• মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪০ পূর্বাহ্ন
Headline
সরকার প্রধান হিসেবে প্রত্যেকের প্রাপ্য অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব: প্রধানমন্ত্রী নারীস্বাস্থ্য রূপান্তরে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব ও উদ্ভাবনী অর্থায়নের আহ্বান জুবাইদা রহমানের অবৈধ অভিবাসন বন্ধে বাংলাদেশ-ইইউ একসঙ্গে কাজ করবে দেশের কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে ৩০৩ শিশু ৫ ধাপে হবে ইউপি নির্বাচন, ২১ জানুয়ারি শুরু বিএনপির নেতাকর্মীদের ফ্যাসিবাদী আচরণ না করার আহ্বান রিজভীর সারা দেশে ২ দিন এলপিজি বিক্রি বন্ধ ঘোষণা কমফোর্ট জোন: কারার ঐ লৌহকপাট… গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে কানাডার প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

খুচরা টাকা ব্যাংকে নেই, আছে দালালের কাছে

Reporter Name / ৭১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে প্রয়োজনীয় খুচরা টাকা ও কয়েন না মিললেও বিপুল পরিমাণের ভাঙতি এখন চলে গেছে সংঘবদ্ধ দালালচক্রের হাতে। ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহক কিংবা বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ব্যাংকে গিয়ে কোনো ভাঙতি টাকা বা কয়েন পাচ্ছেন না, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালের এই দালালরা চড়া সুদে ও কমিশনে খুচরা টাকা সরবরাহের রমরমা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় টাকা ও কয়েনের গায়ে স্পষ্ট বাক্যে সাধারণ মানুষের আইনি অধিকারের কথা লেখা থাকলেও, বাস্তবে এখন দালালদের চরম আধিপত্য চলছে। গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের চাহিদামাত্র নির্দিষ্ট কমিশন দেওয়া ছাড়া ভাঙতি পাওয়ার আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজশে চলা এই সিন্ডিকেটের নজিরবিহীন দুর্নীতির বিভিন্ন তথ্য ও কলরেকর্ড উন্মোচিত হওয়ার পর ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ এবং সাধারণ জনগণের ক্ষোভ এখন তুঙ্গে পৌঁছেছে।

অনুসন্ধান ও তথ্য বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে, রাজধানীর হাতিরঝিলের স্পিডবোট, ওয়াটার বাস, গুলশান ও ঢাকার বিভিন্ন রুটে চলা সার্কুলার বাস সার্ভিস, বড় বড় শপিংমল এবং খুচরা বাজারের মতো নিত্যদিনের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে ৫ টাকার নোট বা কয়েনের অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগটিকেই পুঁজি করে এক শ্রেণির দালাল গ্রাহকদের কাছে ২০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশ পর্যন্ত মোটা অঙ্কের কমিশন দাবি করছে। সম্প্রতি একটি বড় শপিংমল কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে মাত্র ৪৮ হাজার টাকার খুচরা কয়েন ও নোট সংগ্রহ করতে গিয়ে দালালদের হাতে ১১ হাজার ১০০ টাকারও বেশি কমিশন দিতে বাধ্য হয়েছে। যেখানে ১ টাকার ৬ হাজার কয়েন নিতে অতিরিক্ত ১,২০০ টাকা, ২ টাকার ৬ হাজার কয়েন নিতে ২,৪০০ টাকা এবং ৫ টাকার কয়েনের জন্য ৭,৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত চার্জ বা কমিশন গুনতে হয়েছে। প্রকাশ্যে চলা এই জালিয়াতি ব্যবসা সাধারণ ব্যবসায়ীদের খরচের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ও সরকারি ব্যাংকগুলোর শাখা পর্যায় পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ৫, ১০ ও ২০ টাকার মতো জরুরি নোটগুলোর চরম সংকট চলছে। ব্যাংকগুলোতে যা অল্প কিছু খুচরা টাকা অবশিষ্ট রয়েছে, তাও ছেঁড়াফাটা, মারাত্মক দুর্গন্ধযুক্ত এবং ব্যবহারের একেবারে অনুপযোগী। সরকারি জনতা ব্যাংকসহ পূবালী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, শাখা পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে নতুন কোনো খুচরা নোট সরবরাহ করা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিগত আড়াই বছরে ৫, ১০ ও ২০ টাকার নতুন নোট পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যাংকের ভল্টে আসেনি। কোনো কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা নিজের ব্যাংক শাখায় টাকা না পেয়ে পাশের অন্য ব্যাংক থেকে ব্যক্তিগত মাধ্যমে গ্রাহককে কিছুটা ভাংতি জোগাড় করে দেওয়ার মতো বিরল প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞ এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা এই নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে চরম ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞতা থাকলেও রাষ্ট্রীয় কারেন্সি বা কয়েন নিয়ে এমন প্রকাশ্য কমিশন বাণিজ্যের ঘটনা নজিরবিহীন। দালালরা ঘরে বসে তো আর নোট বা কয়েন ছাপাতে পারে না; ফলে এটা নিশ্চিত যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট ও বিতরণ শাখার অসাধু কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ সহায়তা ছাড়া বাইরে বাজারে এভাবে বস্তা বস্তা খুচরা টাকা আসা অসম্ভব। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে দালালের মাধ্যমে ২০ থেকে ৩২ শতাংশ বাড়তি খরচে টাকা কিনতে হলে তার পরোক্ষ ক্ষতিকর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই গিয়ে পড়ে, কারণ ব্যবসায়ীরা তাঁদের পণ্যের মূল্যের সাথে এই অতিরিক্ত খরচ যোগ করতে বাধ্য হন। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ও সম্মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

সাধারণত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত টাকা ভল্টে রাখতে পারে না বলে তারা তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেয় এবং পুরানো, জীর্ণ বা ছেঁড়া নোট পুড়িয়ে নতুন নোট ইস্যু করা বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া। তবে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর নোটের নতুন নকশা প্রণয়ন ও ছাপাখানার ধীরগতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত নতুন টাকা বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে না। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভল্টে গচ্ছিত থাকা খুচরা টাকাগুলোর অর্ধেকের বেশিই বর্তমানে ব্যবহারের অযোগ্য। যা-ও বা সামান্য ভালো মানের টাকা থাকে, তা ব্যাংক কাউন্টারে না এসে সরাসরি অসাধু উপায়ে দালালের হাত ঘুরে কালোবাজারে চড়া কমিশনে বিক্রি হচ্ছে।

এই লাগামহীন পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েছেন দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। লাখ লাখ টাকা সরকারকে ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা করার পর অতি সাধারণ ভাঙতি টাকার জন্য যদি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ টাকা কমিশন হিসেবে দালালের পকেটে ঢালতে হয়, তবে বাণিজ্য পরিচালনা করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে উদ্যোক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সময়মতো ভাংতি না পেয়ে শপিংমল, গণপরিবহনসহ দৈনন্দিন খুচরা বাণিজ্যে গ্রাহকদের সাথে প্রতিনিয়ত ঝগড়া ও অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে, যা সার্বিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন যে এক, দুই ও পাঁচ টাকার ধাতব কয়েনের বাস্তবে কোনো আইনগত বা ভৌত সংকট নেই এবং তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুদ রয়েছে। যদি কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখা হয়, তবে তা অসাধু চক্রের কাজ। তারা আরও জানান, ১০ ও ২০ টাকার নতুন নোট ছাপানোর কাজ বর্তমানে দ্রুত গতিতে চলমান রয়েছে। তবে ব্যাংকিং খাতের ভেতর গড়ে ওঠা দালালচক্র এবং এই সিন্ডিকেটের পেছনে থাকা অসাধু কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে পুরো ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থ সঞ্চালন প্রক্রিয়া মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category