই সাথে ১৭ এপ্রিল রাত ১টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় সন্দেহজনক কোনো গতিবিধি কারো নজরে এসে থাকলে তা দ্রুত পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। নিহতদের পরিবার ও কমিউনিটির নেতারা এখন এক সুদীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লিমনের দেওয়া সেই লিখিত অভিযোগটিই এই মামলায় আবাসন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। কারণ সেটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই বিপদের আঁচ পেয়েছিল, কিন্তু তারা জেনেবুঝে কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
বিদেশের মাটিতে পড়তে যাওয়া প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একটি মৌলিক দায়িত্ব। লিমন ও বৃষ্টির এই অকাল প্রস্থান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। শুধু ঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই নয়, বরং এই কাঠামোগত গাফিলতির কঠোর বিচার না হলে ভবিষ্যতে এমন মৃত্যুফাঁদে আরও অনেক মেধাবীর স্বপ্ন এভাবেই নিঃশব্দে চিরতরে হারিয়ে যাবে।