দেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে নেওয়া এযাবৎকালের অন্যতম বৃহৎ মেগা প্রকল্প ‘প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ বা সংক্ষেপে ‘পার্টনার’ প্রকল্পে এক নজিরবিহীন আর্থিক ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার চিত্র সামনে এসেছে। সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয়েছে যে, মাত্র দুই অর্থবছরেই এই প্রকল্পে ১ হাজার ৪৬ কোটি টাকারও বেশি অডিট আপত্তি উঠেছে, যার একটিও এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি। পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটির অর্ধেকের বেশি সময় ইতিমধ্যে পার হয়ে গেলেও এর সামগ্রিক আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ২৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার এই মহাপরিকল্পনার এই শ্লথ গতি ও বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান নীতিনির্ধারকেরা তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
আইএমইডির প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ এই দুই অর্থবছরে প্রকল্পের লিড এজেন্সি বা প্রধান বাস্তবায়নকারী সংস্থা ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর’ অংশে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও খামখেয়ালিপনা ধরা পড়েছে। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই ২৫টি অডিট আপত্তির বিপরীতে প্রায় ৮৩৫ কোটি টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে। এই অর্থবছরটিতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি-র নির্ধারিত তহবিল ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক বিধিমালা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে অনিয়মিতভাবে ২৬৪ কোটি ৫১ লাখ টাকার তহবিল ছাড় করা হয়। শুধু তাই নয়, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে কোনো মালামাল বা পণ্য সরবরাহ পাওয়ার আগেই সরবরাহকারীকে অগ্রিম ৮৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক সমন্বয়ের ভিত্তিতে সঠিক আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাংকের মূল হিসাবের সাথে মূল খাতার খতিয়ানের প্রায় ৩৭৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার বিশাল গড়মিল বা অমিল পাওয়া গেছে। একই সাথে, সরকারি স্পষ্ট নির্দেশনা ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পের অর্থ দিয়ে কেনা ৯৯ কোটি conci১ লাখ টাকার কোনো পণ্যের তালিকা বা ইনভেন্টরি রেজিস্টার তৈরি করা হয়নি।
আর্থিক শৃঙ্খলার এই চরম অবনতি পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও অব্যাহত ছিল এবং নতুন করে ৩টি অডিট আপত্তিতে ২১০ কোটি ৪৭ লাখ টাকার অনিয়ম সামনে এসেছে। এই অর্থবছরেও পূর্বের মতোই ডিপিপি নির্ধারিত নিয়ম ভেঙে অনিয়মিতভাবে ২১০ কোটি ২৬ লাখ টাকার তহবিল ছাড় করা হয়। এছাড়া গুদাম বা মজুদ রেজিস্টারে বিভিন্ন পণ্যের মনগড়া ও কাল্পনিক বণ্টন দেখিয়ে সরকারের প্রায় ১৭ লাখ টাকার সরাসরি আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। এমনকি চুক্তিভিত্তিক যানবাহন ব্যবহার করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা না মেনে, খুচরা খরচের ভাউচারের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অনিয়মিতভাবে প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার টাকা নগদে গাড়িভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে। যদিও বর্তমান প্রকল্প কো-অর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদের দাবি, অডিট আপত্তি মানেই দুর্নীতি নয় এবং এটি সঠিক ব্যাখ্যা ও নথিপত্র জমা দিয়ে নিষ্পত্তি করার সুযোগ রয়েছে। তবে বিগত দুই অর্থবছরে একটি আপত্তিও নিষ্পত্তি না হওয়া কর্মকর্তাদের চরম গাফিলতিকেই নির্দেশ করে।
আর্থিক মন্দা ও জবাবদিহিতার অভাবের পাশাপাশি প্রকল্পের মূলধনি খাতের প্রধান প্রধান অবকাঠামোগত কার্যক্রমগুলো এখন সম্পূর্ণ মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের ২০২৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত মেয়াদের অর্ধেকের বেশি সময় (৩৩ মাস) পার হয়ে গেলেও কৃষি যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, নতুন ভবন নির্মাণ, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং দেশব্যাপী ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড’ বিতরণের মতো মূল কাজগুলো এখনো মাঠপর্যায়ে শুরুই করা যায়নি। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, মূল ডিপিপিতে কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত ঘাটতি রয়েছে যা এই স্থবিরতার জন্য দায়ী। যেমন, দেশব্যাপী কৃষক স্মার্ট কার্ড বিতরণে প্রকৃত খরচ হবে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, কিন্তু ডিপিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৭০০ কোটি টাকা। ফলে এই বাজেট সংশোধন না করা পর্যন্ত কার্ড বিতরণ কার্যক্রম পুরোপুরি অচল হয়ে থাকবে। তদুপরি, শুরুতে ফিজিক্যাল কার্ড, পরে ভিজুয়াল কার্ড এবং পুনরায় ফিজিক্যাল কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দোলাচলে কোনো কাজই এগোয়নি এবং এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালাও চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পের এই হতাশাজনক চিত্র নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জানান, বড় প্রকল্প সবসময় বড় উদ্দেশ্য নিয়ে নেওয়া হলেও প্রকল্প পরিচালনায় চরম অদক্ষতা ও অর্থ খরচে দূরদর্শিতার অভাবে তা সফল হয় না। সঠিকভাবে অর্থ ব্যবহার না করায় এই বিশাল অসংগতি দেখা দিয়েছে। প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ৩৩ মাস শেষে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে মাত্র ৬৮০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা; যা বরাদ্দকৃত অর্থের মাত্র ২৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এর অর্থ হলো, বাকি মাত্র ২৬ মাসের মধ্যে প্রকল্পকে সফল করতে হলে বাকি ৭৬ দশমিক ৪১ শতাংশ কাজ শেষ করতে হবে, যা বর্তমান কার্যকারণের গতিকে দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ালেও একপ্রকার অসম্ভব ও কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই ব্যর্থতা ঢাকতে প্রকল্পের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তবে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং কর্মকর্তাদের এই ঢিলেঢালা ভাবকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দিতে রাজি নন বর্তমান কৃষিসচিব রফিকুল ই মোহামেদ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বিগত সরকারের আমলে নেওয়া এই মেগা প্রকল্পে অনেক কাঠামোগত ত্রুটি রয়েছে এবং কর্মকর্তারা অডিট আপত্তির জবাব দেওয়ার ন্যূনতম তাগিদটুকুও দেখাচ্ছেন না। তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে কাজ শেষ করার পুরোনো সংস্কৃতি এবার আর চলবে না; প্রয়োজনে যেসব কর্মকর্তার পারফরম্যান্স খারাপ বা যারা কাজে অবহেলা করছেন, তাদের দ্রুত অদলবদল ও অপসারণ করে হলেও এই মেগা প্রকল্পে গতি ফিরিয়ে আনা হবে। দেশের কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পের সফলতা নিশ্চিত করতে এখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত গতিতে মূলধনি খাতের কাজ শুরু করাই একমাত্র পথ।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা