দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি যখন বহুমুখী সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, ঠিক তখনই আশার সবচেয়ে বড় প্রদীপ হয়ে জ্বলছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং নতুন অর্থবছরের শুরুতেই রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, কেবল জুলাইয়ের প্রথম দুই সপ্তাহেই দেশে বিপুল পরিমাণ প্রবাসী আয় ঢুকেছে, যা অতীতের অনেক রেকর্ডকে ম্লান করে দেয়। দীর্ঘদিনের ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতির চরম কশাঘাত, স্থবির বিনিয়োগ এবং আমদানির প্রতিবন্ধকতায় বিপর্যস্ত একটি অর্থনীতির মেরুদণ্ড মূলত সোজা করে রেখেছেন আমাদের প্রবাসী শ্রমিকরাই। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু সময়োপযোগী পদক্ষেপ, যেমন—বৈধ পথে প্রণোদনা বৃদ্ধি, হুন্ডিবিরোধী কঠোর অভিযান এবং ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার, প্রবাসী আয়কে ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা আমদানির ব্যয় মেটানো এবং ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রে অপরিহার্য।
তবে রেমিট্যান্সের এই গগনচুম্বী সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশের ব্যাংক খাতের দিকে তাকালে এক চরম হতাশার চিত্র ফুটে ওঠে। খেলাপি ঋণের পাহাড়, সুশাসনের অভাব এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর মালিকানা নিয়ে প্রভাবশালী মহলের কারসাজি পুরো আর্থিক খাতকে খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। শেয়ারবাজারের অবস্থাও তথৈবচ, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বারবার পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। একটি দেশের অর্থনীতি কেবল প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা, শিল্পায়ন এবং সুশৃঙ্খল আর্থিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া রেমিট্যান্সের এই বিপুল অর্থ কেবল সাময়িক ব্যথানাশক হিসেবেই কাজ করবে, কোনো স্থায়ী রোগমুক্তি ঘটাতে পারবে না। ব্যাংক খাতে লুটপাট বন্ধ করে সেখানে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ।
বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও হুন্ডি নামের অদৃশ্য দানবটি এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। প্রবাসীরা কেন হুন্ডির দিকে ঝোঁকেন, তার মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত কারণগুলো বিশ্লেষণ করা জরুরি। প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনির পর একজন শ্রমিক যখন ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে যান, তখন তাকে নানা ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সময়ক্ষেপণ এবং কখনো কখনো খারাপ আচরণের শিকার হতে হয়। অন্যদিকে হুন্ডি কারবারিরা প্রবাসীর দোরগোড়ায় গিয়ে সেবা দেয় এবং দেশে থাকা স্বজনদের হাতে মুহূর্তের মধ্যে টাকা পৌঁছে দেয়। তদুপরি, দেশ থেকে যারা অবৈধভাবে অর্থ পাচার করতে চান, তারাই মূলত বিদেশে এই হুন্ডি চক্রকে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ, অর্থ পাচারকারীদের লাগাম টেনে না ধরা পর্যন্ত এবং প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং সেবা পানির মতো সহজ না করা পর্যন্ত হুন্ডির বিষদাঁত পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব নয়।
যাদের ঘাম আর রক্তে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে, সেই প্রবাসীদের আমরা গালভরা বুলি দিয়ে ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলি ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র তাদের কতটুকু সম্মান বা সুরক্ষা দিতে পেরেছে, তা এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন। বিদেশে যাওয়ার প্রথম ধাপ থেকেই একজন কর্মীকে পদে পদে প্রতারণা ও শোষণের শিকার হতে হয়। দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে, ভিটেমাটি বিক্রি করে তারা দেশ ছাড়েন। বিদেশে পৌঁছানোর পরও চুক্তি অনুযায়ী কাজ না পাওয়া, পাসপোর্ট আটকে রাখা কিংবা মানবেতর জীবনযাপনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। বিশেষ করে নারী কর্মীদের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। অনেক ক্ষেত্রেই তারা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব অমানবিকতার বিপরীতে আমাদের দূতাবাসগুলোর ভূমিকা বেশিরভাগ সময়েই প্রশ্নবিদ্ধ এবং নীরব। বিপদের দিনে প্রবাসীরা যাদের সবচেয়ে আপন ভাবার কথা, সেই দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে তারা কাঙ্ক্ষিত আইনি বা মানবিক সহায়তা পান না বললেই চলে।
এই চরম বৈপরীত্য থেকে বেরিয়ে আসার সময় এখন পেরিয়ে যাচ্ছে। প্রবাসীদের কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতিয়ার বা যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতা থেকে রাষ্ট্রকে সরে আসতে হবে। অভিবাসন খাতকে পুরোপুরি দালালমুক্ত করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির ওপর জোর দেওয়া আজ সময়ের দাবি। অদক্ষ শ্রমিকের বদলে কারিগরি, ভাষাগত ও পেশাগত প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মী পাঠাতে পারলে যেমন তাদের আয় বাড়বে, তেমনি বিদেশের মাটিতে শোষণের মাত্রাও কমে আসবে। পাশাপাশি দেশের বিমানবন্দরগুলোতে তাদের হয়রানি চিরতরে বন্ধ করে প্রাপ্য সম্মানটুকু নিশ্চিত করতে হবে। রেমিট্যান্স অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ সচল রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে কেবল মানবসম্পদ রপ্তানির ওপর নির্ভরতা দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজার ও মেধা বিকাশের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই প্রবাসী আয়ের এই অর্থকে টেকসই ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে একটি আত্মনির্ভরশীল ও সুশৃঙ্খল অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকতে পারে।