• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৩ অপরাহ্ন

দীর্ঘ ১৭ বছরের সংগ্রাম শেষে প্রাপ্তির খাতা শূন্য: মূল্যায়নের অপেক্ষায় বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা

Reporter Name / ১ Time View
Update : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

দলের দীর্ঘদিনের দুর্দিনের পরীক্ষিত ও রাজপথের লড়াকু সৈনিকদের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিএনপি এবং এর সহযোগী অঙ্গসংগঠনগুলোর ভেতরে চরম অসন্তোষ, অভিমান ও হতাশা দানা বেঁধে উঠতে শুরু করেছে | গত প্রায় দেড় দশক ধরে চলা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে যারা নিজেদের জীবনযৌবন বাজি রেখে জেল-হুলিয়া, গুম-খুন ও পুলিশের শত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আজ ক্ষমতার পালাবদলের পর তাদের অনেকেই দলীয় পদ-পদবি ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী কাঠামো থেকে পুরোপুরি উপেক্ষিত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে | দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া এই তীব্র ক্ষোভের ফলে অনেক ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মী দলীয় কর্মসূচি ও সামাজিক যোগাযোগ থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিচ্ছেন, যা সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে |

দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে চলা সেই সংগ্রামমুখর দিনগুলোতে যখন প্রকাশ্যে রাজপথে দাঁড়ানো কিংবা দলীয় কার্যালয় খোলা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথ মাতিয়ে রেখেছিলেন বহু নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মী | তৎকালীন সময়ে জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে কিংবা বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যারা নিয়মিত প্রতিবাদী কর্মসূচি চালিয়ে গেছেন, শামসুজ্জামান দুদু কিংবা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের মতো সেই পরীক্ষিত কেন্দ্রীয় নেতারাও বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বা সংসদীয় কোনো বড় দায়িত্বে কাঙ্ক্ষিত স্থান পাননি | একইভাবে সাবেক ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব, যারা শত শত মিথ্যা মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে পরিবার-পরিজনছাড়া দুর্বিষহ দিন কাটিয়েছেন, তাদের অনেকেই আজ রাজনৈতিক ময়দান থেকে একপ্রকার ছিটকে পড়েছেন | এ ধরনের অবমূল্যায়নের ফলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মনে এই বার্তা পৌঁছাচ্ছে যে, বিপদের দিনে রাজপথের নেতৃত্ব দিলেও সুদিনের সুফল ভোগ করার বেলায় হাইব্রিড ও সুবিধাবাদীরাই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে |

কেন্দ্রীয় রাজনীতির এই রূঢ় বাস্তবতার রেশ কেবল রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা দেশের সুদূর প্রান্তিক জনপদ ও জেলা পর্যায়ের তৃণমূল রাজনীতিকেও গভীরভাবে গ্রাস করেছে | আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে যেসব অঞ্চলে বিএনপি বা এর অঙ্গসংগঠনগুলো টিকে থাকতে গিয়ে সীমাহীন নির্যাতন ও নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছিল, সেখানকার অবস্থা আরও বেশি করুণ ও শোচনীয় | উদাহরণস্বরূপ, গোপালগঞ্জের মতো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রতিকূল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এলাকায় হাতেগোনা যে কয়েকটি পরিবার ও সাহসী নেতাকর্মী সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে ধানের শীষের রাজনীতি টিকিয়ে রেখেছিল, আজ তারাও দলীয় ক্ষমতার সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন | স্থানীয় ত্যাগী নেতারা আক্ষেপ করে বলছেন যে, দুর্দিনের সেই কঠিন দিনগুলোতে যারা দলের পতাকা সমুন্নত রেখেছিলেন, আজ ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সেই পুরোনো ত্যাগীদের পেছনে ফেলে তথাকথিত সুবিধাবাদী ও নতুন সাজের বিএনপি নেতারা দৃশ্যপটে এসে সব সুবিধা কুক্ষিগত করে নিচ্ছেন |

তৃণমূলের ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সাধারণ কর্মী ও পদধারীদের অবস্থাও এর চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়, বরং তাদের ক্ষেত্রে বঞ্চনার মাত্রা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে | নওগাঁর বদলগাছীর মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে দলের আদর্শ ধরে রাখতে গিয়ে যাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, তারা বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের সম্পূর্ণ ভাগ্যহত মনে করছেন | বিগত দেড় দশক ধরে লাগাতার পুলিশি হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হওয়ার পরও যারা দলের সঙ্গে বিন্দুমাত্র বেঈমানি করেননি, আজ সেই তৃনমূলের কর্মীরাই হাইব্রিড ও লবিংবাজদের দৌরাত্ম্যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন | দলের এই সংকটময় সময়ে ত্যাগীদের বাদ দিয়ে সুবিধাবাদীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ার ফলে মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা ও অনীহা তৈরি হয়েছে, যা কোনোভাবেই একটি সুশৃঙ্খল ও গণমুখী রাজনৈতিক দলের জন্য ইতিবাচক লক্ষণ হতে পারে না |

অবশ্য দলের হাইকমান্ড ও দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় নেতারা এই সংকট ও হতাশার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করছেন না, তবে তারা পরিস্থিতিটিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন | বিএনপির নীতিনির্ধারক ও শুভানুধ্যায়ীরা মনে করেন যে, দীর্ঘ সতেরো বছরের জঞ্জাল ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস করে দেওয়ার যে পাহাড়সমান সমস্যা বর্তমান সরকারের কাঁধে এসে বর্তেছে, তা রাতারাতি পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয় | বর্তমান সরকারপ্রধান ও দলীয় প্রধানকে উত্তরাধিকার সূত্রে বহুমুখী অর্থনৈতিক সংকট, ব্যাংক খাতের লুটপাট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের শূন্যতা এবং নানামুখী আন্তর্জাতিক চাপের মোকাবিলা করতে হচ্ছে | এই বিশাল জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই প্রশাসনিক ও কাঠামোগত কাজে কিছুটা বিলম্ব ঘটছে, যার ফলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়াও সাময়িকভাবে শ্লথ হয়েছে বলে তারা দাবি করছেন |

দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া তাদের বক্তব্যে পরিস্থিতি সাময়িক বলে উল্লেখ করেছেন | তাদের মতে, সরকারের বয়স এখনো এক বছর পূর্ণ হয়নি এবং এই স্বল্পসময়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের সমাধান আশা করা বোকামি হবে | জাতীয় অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্র মেরামতের বৃহত্তর স্বার্থে সরকারপ্রধানকে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সংস্কারমূলক কাজের পেছনেই বেশি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে | তবে তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, বর্তমান জাতীয় সংকটের মাত্রা কিছুটা প্রশমিত হওয়ার পর এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গতি স্বাভাবিক হলে দলীয় প্রধান সরাসরি দলের ভেতরে নজর দেবেন এবং দীর্ঘ লড়াইয়ে অংশ নেওয়া প্রতিটি ত্যাগী ও যোগ্য কর্মীর যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করবেন |

অন্যদিকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় অনেকটাই আত্মসমালোচনা ও স্পষ্টভাষার আশ্রয় নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বকেই সরাসরি দায়ী করেছেন | তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেদের সবকিছু হারিয়ে যারা নিঃস্ব হয়ে গেছেন, বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পরও সেই নিবেদিতপ্রাণ মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটাতে পারেনি | উল্টো সুযোগসন্ধানীরা দলে ঘাপটি মেরে ঢুকে পড়ে সুবিধা লুফে নিচ্ছে, যা ত্যাগী নেতাকর্মীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে এবং তাদের মনে তীব্র হতাশার জন্ম দিচ্ছে | এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশার কারণে একসময়ের লড়াকু কর্মীরা যদি দলীয় কার্যক্রম থেকে নিজেদের ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেন, তবে তার সম্পূর্ণ দায় দায়িত্বশীল নেতাদেরই নিতে হবে বলে তিনি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন |

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, একটি দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পর ক্ষমতায় যাওয়া দলের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মাঠের পরীক্ষিত কর্মীদের সুদিন ফিরিয়ে দেওয়া | কারণ ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীরাই হলো যেকোনো রাজনৈতিক দলের মূল চালিকাশক্তি ও প্রাণভোমরা | যদি নীতিনির্ধারকরা তাদের এই বেদনা ও বঞ্চনাকে আমলে না নিয়ে কেবল প্রশাসনিক জটিলতার দোহাই দিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকেন, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে দলের ঐক্যের ফাটল ধরাতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে | দলের অভ্যন্তরে এই ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং ক্ষোভের আগুন সময়মতো নিভিয়ে ফেলতে না পারলে তা ভবিষ্যতে দল ও সরকার উভয়ের জন্যই বড় ধরনের রাজনৈতিক মূল্য ডেকে আনতে পারে, যা কোনো সচেতন রাজনৈতিক নেতৃত্বই কখনো কামনা করতে পারে না |

তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category