দেশের একমাত্র ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি সার উৎপাদনের মূল কেন্দ্রে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে | প্রয়োজনীয় কাঁচামাল তথা ফসফরিক অ্যাসিডের তীব্র সংকটের কারণে গত চার মাসেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ও উৎপাদনহীন অবস্থায় রয়েছে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় অবস্থিত ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড | কারখানাটির চাকা সচল রাখার জন্য অতীতে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমদানিসংক্রান্ত জটিলতা, পুনঃদরপত্র আহ্বান এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার গোলকধাঁধায় পড়ে এখনো পর্যন্ত কাঁচামাল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি | গত ২৮ জুন থেকে উৎপাদন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার ফলে চলতি অর্থবছরের নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বড় ধরনের কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ | একদিকে কারখানার ভেতরে উৎপাদনের চাকা পুরোপুরি থমকে আছে, অন্যদিকে প্রায় আটশ স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মীর মাসিক বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রতি মাসে প্রায় পনেরো কোটি টাকার অপচয় হচ্ছে |
ডিএপি সার উৎপাদনের প্রধান দুটি কাঁচামালের মধ্যে অন্যতম হলো অ্যামোনিয়া এবং ফসফরিক অ্যাসিড | এর মধ্যে অ্যামোনিয়ার স্থানীয় চাহিদা মেটানোর জন্য চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড তথা সিইউএফএল এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড বা কাফকোর ওপর নির্ভর করতে হয় | তবে সারের মূল ভিত্তি তথা ফসফরিক অ্যাসিডের পুরো চাহিদাই পুরোপুরি আমদানিনির্ভর এবং তা বিদেশ থেকেই সংগ্রহ করতে হয় | সাধারণত মরক্কো, জর্ডান, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এই অতি জরুরি কাঁচামাল আমদানি করে থাকে বাংলাদেশ | বর্তমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে চীন তাদের উৎপাদিত ফসফরিক অ্যাসিড রফতানি বন্ধ করে দেওয়ায় মরক্কো এবং জর্ডানই ডিএপিএফসিএলের আমদানির প্রধান উৎস হিসেবে অবশিষ্ট রয়েছে | কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ববাজারে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে এই কাঁচামালের দাম গত বছরের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমদানি প্রক্রিয়াকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে |
কারখানাটির নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন বা বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, ফসফরিক অ্যাসিডের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে ২০ হাজার টন পরিমাণের এক একটি লট আমদানির জন্য শুরুতে পরপর দুই দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল | কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই দুটি টেন্ডারে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা দরদাতা অংশ নেয়নি | পরবর্তীতে একই পরিমাণ কাঁচামাল আমদানির জন্য যখন পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়, তখন কেবল একজনমাত্র একক দরদাতা অংশ নেন | এরপর আরও দুটি পৃথক লটের জন্য আলাদাভাবে দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং সমস্ত প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাই শেষে গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষভাগে অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির দপ্তরে পাঠানো হয় | দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত সেই প্রস্তাব অনুমোদন লাভ করেনি, যার ফলে আমদানির ফাইলটি টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরে বেড়ানোর বেড়াজালে আটকে রয়েছে |
আন্তর্জাতিক বাজারে ফসফরিক অ্যাসিডের মূল্যবৃদ্ধির চিত্রটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বর্তমান পরিস্থিতি কতটা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে | বিসিআইসির হিসাব অনুযায়ী, ২০ হাজার টনের প্রতিটি লট আমদানির জন্য যে সর্বনিম্ন দর পাওয়া গেছে তাতে প্রতি টন ফসফরিক অ্যাসিডের দাম পড়ছে যথাক্রমে ১ হাজার ৭৯ ডলার, ১ হাজার ৮৭ ডলার এবং ১ হাজার ৭১ ডলারের বেশি | অথচ চলতি বছরের শুরুর দিকে বাংলাদেশ প্রতি টন এই কাঁচামাল কিনেছিল মাত্র সাড়ে সাতশো থেকে সাতশ সত্তর ডলারের মধ্যে | আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে এক হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে দেশীয় কারখানায় এই কাঁচামাল এনে সার উৎপাদন করলে সামগ্রিক খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে | এরই মধ্যে বিসিআইসির একটি সূত্র জানিয়েছে যে, বর্তমান উচ্চমূল্যে কাঁচামাল আমদানি করে সার উৎপাদনের চেয়ে তৈরি সার সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী হতে পারে এবং টনপ্রতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব | এই অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং ব্যয় সংকোচনের নীতির কারণেই মূলত নীতিনির্ধারক মহল ফসফরিক অ্যাসিড আমদানির ফাইলটি দ্রুত ছাড় করার বিষয়ে এক ধরনের ধীরনীতি অনুসরণ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে |
২০০৬ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসা এই গুরুত্বপূর্ণ কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ছয়শ টন | অথচ বর্তমান অর্থবছরে মূল লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ টন নির্ধারণ করা হলেও কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় তা কমিয়ে আট হাজার বা ৮০ হাজার টনে নামিয়ে আনা হয়েছে | কিন্তু বর্তমান যে স্থবির অবস্থা বিরাজ করছে তাতে এই সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করাও সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে খোদ সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যেই তীব্র সংশয় রয়েছে | এর আগের অর্থবছরে কারখানাটিতে ৮২ হাজার টন এবং তার আগের বছর ১ লাখ ১৯ হাজার টন ডিএপি সার উৎপাদিত হয়েছিল | উৎপাদনের এই ধারাবাহিক পতন কেবল কৃষি খাতের জোগানকেই ব্যাহত করছে না, বরং রাষ্ট্রীয় লোকসানের বোঝাও ভারী করছে | কারখানার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে পাঁচ শতাধিক স্থায়ী কর্মী এবং আড়াইশ জনের বেশি অস্থায়ী শ্রমিকসহ মোট প্রায় আটশ জন কর্মী কর্মরত রয়েছেন | কোনো ধরনের উৎপাদন না হওয়া সত্ত্বেও এই বিপুল সংখ্যক কর্মীর মাসিক বেতন এবং কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ প্রতি মাসে ১৫ কোটি টাকার মতো গ্যারাণ্টিড ব্যয় গুণতে হচ্ছে সরকারকে, যা সম্পূর্ণ উৎপাদনহীন অবস্থায় বিশাল আর্থিক গর্ত তৈরি করছে |
আমদানির অনুমতি বিলম্বিত হওয়ার পেছনের প্রশাসনিক ও আইনি যুক্তির কথা তুলে ধরে শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বিসিআইসির দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিরা বলছেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে যেকোনো বড় ধরনের কেনাকাটা বা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা এবং ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ বা ঝুঁকি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাইয়ের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে | শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কেবল একজন করে দরদাতা অংশ নেওয়ায় তা আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য পুনঃদরপত্র বা রি-টেন্ডারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে | যদিও আইনগতভাবে একক দরদারেও কাজ দেওয়ার বিধান রয়েছে, তবুও সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র উন্মুক্ত রাখতে এবং সঠিক বাজারদর যাচাই করতে রি-টেন্ডারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে | বিসিআইসির বাণিজ্য ও উৎপাদন বিভাগের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামানও জানিয়েছেন যে, প্রস্তাবগুলো মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ক্রয় কমিটিতে পাঠানো হলেও এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি, এবং অনুমোদন পাওয়ার পরই কেবল পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে |
এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেশের সারের সামগ্রিক চাহিদার একটি বিশাল চিত্র সামনে আসে | চলতি অর্থবছরে দেশের কৃষিখাতে ডিএপি সারের মোট চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ টনের কাছাকাছি, যার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ১৪ লাখ টনই সরাসরি আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়ে থাকে | ডিএপি উৎপাদনের মূল দায়িত্ব বিসিআইসির হাতে থাকলেও সমাপ্ত সার আমদানির কাজটি পরিচালনা করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন আরেকটি সংস্থা—বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএডিসি | সাধারণত চীন, সৌদি আরব এবং মরক্কো থেকে সার আমদানি করে থাকে বিএডিসি | তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভূরাজনৈতিক জটিলতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে | ইরান সংকটের জেরে চীন তাদের রফতানি কোটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করায় বাংলাদেশের নির্ভরতা পুরোপুরি স্থানান্তরিত হয়েছে সৌদি আরব এবং মরক্কোর ওপর |
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প সমুদ্রপথ এবং সরবরাহ রুট ব্যবহার করে সার আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে | হরমুজ প্রণালীর ঝুঁকি এড়িয়ে লোহিত সাগর হয়ে বিকল্প উপায়ে সৌদি আরব থেকে সার আনার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে | চলতি বছরের প্রথম আট মাসে কেবল ৪০ হাজার টন ডিএপি এলেও পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে আমদানির গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে | ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি লটে প্রায় দুই লাখ টন সার দেশে এসে পৌঁছেছে এবং আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেবল সৌদি আরব থেকেই ৪ লাখ ৪০ হাজার টন ডিএপি আমদানির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে | পাশাপাশি মরক্কোর সঙ্গে সম্পাদিত জিটুজি বা সরকারি চুক্তির আওতায় পূর্বে প্রতি মাসে দুটি লট আসলেও সেপ্টেম্বর মাস থেকে তা বাড়িয়ে চার লট করে নিয়মিত আনা হচ্ছে | কিন্তু আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের এই চড়াই-উতরাই এবং বৈশ্বিক সংকটের মাঝে দেশের নিজস্ব একমাত্র কারখানাটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় ভবিষ্যতে সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও সারের বাজারে একধরণের স্থায়ী ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা |
সব মিলিয়ে, কাঁচামাল আমদানির টেন্ডার সংক্রান্ত জটিলতা, একক দরদাতার শর্তের বেড়াজাল, আন্তর্জাতিক বাজারে ফসফরিক অ্যাসিডের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি ক্রয়ের দীর্ঘসূত্রতার যাঁতাকলে পড়ে দেশের ডিএপি উৎপাদন খাত এক গভীর অনিশ্চয়তার অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে | একদিকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় তহবিল বিনা উৎপাদনে অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক অনুমোদন ও পুনঃদরপত্রের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সময় গড়িয়ে চলেছে | কৃষকদের দোরগোড়ায় সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়ার এই সংবেদনশীল খাতে যদি অবিলম্বে কোনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার মাধ্যমে স্থায়ী সুরাহা করা না যায়, তবে দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ ধাক্কা সামলাতে হতে পারে | কারখানার চাকা সচল রাখতে এবং শ্রমজীবীদের কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারকদের অতি দ্রুত সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি |
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা