• মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ন
Headline
পর্তুগাল–স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র–বেলজিয়াম দ্বৈরথ: কার জয়রথ চলবে কোয়ার্টার ফাইনালে মেয়ের বিয়ে: আমিন চাচার আট পরামর্শ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল শুনানি মুলতবি প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ গুলশান লেকের পরিবেশ রক্ষা ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ : ডা. জুবাইদা রহমান অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্ততি ইসির ফিলিস্তিনকে সমর্থন করায় খামেনিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: হুথি মুখপাত্র গাজার শাসনভার ছাড়ার ঘোষণা হামাসের সংসদহীন ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর টিকে থাকার লড়াই

চট্টগ্রাম বন্দরে ঝুঁকিপূর্ণ আড়াইশ কন্টেইনার গায়েব

Reporter Name / ১ Time View
Update : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬

 দেশের অন্যতম প্রধান এবং সুরক্ষিত বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকৃত পণ্যবাহী কন্টেইনার গায়েব হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অত্যন্ত কঠোর এবং কড়া নিরাপত্তা বলয় থাকা সত্ত্বেও কাস্টমসের চিহ্নিত করা অন্তত ২৫০টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং পণ্যবোঝাই কন্টেইনারের কোনো ভৌত বা শারীরিক অবস্থান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই বিপুল সংখ্যক কন্টেইনার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় একদিকে যেমন কাস্টমসের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি ও চোরাচালানসংক্রান্ত বড় তদন্তগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে বন্দরের অভ্যন্তরীণ ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং পণ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা ও বড় ধরনের জালিয়াতির চিত্র সামনে এসেছে। কাস্টমসের অডিট, ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (এআইআর) বিভাগের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বন্দর কর্তৃপক্ষের সঠিক সহযোগিতা না পাওয়ায় এই কন্টেইনারগুলো বন্দর থেকে অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলা বা গায়েব করে দেওয়ার তীব্র সম্ভাবনা রয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র এবং এআইআর বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চোরাচালান, পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা এবং শুল্ক ফাঁকির সুনির্দিষ্ট সন্দেহের ভিত্তিতে কাস্টমসের বিশেষ ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ (ASYCUDA World) রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে লক বা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল এই ২৫০টি কন্টেইনার। নিয়ম অনুযায়ী, কাস্টমসের বিশেষ তদন্তকারী দল সশরীরে উপস্থিত হয়ে শতভাগ কায়িক পরীক্ষা বা ভৌত তল্লাশি সম্পন্ন না করা পর্যন্ত এই কন্টেইনারগুলো বন্দর থেকে খালাস বা অবমুক্ত করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু গত ৯ মাস ধরে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বারবার কন্টেইনারগুলোর সঠিক অবস্থান জানতে চেয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে (সিপিএ) একের পর এক চিঠি দিলেও বন্দর কোনো সদুত্তর বা সঠিক অবস্থান জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বশেষ গত এপ্রিল মাসেও এআইআর বিভাগ থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষকে চূড়ান্ত তাগিদপত্র বা রিমাইন্ডার পাঠানো হয়েছিল, যার কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব মেলেনি। এই নিখোঁজ কন্টেইনারগুলোর তালিকায় ২০২১ সালের ৮৩টি, ২০২২ সালের ৬১টি, ২০২৩ সালের ৪০টি এবং ২০২৪ সালের ৬৬টি কন্টেইনার রয়েছে, যা দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ থাকায় কাস্টমসের রাজস্ব সুরক্ষার পুরো আইনি প্রক্রিয়া এখন বড় ধরনের অন্ধকারের মুখে পড়েছে।

বন্দরের এই রহস্যময় পরিস্থিতির মধ্যেই গত এক বছরের মধ্যে কাপড় বোঝাই আরও অন্তত ৩টি বড় কন্টেইনার সরাসরি বন্দর থেকে উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা তদন্তকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে একটি অত্যন্ত আলোচিত ঘটনা ঘটেছে ব্যবসায়ী সেলিম রেজার সাথে, যিনি ‘শাহ আমানত ট্রেডিং’-এর স্বত্বাধিকারী। তিনি কাস্টমসের একটি অফিশিয়াল ইলেকট্রনিক নিলাম বা ই-অকশনের মাধ্যমে প্রায় ২৭ টন ওজনের আমদানিকৃত সুতা বা ইন্ডিগো ফেব্রিক্সের একটি কন্টেইনার কিনেছিলেন। এজন্য তিনি নিলাম মূল্য বাবদ ৮৫ লাখ টাকা এবং ভ্যাট, অগ্রিম আয়করসহ অন্যান্য সরকারি চার্জ মিলিয়ে সর্বমোট ১ কোটি ৬ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেন। নিলামে অংশ নেওয়ার আগে তিনি নিজে কন্টেইনারটি বন্দরে সশরীরে পরিদর্শনও করেছিলেন। কিন্তু সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ও অর্থ পরিশোধ শেষে যখন তিনি গত ২০২৫ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি কন্টেইনারটি খালাস করতে বন্দরে যান, তখন গিয়ে জানতে পারেন সেটি তার নির্ধারিত স্থান থেকে সম্পূর্ণ গায়েব হয়ে গেছে। এই ঘটনার চার মাস পর, ২০২৫ সালের ২রা জুলাই এক চিঠির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে, তাদের গঠিত যৌথ তদন্ত কমিটি পুরো বন্দর এলাকা তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেই কন্টেইনারটির কোনো সন্ধান পায়নি এবং ফলশ্রুতিতে তারা সফল নিলাম ক্রেতাকে পণ্যটি বুঝিয়ে দিতে সম্পূর্ণ অক্ষম।

কন্টেইনার চুরির এই ধারায় বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে আরও দুটি কন্টেইনার উধাও হওয়ার ঘটনায় পৃথক দুটি ফৌজদারি বা অপরাধমূলক মামলা দায়ের করতে বাধ্য হয়েছে। বন্দর থানা পুলিশ পরবর্তীতে হালিশহর এলাকা থেকে একটি সম্পূর্ণ খালি কন্টেইনার উদ্ধার করে। তদন্তে জানা যায়, জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি সিল, ভুয়া স্বাক্ষর এবং জাল গেট পাস বা খালাসের নথিপত্র ব্যবহার করে কন্টেইনারটি বন্দর থেকে অনায়াসে বের করে নেওয়া হয়েছিল, যার ভেতরে থাকা প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের আমদানিকৃত ফেব্রিক্স বা কাপড় বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এই জালিয়াতি চক্রের সাথে জড়িত থাকার অপরাধে পুলিশ বন্দরের নিজস্ব দুই কর্মচারীসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে এবং বাকি আসামিরা পলাতক রয়েছে। এর বাইরে চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা মূল্যের ফেব্রিক্স বোঝাই আরও একটি কন্টেইনার একইভাবে বন্দর থেকে উধাও হয়ে যায়, যার কোনো হদিস বা কূলকিনারা এখন পর্যন্ত করা সম্ভব হয়নি।

এই ধারাবাহিক কন্টেইনার উধাও এবং নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা চট্টগ্রাম বন্দরের বহুল প্রচারিত ডিজিটাল এবং কাগজবিহীন (পেপারলেস) মালপত্র ব্যবস্থাপনা সিস্টেমকে সরাসরি বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা কন্টেইনারের সন্ধানে নেমে দেখতে পান, একটি কন্টেইনার বাস্তব ক্ষেত্র থেকে গায়েব হয়ে যাওয়ার পরও বন্দরের ওড়াকল-ভিত্তিক (Oracle-based) কার্গো ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে সেটি সিসিটি ইয়ার্ডের ভেতরে সংরক্ষিত আছে বলে দেখাচ্ছিল। অথচ বাস্তবে সেই ইয়ার্ডে কন্টেইনারটির কোনো ভৌত অস্তিত্বই ছিল না এবং বন্দরের মূল টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের রেকর্ডেও এর কোনো সদৃশ মিল পাওয়া যায়নি। এই ধরনের প্রযুক্তিগত অসঙ্গতি ও ডিজিটাল রেকর্ডের কারচুপি দেখে কাস্টমস কর্মকর্তারা বন্দরের ডিজিটালাইজেশন বা অটোমেশনের কার্যকারিতা নিয়েই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বন্দরের ইয়ার্ড ও ওয়্যারহাউজগুলো দিন দিন বিভিন্ন দূরবর্তী স্থানে সম্প্রসারিত হওয়ায় পণ্যবাহী কন্টেইনারের চলাচলের ওপর নজরদারি করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে এবং পুরো সিস্টেমের ভেতরে সুনির্দিষ্ট কোনো বড় লুপহোল বা ফাঁকফোকর তৈরি হয়েছে, যার সুযোগ নিয়ে কন্টেইনারগুলো উধাও হচ্ছে। বিশেষ করে এলসিএল বা আংশিক কন্টেইনার লোড হ্যান্ডলিং করা ওয়্যারহাউজগুলোর ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল যে, সেখানে মাঝেমধ্যে এক আমদানিকারকের পণ্য অন্য আমদানিকারক অনায়াসে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।

সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের বিষয় হলো, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ সুরক্ষিত এবং সিসিটিভি ক্যামেরায় মোড়ানো একটি সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় কেপিআই (KPI) এলাকা থেকে কীভাবে আস্ত পণ্যবোঝাই কন্টেইনার অনায়াসে বাইরে চলে যাচ্ছে। সাধারণ কাস্টমস এজেন্ট এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের তথ্য অনুযায়ী, বন্দর থেকে একটি সম্পূর্ণ কন্টেইনার লোড (FCL) খালাস করে মূল গেট দিয়ে বের করতে হলে ওয়ান স্টপ সার্ভিস, টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ, নির্দিষ্ট ইয়ার্ড কর্মকর্তা, ডেলিভারি স্টাফ এবং কাস্টমসের গেট সিকিউরিটিসহ বিভিন্ন স্তরের ও দপ্তরের অন্তত ২৪টি আলাদা স্বাক্ষর এবং অফিশিয়াল অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এতগুলো কঠোর ধাপ এবং কঠোর নজরদারি পেরিয়ে একটি কন্টেইনার বের হওয়া তখনই সম্ভব, যখন এর পেছনে জাল স্বাক্ষর, ভুয়া সিল এবং ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশন বা কাগজের নথিপত্র যাচাইয়ের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ভেতরের কোনো শক্তিশালী চক্র কাজ করে। বছরের পর বছর ধরে বন্দরের আধুনিকায়নের দাবি করা হলেও এখনো অনেক ক্ষেত্রে সনাতনী বা ম্যানুয়াল নথিপত্র যাচাইয়ের ওপর নির্ভরশীলতা এই চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির মূল কারণ বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

এই সামগ্রিক জালিয়াতি এবং পণ্য চুরির ঘটনায় এখন বন্দরের আইনি দায়বদ্ধতার বিষয়টিও বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দেশের ‘কাস্টমস অ্যাক্ট ২০২৩’-এর ধারা ৮ এবং ১৩০ অনুযায়ী, বন্দরে আমদানিকৃত এবং সংরক্ষিত সমস্ত কার্গো বা কন্টেইনারের একমাত্র আইনি কাস্টডিয়ান বা বৈধ অভিভাবক হলো চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)। যতক্ষণ না পর্যন্ত পণ্যটি বৈধ উপায়ে প্রকৃত আমদানিকারকের হাতে হস্তান্তর করা হচ্ছে, ততক্ষণ এর সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দায়িত্ব আইনিভাবে বন্দরের ওপর বর্তায়। এই আইনি বিধানের ওপর ভিত্তি করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। নিলামে বিক্রি হওয়া কিন্তু পরবর্তীতে নিখোঁজ হওয়া কন্টেইনারটির জন্য ব্যবসায়ী সেলিম রেজার পরিশোধ করা ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ মোট ১ কোটি ৬ লাখ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে ফেরত দেওয়ার জন্য বন্দরকে চাপ দেওয়া হচ্ছে, কারণ আমদানিকারক বা ক্রেতা সরকারের সমস্ত পাওনা পরিশোধ করার পরও পণ্য পাননি।

এত বড় একটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি ঘটার পরও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। কাস্টমসের একাধিক চিঠি এবং গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে বারবার যোগাযোগ করা সত্ত্বেও বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব নাসির উদ্দিন কিংবা চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য বা ব্যাখ্যা প্রদান করেননি। দিনশেষে, এই আড়াইশ নিখোঁজ কন্টেইনার এবং কোটি টাকার পণ্য চুরির রহস্য দেশের অর্থনীতি ও বন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য এক বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার মূল শিকড় উপড়ে না ফেললে দেশের সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য বড় ধরনের আস্থার সংকটে পড়বে।

তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category