শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি নিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে ঢাকা-নয়াদিল্লির ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে ঢাকার পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে যান শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। গত ৫ আগস্ট দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের জন্য শেখ হাসিনাকে দায়ী করে।
এর পাশাপাশি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন আসামিদেরও ভারত থেকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকা দাবি করছে, অভিযুক্তরা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।
প্রত্যর্পণ চুক্তিতে কী বলা আছে
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি সই হয় ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি। একই বছরের ২৩ অক্টোবর চুক্তিটি কার্যকর হয়। এর আওতায় দুই দেশ নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে একে অপরের কাছে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে হস্তান্তর করতে পারে। তবে চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে রাজনৈতিক অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ না করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
‘পলিটিক্যাল অফেন্স এক্সেপশন’ অনুযায়ী, কোনো অপরাধ রাজনৈতিক চরিত্রের বলে বিবেচিত হলে সংশ্লিষ্ট দেশ প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
অবশ্য হত্যা, অপহরণ ও নরহত্যার মতো গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার বিধান রয়েছে। তবে ‘রাজনৈতিক অপরাধ’-এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় কোনো মামলার চরিত্র নির্ধারণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ব্যাখ্যাগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায়
শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের দমন-পীড়নে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রায়ের পর শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে কূটনৈতিক চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ। তবে নয়াদিল্লি সরাসরি প্রত্যর্পণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের আদালতের রায়টি পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে শান্তি, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা দেখতে চায় বলেও জানিয়েছে ভারত।
৮ নম্বর অনুচ্ছেদেও রয়েছে সুযোগ
প্রত্যর্পণ চুক্তির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদও শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো অভিযোগ ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ বা ‘ন্যায়বিচারের স্বার্থে’ করা হয়নি বলে মনে হলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।
শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে ‘পূর্বনির্ধারিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ট্রাইব্যুনালের পুনর্গঠন ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
শেখ হাসিনা নিজেও রায় প্রত্যাখ্যান করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিচার দাবি করেছেন। বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, বিচারপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে প্রয়োজনীয় সংস্কার দরকার।
চুক্তি থাকলেও সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে জটিল
২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় এর আগে ভারত থেকে বাংলাদেশে একাধিক পলাতক আসামিকে ফেরত আনা হয়েছে। ফলে আইনি কাঠামোর দিক থেকে প্রত্যর্পণের সুযোগ রয়েছে।
তবে শেখ হাসিনার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। চুক্তিটি এমন এক সময়ে সই হয়েছিল, যখন বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে জটিল হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া হবে কি না, তা শুধু প্রত্যর্পণ চুক্তির আইনি বিধানের ওপর নির্ভর করবে না; মামলার প্রকৃতি, বিচারপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা এবং ঢাকা-নয়াদিল্লির সামগ্রিক সম্পর্কও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সূত্র: দ্য হিন্দু