দেশের থানা ও আদালতের মালখানাগুলোতে চরম অব্যবস্থাপনা, জায়গার সংকট ও সঠিক তদারকির অভাবে সাড়ে ১৪ লাখেরও বেশি জব্দ আলামত বছরের পর বছর ধরে নষ্ট হচ্ছে। পুলিশের করা এক অনুসন্ধান প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে যে, দেশের ৯৬৭টি থানা ও আদালতের মালখানায় জব্দ থাকা এসব মালামালের মধ্যে তিন লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি আলামত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো সুরাহা ছাড়াই পড়ে রয়েছে। কেবল ছোটখাটো তথ্য-প্রমাণই নয়, রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে অবহেলায় ধ্বংস হচ্ছে প্রায় ৩৫ হাজার ৫৮৮টি জব্দ করা গাড়ি ও জলযান। এতে মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণিক দলিল যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি আলামত রাখার জায়গার অভাবে থানা ভবন ও আদালতের আশপাশের সাধারণ রাস্তাঘাটও এখন ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত হয়েছে।
উচ্চ আদালতে উপস্থাপিত পুলিশ সদর দপ্তরের এক নথিতে উঠে এসেছে যে, দেশে বর্তমানে থানার ৭৪০টি এবং আদালতের ২২৭টি মালখানার অর্ধেকেরও বেশি ব্যবহার অনুপযোগী এবং স্থান সংকটে জর্জরিত। দেশের ৭৪০টি থানার মধ্যে পর্যাপ্ত জায়গা ও ব্যবহার উপযোগী পরিবেশ রয়েছে মাত্র ৩০১টিতে, বাকিগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। একইভাবে ৪২টি আদালত ভবনে পর্যাপ্ত জায়গা থাকলেও প্রয়োজনীয় আইনি অনুমোদন ও বরাদ্দের অভাবে আধুনিক মালখানা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে থানাগুলোতে ছয় একরের জায়গায় মালখানা চললেও প্রয়োজন অন্তত ১৫ একর এবং ডাম্পিং শেডের জন্য প্রায় ১০২ একর জমির তীব্র অভাব রয়েছে। সুরক্ষামূলক শেড না থাকায় ১৮১টি থানা ও ১৫টি আদালতের ক্ষেত্রে জব্দ করা গাড়ি ও মালামাল খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
জব্দ মালামালের এমন পাহাড় জমার নেপথ্যে তদন্ত প্রতিবেদনে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবকে দায়ী করা হয়েছে। মামলার রায় ঘোষণার পরও আদালতের রায়ের অনুলিপি সময়মতো মালখানার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার কাছে না পৌঁছানোয় আলামত ফেরত দেওয়া, নিলাম করা বা ধ্বংস করার আইনি প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এছাড়া ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম, পর্যাপ্ত জনবল এবং ডিজিটাল ডাটাবেজের অনুপস্থিতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে বিচার শেষ হলেও মালখানার খাতায় তা নিয়মিত হালনাগাদ না করায় যুগের পর যুগ আলামত পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের করা একটি রিট পিটিশনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট এই দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা নিরসনে স্বরাষ্ট্র সচিবকে প্রধান করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের আদেশ দিয়েছেন। এই কমিটিতে পুলিশ, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ ব্যাংক, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ, এনবিআর এবং বিজিবির প্রতিনিধিদের যুক্ত করে আগামী দুই মাসের মধ্যে আলামত সুরক্ষায় আধুনিক রূপরেখা জমা দিতে বলা হয়েছে। একই সাথে ফৌজদারি কার্যবিধি মেনে অধস্তন আদালতগুলোকে অনতিবিলম্বে এসব মালামাল মূল মালিকদের কাছে হস্তান্তর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগের এই কঠোর তদারকি এবং প্রস্তাবিত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে দেশের থানা ও আদালতের মালখানার ওপর দীর্ঘদিনের চেপে থাকা এই জট এবং কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সম্পদের অপচয় বন্ধ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।