• সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০২ অপরাহ্ন
Headline
রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনে সব ধরনের সহযোগিতা দেবে বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন রাষ্ট্রপতি বৈধভাবে বছরে ১০ হাজার শ্রমিক ইতালিতে যাওয়ার সুযোগ আছে : মীর শাহে আলম উপজেলা নির্বাচনে পোস্টার-মিছিল নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় নম্বর প্লেট ও কিউআর কোড আনার পরিকল্পনা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও চার জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি হাজারের বেশি অর্থনীতির ভিত্তি গড়েছিলেন সাইফুর রহমান: রিজভী জামায়াত আমিরের হায়াতে তাইয়েবা, সবরে জামিল আতা ফরমান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নারের’ নাম পরিবর্তনের দাবি এমপি মারদিয়ার পাটওয়ারীর পর এবার আসিফ মাহমুদের ভোটার এলাকা পরিবর্তন

জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় নিয়ে বিরোধ: সরকার-বিরোধী দল উত্তেজনা বাড়ছে

Reporter Name / ০ Time View
Update : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকট ও সংস্কারের রূপরেখা বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে সরকার এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যকার টানাপোড়েন আবার প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে| একদিকে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দাবি করছে, অতীত স্বৈরশাসন ও অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত ভঙ্গুর পরিস্থিতি তারা ধৈর্যের সঙ্গে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে; তবে এই সুযোগ নিয়ে কেউ যেন দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছে প্রশাসন| অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে থাকা ১১ দলীয় বিরোধী জোট অভিযোগ তুলছে, ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ছয় মাস বা ১৮০ দিন পার হলেও সরকার জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ঐতিহাসিক সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে ইচ্ছাকৃত কালক্ষেপণ করছে এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে| দুই শিবিরের এই বিপরীতমুখী অবস্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে পুনরায় পাল্টাপাল্টি চাপ সৃষ্টি ও সংঘাতময় অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে|
উত্তেজনার সূত্রপাত আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে দল দুটির সাম্প্রতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে| বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় জানান, দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক খাত ও প্রশাসনিক জটিলতাগুলো রাতারাতি তৈরি হয়নি, বরং এগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দীর্ঘদিনের জঞ্জাল| সরকার এগুলো দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে| একই সঙ্গে তিনি নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের নিশ্চয়তা দিয়ে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে সতর্ক করেন, বাস্তব সমস্যাগুলোকে অজুহাত বানিয়ে কোনো রাজনৈতিক শক্তি যদি অরাজক পরিবেশ তৈরি করে, তবে আইন অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে| এর বিপরীতে বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, জনগণের ন্যায়সংগত ক্ষোভ ও বিরোধীদের নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচিকে ‘অস্থিতিশীলতা’ বা ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিত্রিত করে সরকার আসলে নিজেদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা আড়াল করার পুরনো কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে|
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান এই সংঘাতময় পরিস্থিতির গভীরে মূলত তিনটি জটিল প্রশ্নের বিরোধ জড়িয়ে রয়েছে| প্রথম প্রধান বিরোধের জায়গা হলো জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটে গৃহীত সাংবিধানিক সংস্কারের পূর্ণাঙ্গ রূপায়ন| ১১ দলীয় বিরোধী জোটের অন্যতম মূল দাবি হলো, সাংবিধানিক পরিবর্তনের পক্ষে জনগণ যে স্পষ্ট ম্যান্ডেট দিয়েছে, তার আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়নে সরকারকে সর্বোচ্চ আন্তরিক হতে হবে| দ্বিতীয় বড় সংঘাতময় ক্ষেত্রটি হলো দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়| ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কাঠামো নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ইতিমধ্যে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে| দলটির সাধারণ সম্পাদক মিয়া গোলাম পরওয়ারের মতে, সরকারের ঋণনির্ভর বাজেট, বড় ধরনের ঘাটতি এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের বারবার মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ নাগরিকের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে| তৃতীয় বড় মতপার্থক্যের কেন্দ্রবিন্দু হলো প্রশাসনিক ভারসাম্য ও নিরপেক্ষতা| বিরোধী জোটের অভিযোগ, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, যা মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে|
সংসদীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে বিরোধী শিবিরের এই তৎপরতা এখন রাজপথেও ছড়িয়ে পড়েছে| একাদশ জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে সরব থাকার পাশাপাশি রাজপথে লংমার্চ, গণসমাবেশ এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের দ্বৈত কৌশল গ্রহণ করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট| ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে, যেহেতু জাতীয় সংসদ কার্যকর রয়েছে, সেহেতু রাজপথে কঠোর আন্দোলনের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই| তবে বিরোধী জোটের দাবি, সংসদীয় বিতর্কের সমান্তরালে রাজপথে জনগণের মৌলিক দাবি নিয়ে কথা বলা যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অধিকার| ফলে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এখন বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে—কোন সীমারেখা পর্যন্ত এই আন্দোলনকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে দেখা হবে এবং কোথায় গিয়ে তা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হবে|
বিরোধী জোটের লংমার্চ ও আক্রমণাত্মক কর্মসূচির কড়া সমালোচনা করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি| দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী রাজধানীর নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিরোধী জোট সংসদের ভেতরে ইতিবাচক কোনো বিকল্প প্রস্তাবনা বা সংকট নিরসনের নীতিমালা না দিয়ে বাইরে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে| দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং সরকারের নানা ইতিবাচক অর্জনকে রাজনৈতিকভাবে ঢেকে দিতেই এই অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন| রুহুল কবির রিজভী আরও দাবি করেন, বিরোধী দলের কর্মসূচিতে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অশোভন ও মানহানিকর শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ফৌজদারি অপরাধের শামিল| এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সেটিকে রাজনৈতিক নিপীড়ন বলে প্রচার করা গণতন্ত্রকে বিপন্ন করার শামিল| একই সঙ্গে তিনি নিজ দলের নেতাকর্মীদের পরিবেশবান্ধব রাজনীতি চর্চার আহ্বান জানিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ব্যানার-ফেস্টুন দ্রুত অপসারণের নির্দেশ দেন|
আইন ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই বিরোধে উভয় পক্ষের ওপরই আস্থার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে| সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী মনে করেন, সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি শতভাগ পূরণ করতে পারছে না| সরকারের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের আত্মতুষ্টি বা নিয়ন্ত্রণমূলক মনোভাব তৈরি হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানির মতো মৌলিক নাগরিক সংকটের প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে| তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রূপরেখা বাস্তবায়নে সরকারের দিক থেকে যেমন দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই, তেমনি বিরোধী পক্ষও জনসম্পৃক্ত দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার আন্দোলন সফলভাবে গড়ে তুলতে পারছে না| রাজনৈতিক অস্থিরতার এই ফাঁক গলে কোনো সুযোগসন্ধানী বা ফ্যাসিবাদী পক্ষ যাতে নতুন করে অন্তর্ঘাত সৃষ্টির সুযোগ না পায়, সেজন্য উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি|
অন্যদিকে সরকারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও অবস্থান নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল জানান, সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় যুগের প্রশাসনিক অচলাবস্থা কাটানোর বড় চাপ রয়েছে এবং মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সব জঞ্জাল পুরোপুরি সাফ করা অসম্ভব| তিনি দাবি করেন, সরকার কোনো রাজনৈতিক সংঘাতে জড়াতে চায় না এবং সংসদকে প্রাণবন্ত রাখতেই বিশ্বাস করে| তবে বিরোধী দলের উচিত অরাজক পথ পরিহার করে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে তাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং বিকল্প সমাধানের পথ বাতলে দেওয়া|
সার্বিক পর্যালোচনায় স্পষ্ট যে, সরকারের সামনে এই মুহূর্তে বড় পরীক্ষা হলো অর্থনৈতিক গতি ফেরানো এবং জনগণের কষ্ট দূর করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা| প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বাস্তবতা স্বীকার করে ইতিমধ্যে নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, যা একটি ইতিবাচক দিক হলেও দ্রুত কার্যকর সমাধান না এলে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিরোধী আন্দোলনের শক্তিতে পরিণত হতে পারে| একইভাবে বিরোধী ১১ দলীয় জোটকেও প্রমাণ করতে হবে যে, তাদের রাজপথের চাপ নিছক ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং তা জনকল্যাণ ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের সত্যিকারের আন্দোলন| শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি পরিহার করে জুলাই সনদ, গণভোটের রায়, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো তৈরিতে দুই শিবিরের মধ্যে বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক সমঝোতা গড়ে না উঠলে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের চূড়ান্ত বোঝা বহন করতে হবে সাধারণ দেশবাসীকে|
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category