• বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৮ অপরাহ্ন

ক্ষমতার কেন্দ্রে নেতারা, মাঠে নিষ্ক্রিয় কর্মী: দল গোছাতে হিমশিম খাচ্ছে বিএনপি?

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন সরকার পরিচালনায় চরম ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছে। দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের পর কাঙ্ক্ষিত এই রাজনৈতিক সাফল্যের দেখা পেলেও দলের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক কাঠামোতে নেমে এসেছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও নজিরবিহীন স্থবিরতা। রাষ্ট্রযন্ত্র মেরামত এবং পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া নানা সংকট মোকাবিলায় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এতটাই মগ্ন যে, মাঠ পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সাংগঠনিক পুনর্গঠনের বিষয়টি অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সারা দেশের তৃণমূল নেতাকর্মীদের ওপর। রাজপথের আন্দোলনে যারা একসময় সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সাংগঠনিক স্থবিরতার কারণে তারা এখন ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন। সরকার পরিচালনায় দলীয় নেতৃত্বের দৃশ্যমান সাফল্য থাকলেও, দল হিসেবে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ার এই চিত্র রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।
তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দলের প্রায় প্রতিটি স্তরেই এখন এক ধরনের নেতৃত্বহীনতা বা মেয়াদোত্তীর্ণ নেতৃত্বের রাজত্ব চলছে। জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অধিকাংশ কমিটির মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। পদপ্রত্যাশী তরুণ ও ত্যাগী নেতারা দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকলেও নতুন কমিটি গঠনের কোনো সুস্পষ্ট উদ্যোগ বা রূপরেখা তাদের চোখে পড়ছে না। দলের অনেক নিবেদিতপ্রাণ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, দল ও সরকার এখন যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আগে যেসব নেতা কর্মীদের সুখে-দুঃখে মাঠে থাকতেন, তাদের অনেকেই এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন। সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, পদবি বা ব্যক্তিগত আখের গোছাতে তারা লবিং ও তদবিরে এতটাই ব্যস্ত যে, তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে তাদের বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই অবস্থার কারণে দলের স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রম কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে এবং চেইন অব কমান্ডও দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, অবিলম্বে কমিটি পুনর্গঠন করা হলে দলের ভেতর নতুন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা তৈরি হতো এবং সংগঠন আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠত।
বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর বর্তমান পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই স্থবিরতার ভয়াবহতা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সারা দেশে দলটির মোট ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ৪৯টি ইউনিটে বর্তমানে আহ্বায়ক কমিটি কাজ করছে এবং মাত্র ৩১টিতে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ কমিটি। সবচেয়ে হতাশাজনক পরিসংখ্যান হলো, এই ৮২টি ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে মাত্র আটটি জেলা ও মহানগর কমিটির বৈধ মেয়াদ রয়েছে। বাকি ৭২টি কমিটির মেয়াদই অনেক আগে পার হয়ে গেছে। এমনকি কোনো কোনো জায়গায় তিন থেকে পাঁচ বছর, আবার কোথাও এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একই কমিটি বহাল তবিয়তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে শেরপুর জেলা কমিটির কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত রাখা হয়েছে এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটি বেশ কিছুদিন আগেই বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বিএনপির দলীয় গঠনতন্ত্রে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, প্রতিটি জেলা ও মহানগর কমিটির মেয়াদ হবে দুই বছর। এই মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে অবশ্যই কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। যদি কোনো কমিটি এতে ব্যর্থ হয়, তবে যৌক্তিক কারণ সাপেক্ষে তারা আরও তিন মাস অতিরিক্ত সময় পেতে পারে। এই বর্ধিত সময়ের মধ্যেও নতুন কমিটি দিতে না পারলে পূর্ববর্তী কমিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত বলে গণ্য হবে। এরপর কেন্দ্র থেকে তিন মাসের জন্য একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে, যাদের প্রধান কাজ হবে কাউন্সিল সম্পন্ন করা। তারাও ব্যর্থ হলে কেন্দ্র সরাসরি কমিটি গঠন করে দেবে। কিন্তু দলীয় এই কঠোর নিয়মের কোনো তোয়াক্কাই বর্তমানে করা হচ্ছে না, যার ফলে নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে।
মূল দলের পাশাপাশি বিএনপির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত করুণ। দলটির মোট ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব কটিই বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় ধুঁকছে। জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, জাসাস ও ওলামা দল—এই নয়টি হলো বিএনপির মূল অঙ্গসংগঠন। অন্যদিকে ছাত্রদল ও শ্রমিক দল রয়েছে সহযোগী সংগঠন হিসেবে। গঠনতান্ত্রিকভাবে এসব সংগঠনে দুই বা তিন বছর পর পর নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিধান থাকলেও তা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। ছাত্রদলের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাছির উদ্দিন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে যে কমিটি দেওয়া হয়েছিল, তার মেয়াদ গত ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের অনানুষ্ঠানিক বিদায়ও জানিয়েছেন। এমনকি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাদের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়ে বিদায় নিয়েছেন। এতে নতুন কমিটির আশা প্রবল হলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। তৃণমূলের অভিযোগ, পুরোনো সিন্ডিকেটের অদৃশ্য হস্তক্ষেপে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে আছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই সিন্ডিকেটের প্রভাব না কমায় হতাশা বাড়ছে। তবে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ফারুক হোসেনের মতো নেতারা এখনো আশাবাদী যে, দলের অভিভাবক তারেক রহমানের নির্দেশনায় খুব শিগগিরই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে।
একসময়ের রাজপথ কাঁপানো সংগঠন যুবদলের অবস্থাও এখন অনেকটা নিষ্প্রভ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি ও নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠিত হয় এবং পরবর্তীতে জুনে ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। বর্তমানে সাধারণ সম্পাদক নয়ন জাতীয় সংসদের একজন নির্বাচিত সদস্য। ফলে সংগঠনের দিকে পূর্ণাঙ্গ সময় দেওয়া তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে যুবদলকে গতিশীল করার দাবি উঠলেও পদ হারানোর ভয়ে বা পদ না পাওয়ার শঙ্কায় দায়িত্বশীল নেতারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না। স্বেচ্ছাসেবক দলের চিত্রও প্রায় অভিন্ন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এস এম জিলানী ও রাজীব আহসানের নেতৃত্বে গঠিত তিন বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ গত বছরই ফুরিয়েছে। এই সংগঠনের শীর্ষ দুই নেতাই বর্তমানে সংসদ সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াছিন আলী ও সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান বলছেন, মেয়াদ শেষে নতুন নেতৃত্ব আসাটা জরুরি, তবে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বর্তমানে রাষ্ট্র সংস্কারে ও ফ্যাসিবাদী সরকারের জঞ্জাল সরাতে ব্যস্ত থাকায় এতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। কৃষক দলের সভাপতি হাসান জাফির তুহিন এবং সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুলের কমিটি গঠিত হয়েছিল ২০২১ সালে। দুই বছর আগেই মেয়াদ শেষ হওয়া এই কমিটির সাধারণ সম্পাদক এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য এবং সভাপতিও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্বে রয়েছেন।
মহিলা দল ও মুক্তিযোদ্ধা দলের মতো সংগঠনগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। ২০১৬ সালে আফরোজা আব্বাস ও সুলতানা আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত মহিলা দলের কমিটি প্রায় ১০ বছর ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। অথচ তাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা। মুক্তিযোদ্ধা দলের ইশতিয়াক আজিজ উলফাত এবং সাদেক খানের কমিটি গঠিত হয়েছিল ২০১৩ সালে, যা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলছে। শ্রমিক দলের সর্বশেষ কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৪ সালে, আনোয়ার হোসাইন ও নূরুল ইসলাম খান নাসিমের নেতৃত্বে। ২০১৬ সালে এর মেয়াদ শেষ হলেও আজও নতুন কোনো কাউন্সিল হয়নি। মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম মাহতাব মারা যাওয়ার পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কমিটি বিলুপ্ত করা হলেও এখন পর্যন্ত নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সার্বিক এই স্থবিরতার বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি জানান, একটি রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রম মূলত রুটিন মাফিক চলে। কিন্তু দেশ পরিচালনার এক বিশাল দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই রুটিনে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটাটাই স্বাভাবিক। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া পাহাড়সম অনিয়ম দূর করে দেশকে একটি সঠিক রোডম্যাপে তুলে আনতে সরকারকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। এত ব্যস্ততার মাঝেও দলীয় পুনর্গঠন থেমে নেই এবং খুব শিগগিরই সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নতুন কমিটি ধাপে ধাপে ঘোষণা করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। তবে তৃণমূলের সাধারণ কর্মীরা মনে করেন, ক্ষমতায় থাকার সময় সংগঠনের নিয়মিত কর্মকাণ্ড চালু না থাকলে কর্মীদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়, তা অচিরেই ঘোচাতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে দল হিসেবে বিএনপিকে চরম সাংগঠনিক দুর্বলতার মুখে পড়তে হতে পারে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি দলকে সুসংগঠিত রাখাই এখন তাদের প্রধান দাবি।
তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category