• বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৭ অপরাহ্ন

জ্বালানি নিরাপত্তায় দেশীয় কয়লার সন্ধানে সরকার

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের দিকে নতুন করে মনোনিবেশ করেছে সরকার। তবে সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্তের আভাস পেতেই চরম উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন এবং খনি অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলার সংকট ও বিশ্ববাজারে জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে দেশীয় কয়লাই হতে পারে এই সংকটের অন্যতম প্রধান সমাধান। বিপরীতে, পরিবেশবাদী ও স্থানীয়দের দাবি, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হলে বিপুলসংখ্যক মানুষ চিরতরে তাদের ভিটামাটি হারাবে এবং খনি অঞ্চলের শত শত বছরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও কৃষিব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যবহৃত মোট জ্বালানির প্রায় ৭০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থা এককভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হলেও গত এক দশকে স্থলভাগে গ্যাসের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশে নতুন করে বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার আশাও আপাতত ক্ষীণ। এই বাস্তবতায় গ্যাসের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকার কয়লা উত্তোলনের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব জানিয়েছেন, সরকার কয়লা তোলার বিষয়ে একটি নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছালেও মাঠপর্যায়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হয়নি। সম্প্রতি জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি পরিদর্শন করেছেন, যা খনি সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ারই একটি প্রাথমিক অংশ। তবে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি নতুন সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য। স্থানীয় প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছ থেকে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আগেই জমি কিনে মজুত করেছেন, যা তারা এখন সরকারের কাছে বহুগুণ বেশি দামে বিক্রি করার পাঁয়তারা করছেন।
পেট্রোবাংলার ২০২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে কয়লার মোট মজুতের পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৮২ বিলিয়ন মেট্রিক টন। দেশে আবিষ্কৃত পাঁচটি কয়লাখনি হলো দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী ও দীঘিপাড়া, রংপুরের খালাসপীর এবং জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলার সীমানায় অবস্থিত জামালগঞ্জ খনি। বিপুল এই মজুতের ঠিক কত শতাংশ বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য, সে বিষয়ে পেট্রোবাংলার কাছে সুনির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত কোনো তথ্য নেই। বর্তমানে দেশের একমাত্র সক্রিয় খনি বড়পুকুরিয়া থেকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে প্রতিদিন এক থেকে তিন হাজার টন কয়লা তোলা হচ্ছে, যা দিয়ে স্থানীয় ৫৩৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আংশিক চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। পর্যাপ্ত কয়লার অভাবে কেন্দ্রটির সবগুলো ইউনিট একসঙ্গে চালানো যায় না। তা ছাড়া, নতুন করে কয়লা উত্তোলন না করা হলে দেশে নতুন কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করাও কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হলো খনির বিশাল গভীরতা। হাইড্রোকার্বন ইউনিটের সমীক্ষা অনুযায়ী, বড়পুকুরিয়ার কয়লার স্তর রয়েছে ১১৮ থেকে ৫০৯ মিটার গভীরে। একইভাবে ফুলবাড়ীতে ১৫০ থেকে ২৭০ মিটার, খালাসপীরে ২৩৯ থেকে ৪৮৫ মিটার, দীঘিপাড়ায় ৩২০ থেকে ৫০৬ মিটার এবং জামালগঞ্জে সবচেয়ে গভীরে ৬৪০ থেকে ১ হাজার ১৫৮ মিটার নিচে কয়লার অবস্থান। এত গভীর থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে হলে বিস্তীর্ণ এলাকার জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এর ফলে ওই অঞ্চলের উর্বর ফসলি জমি চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাবে, যা সমগ্র উত্তরাঞ্চলের কৃষিব্যবস্থায় এক ভয়াবহ বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি ২০১৬ সাল থেকে বড়পুকুরিয়ার উত্তরে উন্মুক্ত খনি করার আলোচনা চললেও আজ পর্যন্ত এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমীক্ষাই শেষ করা সম্ভব হয়নি।
সরকারি পর্যায়ে কয়লা উত্তোলনের তৎপরতা সম্প্রতি আরও দৃশ্যমান হয়েছে জাতীয় সংসদে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বক্তব্যের মাধ্যমে। গত ২ সেপ্টেম্বর সংসদ সদস্য সাবিকুন নাহারের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানান যে, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণ ও মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ফুলবাড়ীর উচ্চমানের কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। তবে তিনি এও আশ্বস্ত করেন যে, এ ধরনের যেকোনো মেগা প্রকল্প গ্রহণের আগে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের যথাযথ ও মানবিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হবে। এর কয়েক দিন পর, ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই বড়পুকুরিয়ার দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সম্পূর্ণ নতুন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে বহুমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পনার তাগিদ দিয়ে বলেন, ২০৩০ সালের পর আমাদের গ্যাসের মজুত তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। জ্বালানি রূপান্তরের এই ক্রান্তিকালে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পুরোপুরি প্রবেশের আগে মধ্যবর্তী ২০ বছরের জন্য আমরা কয়লার ওপর নির্ভর করতে পারি। তবে এর জন্য সবার আগে একটি আন্তর্জাতিক মানের গ্রহণযোগ্য সমীক্ষা প্রয়োজন, যেখানে খনি থেকে প্রাপ্ত কয়লার অর্থনৈতিক মূল্যের সঙ্গে ওই এলাকার ভবিষ্যৎ কৃষিপণ্যের মূল্যের একটি বৈজ্ঞানিক তুলনা থাকবে। সবচেয়ে জরুরি হলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত গ্রহণ করা। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কায় এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, উত্তরবঙ্গ হলো বাংলাদেশের প্রধান শস্যভান্ডার। সারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার একটি বড় অংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। জ্বালানির খোঁজে এই শস্যভান্ডার ও পরিবেশকে জলাঞ্জলি দেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। তাঁর আশঙ্কা, নাম ও খোলস পরিবর্তন করে এশিয়া এনার্জি বা জিএসএমের মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোই নিজেদের স্বার্থে নতুন করে এই উত্তোলনের ষড়যন্ত্র করছে।
কয়লা উত্তোলনের এই নতুন উদ্যোগ স্থানীয়দের মনে ফিরিয়ে এনেছে ২০০৬ সালের রক্তক্ষয়ী ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির দুঃসহ স্মৃতি। বিগত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ওই বছরের ২৬ আগস্ট এশিয়া এনার্জির প্রস্তাবিত কয়লা প্রকল্পের বিরুদ্ধে ফুলবাড়ীর সাধারণ মানুষ এক বিশাল প্রতিরোধ সমাবেশ গড়ে তুলেছিল। সেই সমাবেশে তৎকালীন বিডিআর গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন এবং দুই শতাধিক নিরীহ মানুষ গুরুতর আহত হন। এই বর্বরোচিত ঘটনার পর আন্দোলন দাবানলের মতো পার্শ্ববর্তী পার্বতীপুর, বিরামপুরসহ পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তীব্র জনরোষের মুখে ৩০ আগস্ট তৎকালীন সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ঐতিহাসিক ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’ স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। এই চুক্তির মূল শর্তগুলোর মধ্যে ছিল উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন নিষিদ্ধ করা, এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করেছিল এবং আওয়ামী লীগ বা অন্যান্য অন্তর্বর্তী সরকারও এই স্পর্শকাতর বিষয়ে আর হাত দেওয়ার সাহস দেখায়নি।
দীর্ঘ দুই দশক পর প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ফুলবাড়ীর সাধারণ মানুষ ও অ্যাক্টিভিস্টরা নতুন করে সংগঠিত হতে শুরু করেছেন। গত ৫ সেপ্টেম্বর তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি এবং স্থানীয় বাসিন্দারা ফুলবাড়ীতে এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ আয়োজন করে। সমাবেশ থেকে হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের যেকোনো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে আবারও বৃহত্তর গণআন্দোলনের আগুন জ্বলে উঠবে। তেল, গ্যাস রক্ষা কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল জানান, উন্মুক্ত খনি করতে হলে প্রায় ১৬ হাজার ৫৫৬ একর বা ৬৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা অধিগ্রহণ করতে হবে, যার ফলে অন্তত এক লাখ পরিবারকে তাদের ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ হতে হবে। আগামী অক্টোবর মাসে নতুন করে বৃহত্তর কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। একদিকে দেশের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে লাখো মানুষের জীবন, জীবিকা ও পরিবেশ রক্ষার অস্তিত্বের লড়াই—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে দেশের কয়লাখনি অঞ্চলগুলো আবারও এক চরম অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category