একসময় বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং সরকারে শেখ হাসিনাই ছিলেন সর্বেসর্বা। তাঁর একক সিদ্ধান্তের ওপর কথা বলার মতো ন্যূনতম সাহস বা ধৃষ্টতা দলটির কোনো স্তরের নেতাকর্মীরই ছিল না। কিন্তু ক্ষমতার মসনদ হারানোর পর রাজনীতির চিরন্তন রূঢ় বাস্তবতা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সমীকরণ তৈরি করেছে। দলের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবার খোদ শেখ হাসিনার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ওপর সরাসরি আঘাত এনেছেন। ক্ষমতা হারানোর দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে দলের শীর্ষ নেত্রীর মুখের ওপর তাঁর বিগত দিনের ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন ওবায়দুল কাদের, যা দলটির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অলৌকিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাটি ঘটেছে গত ৭ জুন, ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবসের এক বিশেষ ভার্চুয়াল আলোচনা সভায়। বর্তমানে পলাতক ও দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা এই অনলাইন সভায় যুক্ত হয়েছিলেন। সভাটি দলের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিল, যেখানে লাখ লাখ কর্মী-সমর্থক চরম আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে ওবায়দুল কাদেরকে দলীয় কর্মসূচিতে তেমন একটা দেখা না গেলেও, এদিন তিনি যখন বক্তব্য শুরু করেন, তাঁর কণ্ঠে ছিল তীব্র ঝাঁজ ও ক্ষোভ। উপমহাদেশের সমকালীন ভূরাজনীতি এবং দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে বলতে তিনি আচমকা সরাসরি দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে নিশানা করেন।
ওবায়দুল কাদের কিছুটা বিনয় আর কিছুটা প্রচ্ছন্ন কটাক্ষ মিশিয়ে শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনি অত্যন্ত পরিপক্ব এবং অভিজ্ঞ একজন রাষ্ট্রনায়ক। আপনাকে নতুন করে উপদেশ দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু আমাদের আজ গভীরভাবে ভাবতে হবে, আমরা অনেক আশা নিয়ে যাঁদের দেশের রাষ্ট্রপতি এবং সেনাবাহিনীর প্রধান বানিয়েছিলাম, বিনিময়ে আজ তাঁরা আমাদের কী দিচ্ছেন? আমাদের সেই সেনাপ্রধান, আমাদের সেই প্রেসিডেন্ট—অনেক আশা করে যাঁদের বানিয়েছিলেন, তাঁরা আজ কী দিয়েছেন?” রাজনীতিতে যে আবেগের কোনো স্থান নেই, সেই সত্যটি মনে করিয়ে দিয়ে তিনি শেখ হাসিনাকে এক প্রকার রাজনৈতিক বাস্তবতার পাঠ দেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেখানে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিদের খেলা চলছে, সেখানে আবেগ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা মস্ত বড় ভুল ছিল।
আওয়ামী লীগের অন্দরমহলের খবর যাঁরা রাখেন, তাঁরা ভালো করেই জানেন যে শেখ হাসিনার সামনে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন তোলা বা তাঁর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা এক সময় কল্পনাতীত ছিল। অথচ ওবায়দুল কাদের যখন তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে জনসমক্ষে প্রশ্ন তুললেন, তখন চরম অপ্রীতিকর এই পরিস্থিতিতেও শেখ হাসিনা কোনো পাল্টা জবাব দেননি। অন্যদিনের মতো দীর্ঘ ভাষণ না দিয়ে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও তাড়াহুড়ো করে বক্তব্য শেষ করে তিনি সভাটি সমাপ্ত করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে এমন প্রকাশ্য তোপ ও ধাক্কা খোদ শেখ হাসিনার জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এবং স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো ছিল।
আওয়ামী লীগের এই ক্ষোভের আগুন হঠাৎ করে জ্বলে ওঠেনি, এর পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের সেই নাটকীয় পটপরিবর্তন। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাত্র দেড় মাস আগে শেখ হাসিনা তাঁর আপন আত্মীয় জেনারেল ওয়াকার-উজ্জামানকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আন্দোলন যখন চূড়ান্ত রূপ নেয়, তখন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের প্রত্যাশা ছিল যে সেনাবাহিনী হয়তো বুলেটের জোরে শক্ত হাতে আন্দোলন দমন করে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী ক্ষমতা টিকিয়ে রাখবে। কিন্তু সেনাপ্রধান সেই আত্মঘাতী path বেছে নেননি। তিনি চাননি ছাত্র-জনতার রক্তের দাগ কোনোভাবেই সেনাবাহিনীর গায়ে লাগুক। ফলস্বরূপ, সেনাবাহিনী নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং একপর্যায়ে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে সেনাপ্রধানই সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মধ্যস্থতা করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে ভূমিকা রাখেন, যা দেশে একটি নতুন গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিশ্চিত করে। আর এই নিরপেক্ষ ভূমিকার কারণেই আওয়ামী লীগের চোখে বর্তমান সেনাপ্রধান এখন একজন ‘মির্জাফর’।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালে সম্পূর্ণ একক পছন্দে মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনকে দেশের রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিলেন স্বয়ং শেখ হাসিনা। কিন্তু ক্ষমতার চাকা ঘুরে যাওয়ার পর সেই রাষ্ট্রপতির সুরও রাতারাতি পাল্টে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে তিনি কিছুটা অন্তরীণ বা ঘরবন্দি অবস্থায় থাকলেও, বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ার পর তাঁকে প্রায়শই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশে হাসিমুখে দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, তিনি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে দেশের প্রকৃত ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বিগত শেখ হাসিনা সরকারকে ‘ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী’ আখ্যা দিয়েছেন এবং সবচেয়ে বড় আঘাতটি হেনেছেন সন্ত্রাস দমন আইনে আওয়ামী লীগকে চিরটারে নিষিদ্ধ করার অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করে।
রাষ্ট্রপতির এই নাটকীয় ভোলবদল ও সিদ্ধান্তগুলো কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না চরম বিপর্যয়ের মধ্যে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ফলে, ওবায়দুল কাদেরের এই প্রকাশ্য ক্ষোভ আসলে শুধু তাঁর একার ব্যক্তিগত বক্তব্য নয়; এটি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ভেতরে জমে থাকা এক তীব্র হতাশা ও দীর্ঘশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। ওবায়দুল কাদেরের এই নজিরবিহীন মন্তব্য শেখ হাসিনাকে আজ সেই कठिन বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল যে, ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর রাজনীতির আঙিনায় পরম বিশ্বস্ত লোকেরাও মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং সেখানে আসলেই কোনো আবেগের স্থান নেই।