• রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৫ অপরাহ্ন
Headline
২০৩০ সালের মধ্যে ১০৬.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের নিখোঁজ শিশুর লাশ মিলল সীমান্তের ওপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন কতজন, তালিকায় যারা জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান জাতিসংঘে নতুন সরকারের বার্তা দেবেন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী কাল নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন সরকার স্টার্টআপ, উদ্যোক্তা তৈরি ও উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে : জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বাংলাদেশ সফরে আগ্রহী চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা: রাষ্ট্রদূত মাকসুদ কামাল-জাফর ইকবালসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মন্ত্রিসভায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অধ্যাদেশের সংশোধনী অনুমোদন

তারল্য ঘাটতি ও বাণিজ্য বৈষম্যের টেকসই সমাধান কোন পথে?

Reporter Name / ১ Time View
Update : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন ও আর্থিক কাঠামোর দিকে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে বর্তমানে এক অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক এবং একই সঙ্গে উদ্বেগজনক দ্বৈত বা বিপরীতমুখী চিত্র লক্ষ করা যায়। একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার সামগ্রিক রিজার্ভ বা মজুতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনীতিতে এক ধরনের সাময়িক স্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বা ডলারের খোলা বাজারে তারল্যের তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। সাধারণ অর্থনৈতিক নিয়মে রিজার্ভ বাড়লে বাজারে ডলারের সরবরাহ বা তারল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তার সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই বৈপরীত্য দেশের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ এবং বাজার বিশ্লেষকদের সামনে একটি বিশাল বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। রিজার্ভ এবং বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক অবস্থান উন্নত হওয়ার পরেও কেন দেশের অভ্যন্তরে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের তারল্য বা প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে কমছে, তা এখন আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের প্রকৃত বৈদেশিক আয় ও ব্যয়ের যে বিশাল ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে, সেটি নিয়েও অর্থনীতিতে গভীর শঙ্কা ও সংশয় তৈরি হয়েছে।
এই দ্বৈত অর্থনৈতিক চিত্রের প্রথম অংশটি বুঝতে হলে দেশের প্রচলিত মুদ্রা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুবিশাল সম্পদ কাঠামোর দিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নজর দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ছাব্বিশ সালের তেইশে জুলাই সমাপ্ত সপ্তাহের হিসাব ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইস্যু ডিপার্টমেন্ট বা মুদ্রা প্রচলন বিভাগের অধীনে দেশে প্রচলিত মোট কাগুজে নোটের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন লাখ পঁয়ষট্টি হাজার সাতশো উনিশ কোটি টাকা। অর্থনীতিতে এই বিপুল পরিমাণ নোটের প্রচলনকে অনেকেই সরাসরি সরকারের ঋণ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট সম্পদ হিসেবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে এক ধরনের হিসাবগত বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে থাকেন। কিন্তু প্রকৃত সামষ্টিক অর্থনৈতিক হিসাবরক্ষণ নীতি অনুযায়ী ইস্যু ডিপার্টমেন্ট এবং ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্টের হিসাব সম্পূর্ণ আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। প্রচলিত এই বিশাল অঙ্কের নোটের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদের সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী অংশটি হলো অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা, যার পরিমাণ প্রায় তিন লাখ পনেরো হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ। এই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুতে সংরক্ষিত হিসেবে আরো রয়েছে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও বুলিয়ন, রৌপ্য, বিভিন্ন মেয়াদের সরকারি সিকিউরিটিজ এবং নানাবিধ বাণিজ্যিক কাগজপত্র, যা অর্থনীতিতে প্রচলিত এই বিপুল মুদ্রার বিপরীতে একটি শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি বা গ্যারান্টি হিসেবে সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্টের হিসাব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সেখানে সরকারের দেনাদার ব্যালান্স বা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ আঠারো হাজার পঁচাত্তর কোটি টাকা। এই বিশাল পরিমাণ ঋণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্টের মোট সম্পদের প্রায় সাতাশ দশমিক সাত শতাংশ দখল করে আছে। উল্লেখ্য যে, এই ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্টের মোট সম্পদের পরিমাণ হলো চার লাখ ছাব্বিশ হাজার ছয়শো তেরো কোটি টাকা। এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যে বিপুল পরিমাণ আমানত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষিত রয়েছে, তার পরিমাণও নেহায়েত কম নয়। হিসাব অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় পঁচানব্বই হাজার পাঁচশো আটচল্লিশ কোটি টাকা। মুদ্রানীতি এবং আর্থিক খাতের এই বিশাল ও জটিল কাঠামোর মাঝেই মূলত লুকিয়ে আছে দেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ শক্তি এবং একই সঙ্গে কাঠামোগত দুর্বলতার নানা অজানা দিক।
এবার আসা যাক সেই মূল বৈপরীত্যের জায়গায়, যা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলেছে এবং সাধারণ ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন মাসের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার বিষয়ক এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবেদনে এই তারল্য সংকটের বৈপরীত্যের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, জুন মাসে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে গড়ে দৈনিক স্পট বৈদেশিক মুদ্রা বা সরাসরি ডলার লেনদেনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে মাত্র সাতাশ দশমিক আটচল্লিশ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অথচ এর ঠিক আগের মাস অর্থাৎ মে মাসেও এই স্পট লেনদেনের দৈনিক গড় পরিমাণ ছিল তেষট্টি দশমিক চৌদ্দ মিলিয়ন ডলার। শুধু দৈনিক গড় লেনদেনই নয়, মোট আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রেও স্পট লেনদেনের অংশীদারিত্ব মে মাসের সাতচল্লিশ দশমিক চল্লিশ শতাংশ থেকে ব্যাপকভাবে কমে গিয়ে জুন মাসে ছত্রিশ দশমিক শূন্য তিন শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই তাদের প্রতিবেদনে এই অস্বাভাবিক পতনকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে তারল্য বা ডলার সরবরাহের ব্যাপক হ্রাসের একটি সুস্পষ্ট ও জোরালো ইঙ্গিত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
স্পট বা তাৎক্ষণিক ডলার লেনদেন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে আরেক ধরনের লেনদেনের প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যাকে অর্থনৈতিক পরিভাষায় সোয়াপ লেনদেন বলা হয়। পরিসংখ্যান বলছে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে এই সোয়াপ লেনদেনের পরিমাণ একলাফে বেড়ে তেষট্টি দশমিক সাতানব্বই শতাংশে গিয়ে উন্নীত হয়েছে। এই ঘটনার পেছনের মূল কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই জুন মাসে খোলা বাজার থেকে ডলার কেনার পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। মে মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেখানে বাজার থেকে ছয়শো বিয়াল্লিশ মিলিয়ন ডলার কিনেছিল, সেখানে জুন মাসে তারা বাজার থেকে মাত্র একশো এগারো মিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে। অথচ সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন বা আকু পেমেন্টের মতো বড় অঙ্কের বৈদেশিক দায় মেটানোর পরেও দেশের গ্রস বা মোট রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় তিন দশমিক শূন্য চার বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, সহজ কথায় বলতে গেলে, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি, রেমিট্যান্স বা অন্যান্য আর্থিক মাধ্যমে রিজার্ভের অঙ্ক খাতাপত্রে বাড়লেও, বাজারের দৈনন্দিন স্পট ডলার ট্রেডিং বা দৈনন্দিন ডলারের তারল্য মারাত্মকভাবে কমে গেছে, যা সাধারণ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের জন্য দৈনন্দিন ডলার প্রাপ্তিকে আরো অনেক বেশি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের মৌলিক চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে যে জায়গাটিতে সবচেয়ে বড় ও গভীর সতর্কতার প্রয়োজন, সেটি হলো দেশের ক্রমবর্ধমান ও আকাশচুম্বী বাণিজ্য ঘাটতি। আমদানি ও রপ্তানির মধ্যকার এই বিস্তর ব্যবধান দেশের অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত নিয়ে এসেছে। ছাব্বিশ অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি পূর্বের অর্থবছর পঁচিশের কুড়ি দশমিক চার বিলিয়ন ডলার থেকে একলাফে বৃদ্ধি পেয়ে সাতাশ দশমিক তিন বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। বাণিজ্য ঘাটতির এই বিপুল উল্লম্ফন প্রমাণ করে যে, বিশ্ববাজারে আমরা যে পরিমাণ পণ্য বা সেবা বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছি, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ আমাদের বিদেশি পণ্য ক্রয়ের পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। বাণিজ্য ঘাটতির এই বিশাল ফাঁক পূরণ করতে গিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি প্রতিনিয়ত এক প্রবল চাপের মুখে পড়ছে এবং ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে।
বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি চলতি হিসাবের ঘাটতি বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিটও দেশের অর্থনীতির জন্য আরেকটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, চলতি হিসাবের ঘাটতি পূর্বের শূন্য দশমিক এক বিলিয়ন ডলার থেকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে এক দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। তবে এতসব নেতিবাচক অর্থনৈতিক খবরের মধ্যেও বৈদেশিক খাতের সামগ্রিক ব্যালান্স বা স্থিতিতে এক ধরনের কৃত্রিম স্বস্তি তৈরি হয়েছে মূলত আর্থিক হিসাব বা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের বড় ধরনের উদ্বৃত্তের কারণে। পরিসংখ্যান বলছে, এই আর্থিক হিসাবে প্রায় সাত দশমিক নয় বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে। এই বিপুল আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্তের কারণেই শত প্রতিকূলতা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাণিজ্য ঘাটতির পরেও দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক ব্যালান্স ছয় দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, চলতি হিসাবের প্রকৃত ঘাটতি মেটাতে আর্থিক হিসাবের ওপর এই অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে কখনোই একটি সুস্থ ও টেকসই অর্থনীতির লক্ষণ হতে পারে না।
বাণিজ্য ঘাটতি চরম আকার ধারণ করার পেছনের সবচেয়ে বড় কারণ হলো দেশের রপ্তানি আয়ের চরম দুর্বলতা এবং এর ধারাবাহিক পতন। ছাব্বিশ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়ের রপ্তানি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক এক দশমিক সাত শতাংশে নেমে গেছে। অর্থাৎ, রপ্তানি আয় বাড়ার পরিবর্তে উল্টো কমে গেছে। এই ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক বা আরএমজি খাতের চরম দুর্বলতা। বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা হ্রাস, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার কারণেই মূলত রপ্তানি আয়ের এই করুণ দশা তৈরি হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার স্বাভাবিক সরবরাহকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
রপ্তানি আয় যখন নিম্নমুখী, ঠিক তখনই দেশের আমদানি ব্যয় বা আমদানির অব্যাহত চাপ অর্থনীতির ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, রপ্তানির ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির বিপরীতে দেশের আমদানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে পাঁচ দশমিক নয় শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই আমদানি বৃদ্ধির পেছনে বিলাসবহুল পণ্যের চেয়ে দেশের জন্য অপরিহার্য পণ্যের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। দেশের শিল্পকারখানা ও কৃষিখাত সচল রাখতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতিনিয়ত উচ্চমূল্যে জ্বালানি তেল, কৃষিকাজের জন্য বিভিন্ন ধরনের সার এবং শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি বা ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি করতে হচ্ছে। এই পণ্যগুলো দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য এতটাই অপরিহার্য যে, শত ডলার সংকট থাকলেও এদের আমদানি কোনোভাবেই সম্পূর্ণ বন্ধ বা ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ফলে অপরিহার্য আমদানির এই অমোঘ চাপ বাণিজ্য ঘাটতিকে আরো বেশি প্রসারিত করে তুলছে।
আমদানি ব্যয় এবং রপ্তানি আয়ের এই বিশাল ব্যবধান এবং বৈদেশিক খাতের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ত্রাতা বা রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। প্রবাসী শ্রমিকদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা এই অর্থই মূলত দেশের ডুবন্ত অর্থনীতিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছে। ছাব্বিশ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহে এক অভাবনীয় ও রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এই অর্থবছরে দেশে সর্বমোট পঁয়ত্রিশ দশমিক ঊনষাট বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় সতেরো দশমিক তিন শতাংশ বেশি। প্রবাসী আয়ের এই রেকর্ড পরিমাণ উল্লম্ফন না ঘটলে দেশের চলতি হিসাবের দুর্বলতা এবং বাণিজ্য ঘাটতির বিশাল গর্ত কোনোভাবেই শুধু আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব হতো না। রেমিট্যান্সই মূলত বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের এই প্রবল চাপকে সাময়িককালের জন্য হলেও কিছুটা প্রশমিত করে অর্থনীতিতে এক বিশাল মাত্রার স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের এই টানাপোড়েন এবং তারল্য সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বা ডলারের দামের ওপর। জুন মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতি ডলারের বিনিময় হার একশো বাইশ টাকা পঁচাত্তর পয়সা থেকে সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে একশো বাইশ টাকা পঁচাশি পয়সায় গিয়ে ঠেকেছে। তবে এটি কেবল আন্তঃব্যাংক বা কাগজ-কলমের আনুষ্ঠানিক হিসাব। বাস্তবে সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে যখন ডলার বিক্রি করা হয়েছে, তখন এর দাম বা বিনিময় হার ছিল আরো অনেক বেশি। গ্রাহক পর্যায়ে ডলার বিক্রির একটি মধ্যবর্তী মান বা মিডিয়ান রেট ছিল প্রায় একশো তেইশ টাকা দুই পয়সা এবং বাজারে ডলারের তীব্র সংকটের কারণে এই দর সর্বোচ্চ সীমা একশো তেইশ টাকা নয় পয়সা পর্যন্ত উঠেছিল। আন্তঃব্যাংক হার এবং গ্রাহক পর্যায়ের এই হারের ব্যবধানই প্রমাণ করে যে বাজারে ডলারের প্রকৃত সরবরাহ কতটা দুর্বল এবং সাধারণ আমদানিকারকদের ডলার সংগ্রহ করতে গিয়ে কতটা বেগ পোহাতে হচ্ছে।
বিনিময় হারের পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিযোগিতার সক্ষমতা মাপার আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার বা রিয়াল ইফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেট বা সংক্ষেপে রিয়ার। পরিসংখ্যান বলছে, জুন মাসে এই রিয়ার ইনডেক্স বা সূচক বৃদ্ধি পেয়ে একশো তিন দশমিক শূন্য একে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরওয়ারি বা ইয়ার-অন-ইয়ার হিসাব অনুযায়ী এই সূচকের মান প্রায় ছয় দশমিক একানব্বই শতাংশ বৃদ্ধি বা অ্যাপপ্রিসিয়েশন হয়েছে। অর্থনৈতিক সূত্র এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়ন অনুযায়ী, রিয়ার সূচকের মান একশো-এর ওপরে থাকার অর্থ হলো ইকুইলিব্রিয়াম এক্সচেঞ্জ রেট বা ভারসাম্যপূর্ণ বিনিময় হারের বিচারে দেশীয় মুদ্রা টাকার মান কিছুটা অতিমূল্যায়িত অবস্থায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখতে এবং অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখতে টাকার সামান্য বা নামমাত্র অবমূল্যায়ন বা ডেপ্রিসিয়েশনের একটি যৌক্তিক সুযোগ এখনো বাজারে রয়ে গেছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। মূলত রিয়ার হলো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কোনো দেশের মুদ্রার প্রকৃত অবস্থান মূল্যায়নের একটি আপেক্ষিক কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর সূচক।
সার্বিক এই দীর্ঘ এবং জটিল অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের পর দিনশেষে যে মূল ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়ায়, তা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ খাতাপত্রে ঠিক কত বিলিয়ন ডলার দেখানো হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হলো সেই রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রকৃত উৎসটি আসলে কতটা টেকসই ও নির্ভরযোগ্য। বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের বর্তমান চিত্রটিকে আমরা সুস্পষ্টভাবে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন স্তরে বা ভাগে বিভক্ত করে দেখতে পারি। প্রথমত, বিভিন্ন আর্থিক হিসাবের ওপর ভর করে দেশের মোট রিজার্ভের পরিমাণ খাতাপত্রে সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, রিজার্ভ বাড়লেও মাঠপর্যায়ে বা বাজারের দৈনন্দিন স্পট লেনদেনে ডলারের তারল্য বা স্বাভাবিক সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, দেশের প্রকৃত অর্থনীতির আয়না হিসেবে পরিচিত বাণিজ্য ঘাটতি সাতাশ দশমিক তিন বিলিয়ন ডলারের এক ভয়ংকর ও বিপজ্জনক সীমানায় পৌঁছে গেছে। এই তিনটি স্তরের বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে, দেশের বৈদেশিক খাতের বর্তমান স্থিতিশীলতা অত্যন্ত ভঙ্গুর একটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে দেশের বৈদেশিক খাতের প্রকৃত স্থায়িত্ব এবং সামষ্টিক অর্থনীতির টিকে থাকা নির্ভর করবে মূলত তিনটি প্রধান নিয়ামকের ওপর। প্রথমত, পোশাক খাতসহ সার্বিক রপ্তানি আয়কে যেকোনো মূল্যে ঋণাত্মক ধারা থেকে বের করে এনে শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের পথে নিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রবাসী আয়ের বা রেমিট্যান্সের এই বিশাল প্রবাহের ধারাবাহিকতা ভবিষ্যৎ বছরগুলোতেও জোরালোভাবে ধরে রাখতে হবে। সর্বোপরি, আর্থিক হিসাবের ওপর নির্ভর করে যে উদ্বৃত্ত তৈরি করা হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। অন্যথায়, শুধু সংখ্যার বিচারে রিজার্ভ বাড়লেও ডলারের এই অন্তর্নিহিত তারল্য সংকট দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে এক অমোচনীয় অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category