আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিপুল আর্থিক লোকসানের অজুহাতে দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি করেছে সরকার। গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন এই মূল্যতালিকা অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে সবচেয়ে বেশি যুক্ত ডিজেল এবং কেরোসিনের দাম আগের ১১৫ টাকা থেকে এক ধাক্কায় বেড়ে ১৩৫ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। পাশাপাশি পেট্রোলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এক বিশাল আঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জ্বালানি তেলের এই বর্ধিত মূল্য শুধু তেলের পাম্পের ডিসপেন্সারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পরিবহন খাত পেরিয়ে কৃষি, শিল্প, পণ্য পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়বে বলে অর্থনীতিবিদরা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ডিজেলের দামের এই বিশাল উল্লম্ফন অর্থনীতির প্রতিটি শিরা-উপশিরায় মূল্যস্ফীতির নতুন বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিতে পারে। কারণ দেশের মোট জ্বালানি তেল ব্যবহারের প্রায় ৬৪ শতাংশই হলো ডিজেল, যার প্রধান ভোক্তা হলো পরিবহন, কৃষি এবং কলকারখানা।
জ্বালানি তেলের এই বিপুল দাম বৃদ্ধির পেছনে সরকার এবং বিপিসির পক্ষ থেকে বেশ কিছু জোরালো আর্থিক যুক্তি ও বাধ্যবাধকতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল এবং এর পরিবহন বা ফ্রেইট ভাড়ায় ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশীয় বাজারে তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় না করায় মার্চ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত বিপিসিকে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক লোকসান গুনতে হয়েছে। সরকারের হিসাব বলছে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির প্রায় ৮৯ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছিল, যার ফলে সংস্থাটির দৈনিক লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১০৯ কোটি টাকায়। এই ভয়াবহ লোকসানের ধারা অব্যাহত থাকলে বছরে শুধু ডিজেলেই বিপিসিকে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি সামাল দিতে হতো। নতুন করে ২০ টাকা মূল্য সমন্বয়ের ফলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা হ্রাস পাবে বলে সরকার আশা করছে। এর পাশাপাশি আরেকটি বড় শঙ্কার বিষয় ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানির উচ্চমূল্য। সীমান্তপথে দেশের অপেক্ষাকৃত কম দামের জ্বালানি তেল পাচার হয়ে যাওয়ার একটি সুস্পষ্ট ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, যা রোধ করতেই দাম বাড়ানোর এই কঠোর সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে বলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দাবি করেছেন।
সরকার নিজেদের লোকসান সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও, এর সরাসরি এবং সবচেয়ে নির্মম শিকার হতে যাচ্ছে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতার অভাবে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি হয়তো একপ্রকার নিরুপায় হয়েই নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এর চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে সাধারণ ভোক্তাকে। ডিজেলের দাম বাড়ার সাথে সাথে দেশের বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান এবং লঞ্চসহ পুরো পরিবহন ব্যবস্থার পরিচালন ব্যয় জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাবে। পণ্য পরিবহনের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো উৎপাদক থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নতুন করে বৃদ্ধির এক বিশাল চাপ তৈরি হবে এবং ইতিমধ্যে সারা দেশে পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর এক অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। অন্যদিকে দেশের কৃষি খাত সেচ, জমি প্রস্তুতকরণ এবং ফসল পরিবহনের জন্য সরাসরি ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ট্রাক্টর চালানো এবং সেচযন্ত্রের খরচ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাবে, যা কৃষকের উৎপাদন ব্যয়কে বাড়িয়ে তুলবে বহুগুণ। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে স্বভাবতই কাঁচাবাজারে কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে যাবে, যা সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দেবে।
পরিবহন ও কৃষির পাশাপাশি দেশের শিল্প খাতও এই জ্বালানি সংকটের কারণে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে চরম সীমাবদ্ধতা বিরাজ করছে। লোডশেডিং এবং গ্যাসের অভাবে কারখানার চাকা সচল রাখতে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত বিশাল বিশাল জেনারেটর ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এখন ডিজেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় তাদের উৎপাদন ব্যয় ধারণার চেয়েও অনেক বেশি বেড়ে যাবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য এমনিতেই সংগ্রাম করছে। সেখানে উৎপাদন ব্যয় বা কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস এভাবে বেড়ে গেলে তা উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে এবং রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি পেলে নির্দিষ্ট আয়ের কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং দিনমজুরদের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয় অনেকটা বেড়ে যাবে, যা তাদের সীমিত আয়ের বাজেটে বিশাল এক ঘাটতি তৈরি করবে।
জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের যৌক্তিকতা থাকলেও, একবারে ২০ টাকা করে দাম বাড়ানোর এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে দামের সমন্বয় করাটা হয়তো জরুরি ছিল, কিন্তু সেটি এক ধাক্কায় না করে ধাপে ধাপে বা পর্যায়ক্রমে করা হলে অর্থনীতির ওপর এই ভয়াবহ আকস্মিক চাপ কিছুটা হলেও এড়ানো সম্ভব হতো। এই বিতর্কের মাঝে বিপিসির অতীত মুনাফার প্রসঙ্গটিও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যানুযায়ী, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিগত ১১ বছরে বিপিসি সব মিলিয়ে প্রায় ৫৬ হাজার ৫২৩ কোটি টাকার বিশাল নিট মুনাফা করেছে। শুধুমাত্র ২০২১-২২ অর্থবছর ছাড়া বাকি প্রায় পুরোটা সময়ই তারা লাভের মুখ দেখেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কম ছিল এবং বিপিসি হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করছিল, তখন সেই টাকার কতটুকু জনকল্যাণে বা ভবিষ্যৎ সংকটের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছিল। মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য সেই বিপুল মুনাফা থেকে কোনো বিশেষ আপৎকালীন তহবিল বা প্রাইস স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড কেন গঠন করা হলো না, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের কোনো সদুত্তর নেই।
বিপিসির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা এবং বিশাল অঙ্কের সিস্টেম লস নিয়েও জনমনে গভীর প্রশ্ন রয়েছে। জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণের প্রতিটি স্তরে যে পরিমাণ অপচয় ও সিস্টেম লস দেখানো হয়, তা নিরসন করতে পারলে হয়তো এতটা দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। সরবরাহ ব্যবস্থায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিপো থেকে শুরু করে পাম্প পর্যন্ত রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, ডিজিটাল মিটারিং এবং নিয়মিত স্বাধীন অডিট চালু করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যবৃদ্ধির এই প্রবল ধাক্কা সাধারণ মানুষের ওপর থেকে কিছুটা হলেও লাঘব করতে হলে সরকারকে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, পুরো জ্বালানি খাতে ঢালাওভাবে ভর্তুকি না দিয়ে শুধুমাত্র কৃষক, গণপরিবহন এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক বা টার্গেটেড সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। সেচ মৌসুমে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় সহনশীল রাখতে ডিজিটাল কার্ডের মাধ্যমে বিশেষ জ্বালানি সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ার অজুহাতে পরিবহন ও কাঁচাবাজারে কোনো অসাধু সিন্ডিকেট যেন পরিবহন ব্যয়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দাম আদায় করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করতে না পারে, সেজন্য সারা দেশে কঠোর বাজার মনিটরিং এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করতে হবে।
সরকারের সামনে এখন এক চরম দ্বিমুখী সংকট ও বিশাল পাহাড়সম চাপ বিরাজ করছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের লাগামহীন ও ঊর্ধ্বমুখী দাম, বিপিসির হাজার হাজার কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রতিনিয়ত তৈরি হওয়া চাপ এবং সীমান্তপথে তেল পাচার হয়ে যাওয়ার বিশাল ঝুঁকি সরকারকে দিশেহারা করে তুলছে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রমাগত কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা, বেকারত্ব এবং প্রতিটি খাতে উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, এই সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির আগে বিপিসির পক্ষ থেকে সেপ্টেম্বরের জন্য প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৮৭ টাকা পর্যন্ত করার একটি বিশাল প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার চূড়ান্তভাবে তা ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছে, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে বর্ধিত ব্যয়ের পুরো ১০০ ভাগ সরাসরি দেশীয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। তারপরও সাধারণ মানুষের বর্তমান আয় ও ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতার কারণে এই ২০ টাকা বৃদ্ধিই তাদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো রূপ নিয়েছে। তাই সরকারের এই বর্তমান সিদ্ধান্তটিকে কেবল তেলের দাম বৃদ্ধি হিসেবে সরলীকরণ করে দেখলে এর পেছনে লুকিয়ে থাকা পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক চিত্রটি কোনোভাবেই অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় ও কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে জ্বালানি খাতের এই বিশাল আর্থিক চাপ সামাল দিতে গিয়ে সেই চাপ যেন পরিবহন, কৃষি, শিল্প এবং খাদ্যবাজার হয়ে শেষ পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বেশি অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষের ঘাড়ে গিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা। যদি অবিলম্বে বাজার তদারকি বৃদ্ধি, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার বাস্তবায়ন এবং বিপিসির যাবতীয় ব্যয় ও ব্যবস্থাপনায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধির প্রাথমিক প্রভাব কেবল তেলের পাম্পের সীমানাতেই আটকে থাকবে না, বরং তা পুরো অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে।