-রিন্টু আনোয়ার
বাংলাদেশে ১৯৮১-২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মোট ৪ জন সংসদ সদস্য খুন হন।। এই চার জনের মধ্যে প্রথম দুজন আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকতে এবং পরের দুজন সরকারে থাকা অবস্থায় খুন হয়েছেন। ২০০৪ সালে গাজীপুরে আহসান উল্লাহ মাস্টার, ২০০৫ সালে হবিগঞ্জে শাহ এম এম এস কিবরিয়া, ২০১৬ সালে মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন গাইবান্ধায় নিজ বাড়িতে খুন হন। সবশেষ ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার খুন হলেন ভারতের কলকাতায়।
ভারতে বাংলাদেশের এই সংসদ সদস্য হত্যার ঘটনায় এখনো দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করছেন। মরাদেহের সন্ধান ও হত্যার কারণ জানতে উভয় দেশের কর্মকর্তারা আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করেছেন। আসামিদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যে ভিত্তিতে নিহতের লাশ খুঁজে পেতে কয়েকদফা অনুসন্ধান করে সবশেষ কলকাতার যে অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার ‘খুন হয়েছেন’ বলা হচ্ছে, তার সেপটিক ট্যাংক থেকে কিছু মাংসের টুকরো উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তবে, প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের নাগরিক একজন এমপিকে ভারতে হত্যার ঘটনায় বিচার হবে কোন দেশে? কারণ হত্যা সংঘটনের স্থান ভারতের কলকাতায় হলেও এর পরিকল্পনা হয় বাংলাদেশে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ভুক্তভোগী, আসামি, ঘটনাস্থল এবং হত্যাকাণ্ডের মোটিভ বিবেচনায় দুই দেশেরই এই হত্যা মামলার বিচার করার এখতিয়ার রয়েছে।
এদিকে আনোয়ারুল আজীম আনারের মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হওয়ার কারণে ঝিনাইদহ-৪ আসন শূন্য ঘোষণা করতে পারছে না জাতীয় সংসদ সচিবালয়। যদিও হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশের দিনই (২২ মে) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কোনও কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত না করলে জাতীয় সংসদ আসন শূন্য ঘোষণা করতে পারবে না। কারণ আনোয়ারুল আজীম আনারের দেহ পাওয়া যায়নি। হত্যার মোটিভও বাংলাদেশ কিংবা ভারতীয় পুলিশ কেউই জানতে পারেনি। কোনও একটা নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে হত্যা নিশ্চিত না হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
বিদেশে বাংলাদেশের কোন মাননীয় সংসদ সদস্যের টুকরায় টুকরায় লাশ হয়ে হত্যার ঘটনা সম্ভবত এটাই প্রথম। সেটাও আবার বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশি নিরাপদ দেশ ভারতে!
এর আগে বিদেশি কারাগারে ঠাঁই হয় আমাদের আর এক মাননীয়র। তাও ইসলামি দুনিয়ার নামকরা দেশ কুয়েতে। নিজ দেশে মাননীয়দের কারো কারো সাবেক হওয়ার পর জেলে যাওয়া বড় ঘটনা নয়। বিদেশে কারাগারে ঠাঁই হওয়ার রেকর্ডটা হয়েছিল কুয়েতে বাংলাদেশের মাননীয় সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলকে দিয়ে। ঘটনা রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক কারণে নয়, মানব ও অর্থপাচার, ভিসা কায়কারবারসহ ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে। তাকে লাশ হতে হয়নি চলতি সংসদের মাননীয় আনোয়ারুল আজীম আনারের মতো।
ভিন্ন মতের রাজনীতিক-সাংবাদিকদের ধরে সীমান্তের ওপারে ফেলে আসার রেকর্ডটা পুরনো। রোপন করা গাছটির চারা বড় হয়ে এখন ফল ফলছে নিজের ঘরে। আগে থেকে ভাবলে হয় তো এই টাইপের মাননীয়রা সোনা চোরাচালান-মাদক বেচা-কেনা, হুন্ডি ব্যবসার মতো কাজে জড়িয়ে কলা গাছ হওয়ার আগে কিছুটা হলেও ভাবতেন। মাননীয় আনার কলকাতায় নিখোঁজ হবার ঘটনাটা শুরুতে দেশের গণমাধ্যমে গুরুত্ব পায়নি। টানা কয়েকদিন কোনো কোনো পত্রিকায় এটি প্রচার হয়েছে নেহায়েত নিখোঁজ সংবাদের মতো। তার মৃত্যু সংবাদ পাওয়ায় পাল্টে গেল দৃশ্যপটও। ব্রেকিং নিউজে তথ্যের কতো যে ধুম। কারা কতো দিন ধরে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে, কীভাবে খুন করেছে- আরও কত্তো প্রশ্ন। সঙ্গে অন্তহীন কথামালা। একজন টাটকা-তরতাজা মাননীয় পরম বন্ধু প্রতিবেশি দেশে গিয়ে টানা কয়েক দিন নিখোঁজ থাকলেন। দু’দেশের পুলিশ গোয়েন্দারা হদিসই বের করতে পারলো না! দেশটিতে নিযুক্ত আমাদের কূটনৈতিক মিশন কী করছিল-এমন প্রশ্নবান তো রয়েছেই।
কেবল মাননীয় নন, যে কারো মৃত্যু সংবাদ জানার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রথম কাজ হচ্ছে ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাইজউন পাঠ করা। ক্ষমা করে দেওয়াসহ তার প্রশংসা করা। তাকে ভালো বলা। বড় ভালো লোক ছিলেন বলে সমবেদনা জানানো। আর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলে বলা এবং বলানোর চেষ্টা চলে তাকে ‘বড় ক্লিনম্যান’ প্রচার করা। এমপি-মন্ত্রী হলে সংসদে শোক প্রস্তাব আনা। কিছুক্ষণ তার প্রশংসা গাওয়া। শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানানো। তাদের শোক সইবার ক্ষমতা দিতে আল্লাহর দরবারে দোয়া-খায়ের করা। এ শোক যেন শক্তিতে পরিণত হয় সেই কামনা করা। পরপারে তিনি যেন ভালো থাকেন সেই দোয়া করা। আলোচিত আনারের জন্যও তা করা হচ্ছে। তিনি এলাকায় ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন বলে হত্যার শিকার হয়েছেন মর্মে তার দল থেকে দাবি করা হয়েছে। এর বিপরীত চিত্র স্যোশাল মিডিয়ায়। ইন্নালিল্লাহর কাজটি মাশাল্লাহ-আলহামদুলিল্লায় চালানো হচ্ছে তালগোলে। স্যোশাল মিডিয়া মাড়িয়ে মূলধারার কোনো কোনো গণমাধ্যমে সমানে মাননীয় আনারের কাণ্ডকীর্তি প্রচার করছে। স্বর্ণের কারবার থেকে হুন্ডি কিছুই বাদ পড়ছে না। তার মতো ক্লিন ইমেজের আরও কতোজন মাননীয় আমাদের মহান জাতীয় সংসদে আছেন –সেই রসময় আলোচনা তো আছেই।
গত বছর কয়েক ধরে এই মাননীয়দের কারো কারো ক্লিন ক্রিয়াকর্ম রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ছে। চন্দ্রবিন্দু দিয়ে তাদের সম্বোধন করতে হয়। তারা মান্যবর। নামের পূর্বাপরে বলতে হয় মাননীয়-মহোদয়। এটা তাদের সাংবিধানিক প্রিভিলেজ। নিজ নিজ সীমানায় বা এলাকায় মহাশয় পর্যায়েও তাদের কেউ কেউ। জনগণ মনে মনে যাই ভাবুক, জনগণকে ঠিকই নানা উদামকাণ্ড মেনে নিতে বাধ্য করে ছাড়ছেন তারা। যেখানে যার মন যা চায় করছেন, বলছেন। এর মধ্য দিয়ে নিজেরা ফ্রিস্টাইলে উদাম বা দিগম্বর হচ্ছেন। আর সরকারকে ফেলছেন মোটা দাগের প্রশ্নের মুখে। জনগণকে তোয়াক্কা না করতে করতে এখন আর সরকারকেও তোয়াক্কার দরকার মনে করে না তারা। যেন ধরেই নিয়েছেন, সরকার বা দলের শীর্ষ পর্যায় এখন আর তাদের কিছু করবে না বা করতে পারবে না। তারা দেশকে-সরকারকে পেয়ে বসেছেন।
সরকারকে সমানে ডোবানোর কাজে সাবরিনা, পাপিয়া, খালেদ, সাহেদ, শোভন-রাব্বানীরা যারপরনাই অবদান রেখেছেন। আনিসুর রহমান, মমিনুল হক সাঈদ, মোল্লা কাউছাররাও কম করেননি। তাদের বাইরে সাংবিধানিক মাননীয় চট্টগ্রামের শামসুল হক চৌধুরী, সুনামগঞ্জের মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, ভোলার নুরুন্নবী শাওন, নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজারের নজরুল ইসলাম বাবুসহ কয়েকজন। ডা. দীপু মনি, জাহিদ মালেকও বাদ পড়েননি। প্রকল্প পাসের আগেই সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড-ইডিসিএল কারখানার জন্য ৩১ একর জমি অধিগ্রহণ নিয়ে সদ্য সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তার আত্মীয়স্বজনদের কাণ্ডকীর্তি এখনও বাসী বা তামাদি হয়ে যায়নি। ওই জমি অন্যের নামে হস্তান্তর ও মূল্যবৃদ্ধির কার্যক্রমে লিপ্ত হওয়ার খবর ফাঁস হয় নিজেদের মধ্যে ভেজাল হওয়ার কারণে। চাঁদপুরে নদী দখল এবং চড়া দামে বিকিকিনিতে সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর জড়িত থাকার খবর ফাঁসের নেপথ্যও অনেকটা তেমনই। তার ভাই জেলা আওয়ামী লীগ নেতা জাওয়াদুর রহিম টিপুসহ বেশ কয়েক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ভুয়া দলিলের মাধ্যমে ৪৮ একরের বেশি খাসজমি দখলের খবর সরকারকে সামলে দিতে হয়েছে।
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, দলের কর্মীদের ওপরই মামলা-হামলা, নানা দুর্নীতিতে সম্পৃক্ততা, বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক, মাদক কারবার, নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা অভিযোগও আছে তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে। জলমহাল, সরকারি খাস পুকুর, বাড়িঘর দখল, টেন্ডারবাজি তো মামুলি। এ ধরনের কিছু মহাশয়ের বিরুদ্ধে আরো আগেই তৃণমূল থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করে রাখা হয়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতির কাছে। ব্যবস্থা নেওয়া ছিল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু রাজনৈতিক ডামাডোলের কারণে তা ঝুলে যায়। অভিযুক্তদের জন্য এটি আশীর্বাদের। এ ফাঁকে নাতনীর বয়সী কলেজ ছাত্রী নাদিয়াকে বিয়ে করে ভাইরাল হয়েছেন এক মাননীয়। পরিচয় গোপন রেখে দোসরা বিয়ে করে জেলহাজত খেটে মুখ দেখাতে সমস্যা হচ্ছে না পাবনার মাননীয় খন্দকার আজিজুল হক আরজুর। মাননীয় সংসদ সদস্যরা ‘ফ্রি স্টাইলে’ ঋণখেলাপি হচ্ছে। নয়-ছয় করে, ঘুষ-দুর্নীতি করে টাকা আয় করছে। সে টাকা নিয়ে বিদেশে পাচার করেছে।
বর্তমানে নির্বাচিত ৮০ ভাগ এমপিই চোরাকারবারে জড়িত বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া। তিনি বলেন,স্মাগলার চোরাকারবারি, সন্ত্রাসী বা মাদক পাচারকারীর সংসদ সদস্য কোনো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন দলে থাকার কথা নয়। রাজনীতি যেখানে যাওয়ার চলে গেছে, বাকি তো কিছু নেই আর। যেভাবে ভোট হচ্ছে, ভোটটাকেও দিলো শেষ করে। সবাই চান নিজেরটা। কিন্তু দেশের কী হবে কেউ চিন্তা করে না। চিন্তা করে, আমার কী হবে, আমি কত টাকা বানাতে পারলাম, হাজার কোটি টাকা… এসব।
চোরাকারবারি কেন এমপি হবেন? এমপি হবেন তারা, যাদের সংসদ, আইন এসব সম্পর্কে জানেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সংসদে চোরাকারবারি আছেন, ব্যবসায়ী আছেন। প্রশ্ন হলো, তারা আইন প্রণেতা হন কীভাবে, আইন প্রণয়ন করবেনইবা কীভাবে?
এসবের কোন জবাব নাই।
রাজনীতি নষ্ট হয়ে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধও। এগুলোর অনুপস্থিতি যতটা প্রকট হচ্ছে, আনারের মতো চিহ্নিত চোরাকারবারিরা এমপি হওয়ার সুযোগ পেয়ে বসছেন। এরকম বহু আনার এখনো আছে ক্ষমতার চারপাশে, দাবি করেন অনেকে।
জনগণ তাদের কিছু বলে না, কেবল সয়ে যায়। অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সইতে সইতে এই জনগণও হয়ে উঠেছে আস্ত মহাশয়। না হয়েই বা উপায় কি? তাঁদের হাতে ক্ষমতা আছে, ক্ষমতার দাপট আছে, সেই দাপট দেখানোর হাজার কলাকৌশল যন্ত্রপাতিও আছে তাদের!
লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintu108@gmail.com