২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি বা সশরীরে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের ২১ জন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
দলীয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, দিল্লি ও কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের এই বৈঠকে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপস্থিত থাকার তালিকায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের মতো প্রভাবশালী নেতারা রয়েছেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দিল্লিতে এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ভারতে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। যদিও তিনি দাবি করেছেন আলোচনার জন্য কোনো পূর্বনির্ধারিত বা নির্দিষ্ট এজেন্ডা রাখা হয়নি, তবে দলটির আন্তর্জাতিক ও মাঠপর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যে উঠে আসছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ইঙ্গিত।
ইউরোপপ্রবাসী আওয়ামী লীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদক জানান, বৈঠকের মূল ফোকাস বা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থাকবে দলের বর্তমান সাংগঠনিক হালচাল এবং শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের রূপরেখা। তিনি বলেন, “ভারতে থাকা নেতাদের মূলত এ কারণেই ডাকা হয়েছে। সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং দেশে ফেরার ব্যাপারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সরাসরি তাঁদের মূল্যায়ন, মতামত ও পরামর্শ শুনবেন।” অন্যদিকে দলের আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে জানান, দলনেত্রী অনেককেই ডেকেছেন, তবে বিস্তারিত এখনো কিছু জানানো হয়নি।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দেশে ও বিদেশে দলটির নেতাকর্মী ও অঙ্গসংগঠনগুলোর একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে। গ্রেফতার আতঙ্ক এবং অনেক নেতাকর্মীর জামিনে মুক্তির খবরের মাঝে আত্মগোপনে থাকা অংশটি মূলত শেখ হাসিনার ফেরার নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে। ইতিমধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ বিভিন্ন ইউনিট কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি গঠনের কাজও শুরু হয়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকে রাজপথে সক্রিয় থাকা এবং মামলার শিকার হওয়া নেতাকর্মীদের নতুন কমিটিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, বাদ পড়ছেন নিষ্ক্রিয়রা।
দলটির একাধিক উচ্চপর্যায়ের নেতার ভাষ্যমতে, আগামী ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে কিংবা দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুর দিকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার একটি সম্ভাব্য সময়সীমা নির্ধারণ করে এগোচ্ছে দল। এই লক্ষ্যে ‘প্ল্যান এ’, ‘প্ল্যান বি’ এবং ‘প্ল্যান সি’—এই তিন ধরনের কৌশলপত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আকাশপথ অথবা স্থলপথ—কোন মাধ্যমে তিনি ফিরবেন, তা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করে চূড়ান্ত করা হবে।
যদি শেষ পর্যন্ত পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ফেরার সিদ্ধান্ত হয়, তবে আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা রয়েছে সারা দেশ থেকে লাখ লাখ নেতাকর্মীকে জড়ো করে একটি বিশাল ‘লং মার্চ টু টুঙ্গিপাড়া’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার।
দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান জানান, আকাশ ও সড়ক—উভয় পথেই প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, “এখানে বহু কৌশলগত বিষয় এবং বড় ধরনের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত রয়েছে।” টুঙ্গিপাড়ার প্রতি শেখ হাসিনার গভীর আবেগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সাবেক এই মন্ত্রী দাবি করেন, তিনি দেশে ফিরলে রাস্তায় নামতে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির প্রয়োজন হবে না; লাখ লাখ নেতাকর্মীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষও রাস্তায় নেমে আসবে।
তবে পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি স্পষ্ট করেন, নেত্রীর ফেরার পেছনে বহু ভূ-কৌশলগত ও নিরাপত্তা ইস্যু জড়িত থাকায় সব পরিকল্পনা এই মুহূর্তে প্রকাশ্যে আনা সম্ভব নয়। চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হলেই কেবল তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
দলীয় সূত্রগুলোর আরও দাবি, দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট যাত্রাপথ ও বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করতে আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে নয়াদিল্লিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে একটি সরাসরি সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন শেখ হাসিনা। এর বাইরে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং তাঁর ফেরার সফরে বিদেশি সাবেক কিছু কূটনীতিক সফরসঙ্গী হিসেবে থাকতে পারেন বলেও আলোচনা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থানরত হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর চৌধুরী জানান, প্রবাসে থাকা কয়েক হাজার নেতাকর্মী দলনেত্রীর সঙ্গে একযোগে দেশে ফেরার মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, “দেশে ফেরার আগে প্রবাসের অনেকেই হয়তো ভারতে সমবেত হবেন। চূড়ান্ত নির্দেশনার জন্যই এখন সবাই অপেক্ষা করছেন।”