• বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৯ অপরাহ্ন

নিষেধাজ্ঞার অগ্নিপরীক্ষায় ইরানের ড্রোন বিপ্লব: যেভাবে বদলে গেল আধুনিক যুদ্ধের ব্যাকরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / ২ Time View
Update : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এখন আর শুধু বিশালকার যুদ্ধবিমান বা শক্তিশালী মিসাইলই শেষ কথা নয়; বরং আকাশজুড়ে রাজত্ব করছে তুলনামূলক ছোট ও সস্তা এক মরণাস্ত্র—ড্রোন। কয়েক বছর আগে ইসরাইল-লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহর তৎপরতায় প্রথম ইরানের ড্রোনের কথা বিশ্ববাসীর নজরে আসে। পরবর্তীতে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হাতেও একই প্রযুক্তির দেখা মেলে। তবে বিশ্বকে সবচেয়ে বেশি অবাক করে দেয় ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যখন কিয়েভের আকাশে ইরানের তৈরি ‘শাহেদ-১৩৬’ (জেরেনিয়াম-২) ড্রোনের উপস্থিতি শনাক্ত হয়, তখন সমর বিশেষজ্ঞরা নড়েচড়ে বসেন। প্রশ্ন ওঠে—চার দশক ধরে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা একটি দেশ কীভাবে আকাশপথের যুদ্ধের নিয়ম বা ‘রুলস অফ গেম’ বদলে দিলো?

অস্তিত্বের সংকট থেকে আত্মনির্ভরশীলতা

ইরানের এই অভাবনীয় সাফল্যের মূলে রয়েছে ১৯৭৯ সালের বিপ্লব-পরবর্তী পরিস্থিতি। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি যখন দেশত্যাগ করেন, তখন ইরানের হাতে ছিল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বিমানবাহিনী, যার মেরুদণ্ড ছিল মার্কিন ‘এফ-১৪ টমক্যাট’ যুদ্ধবিমান। কিন্তু বিপ্লবের পর মার্কিন প্রকৌশলীরা দেশ ছাড়লে এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে শত শত কোটি ডলারের সেই বিমানগুলো অকেজো ধাতব বস্তুতে পরিণত হয়।

এরপর ১৯৮০ সালে শুরু হয় দীর্ঘ আট বছরের রক্তক্ষয়ী ইরাক-ইরান যুদ্ধ। ইরাক তখন সোভিয়েত প্রযুক্তির গোয়েন্দা বিমান ও স্যাটেলাইট চিত্রের সহায়তায় আকাশপথে একতরফা আধিপত্য বিস্তার করছিল। বিপরীতে ইরানের কাছে ছিল না কোনো আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা বা গোয়েন্দা ব্যবস্থা। এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ইরান বুঝতে পারে, বিদেশের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। ‘প্রয়োজনই আবিষ্কারের জনক’—এই মন্ত্রকে সামনে রেখে ইরানি নেতৃত্ব নিজেদের প্রকৌশলী ও তরুণ গবেষকদের ওপর আস্থা রাখেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্কশপ থেকে রণক্ষেত্র

ইরানের ড্রোন কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেকটা শখের বশে করা কোনো প্রোজেক্টের মতো। ১৯৮১ সালের দিকে ইসফাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল স্বপ্নবাজ তরুণ ও প্রকৌশলী মিলে ছোট, সস্তা ও রিমোট নিয়ন্ত্রিত ডিভাইস তৈরির কাজ শুরু করেন। লক্ষ্য ছিল একটাই—সীমান্ত না পেরিয়েও যেন শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যায়।

শুরুটা ছিল খুবই সাদামাটা। তাঁদের তৈরি প্রথম মডেলটি দেখে সামরিক কর্মকর্তারা উপহাস করে বলেছিলেন, এটি দেখতে ‘বাচ্চাদের খেলনার মতো’। ড্রোনটিতে জ্বালানি ট্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল হাসপাতালের ‘মেডিকেল আইভি ব্যাগ’ আর পাখাগুলো ছিল হাতে তৈরি। কিন্তু ১৯৮৩ সালে সেই ‘খেলনা’ যখন ৪০ কিলোমিটার দূর থেকে ইরাকি সামরিক অবস্থানের ঝকঝকে ছবি নিয়ে ফিরে এলো, তখন টনক নড়ল সামরিক নেতৃত্বের। গঠিত হলো ‘থান্ডার ব্যাটালিয়ন’। এভাবেই একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্কশপ থেকে জন্ম নিলো আজকের ভয়ংকর সব ইরানি ড্রোন।

চতুর কৌশল: কম খরচে বড় আঘাত

পশ্চিমা বিশ্বের সমর চিন্তা যখন কয়েক কোটি ডলার মূল্যের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্রের পেছনে ছুটছিল, ইরান তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সমীকরণ তৈরি করে। ইরানি সমর কৌশলের মূল ভিত্তি হলো—প্রযুক্তিতে পাল্লা দিতে না পারলে সংখ্যা ও খরচের দিক থেকে শত্রুকে চাপে ফেলতে হবে।

একটি ইরানি ড্রোনের নির্মাণ খরচ গড়ে ২০ হাজার ডলার। অন্যদিকে, সেই ড্রোনটিকে ধ্বংস করতে শত্রুপক্ষকে যে প্যাট্রিয়ট বা অন্য কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা মিসাইল ছুড়তে হয়, তার প্রতিটি মিসাইলের দাম প্রায় ২০ থেকে ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ, ১০০টি ড্রোন উৎক্ষেপণ করতে ইরানের খরচ হয় মাত্র ২০ লাখ ডলার, কিন্তু সেগুলো ভূপাতিত করতে প্রতিপক্ষকে ব্যয় করতে হয় অন্তত ২০ কোটি ডলার। এই বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবধানই ড্রোন যুদ্ধে ইরানকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে।

সফলতার মূল চালিকাশক্তি ও বিবর্তন

ইরানের ড্রোনের বিবর্তনে ইসরাইলি প্রযুক্তিরও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। ১৯৮২ সালে লেবাননে আগ্রাসনের সময় ইসরাইল ‘স্কাউট’ ও ‘ম্যাস্টিফ’ ড্রোন ব্যবহার করেছিল। ইরানি বিশেষজ্ঞরা সেই প্রযুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখেন যে, এগুলো নকল করা খুব একটা কঠিন নয়। ফলে ইসরাইলি নকশা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তাঁরা নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করেন।

১৯৮৭ সাল থেকে ইরান ড্রোনকে কেবল নজরদারি নয়, বরং আক্রমণাত্মক মরণাস্ত্র হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ শুরু করে। জন্ম নেয় ‘মোহাজের’ ও পরবর্তীতে ‘শাহেদ’ সিরিজের মতো কামিকাজে বা আত্মঘাতী ড্রোন। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আরামকো তেল স্থাপনায় হওয়া হামলা বিশ্বকে দেখিয়ে দেয় যে, এই স্বল্পমূল্যের ড্রোনগুলো কীভাবে কয়েক বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটাতে পারে।

২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট: বিশ্ব রাজনীতির নতুন সমীকরণ

২০২৬ সালে এসে ইরান ড্রোন প্রযুক্তিতে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। তাদের ড্রোনগুলো এখন এক দেশ থেকে উড়ে একাধিক দেশের আকাশসীমা পাড়ি দিয়ে হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। রাডারে ধরা না পড়ার জন্য এগুলো খুব নিচু উচ্চতায় এবং ধীরগতিতে ওড়ে, যা আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বড় মাথাব্যথার কারণ।

পশ্চিমা গোয়েন্দাদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান দুবাই বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে একটি শক্তিশালী সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। বেসামরিক ব্যবহারের জন্য উৎপাদিত সাধারণ চিপ বা মোটর ব্যবহার করেই তারা তৈরি করছে নিখুঁত অস্ত্র। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার হাতে ইরানি ড্রোনের সরবরাহ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্রই বদলায়নি, বরং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সমীকরণকেও ওলটপালট করে দিয়েছে।

ইরানের এই সামরিক সক্ষমতা প্রমাণ করে যে, কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনো দেশের উদ্ভাবনী ক্ষমতা থামিয়ে রাখা যায় না। সীমিত সম্পদ এবং চার দশকের একাকীত্বের মধ্যেও তারা ধৈর্য, ধারাবাহিকতা এবং সুস্পষ্ট কৌশলের মাধ্যমে সামরিক বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। আজ তুরস্ক, ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও, আকাশপথে ড্রোনের কার্যকর ব্যবহার শুরু করা প্রথম দেশ হিসেবে ইরান ইতিহাসের পাতায় এবং আধুনিক রণক্ষেত্রে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছে।

ভবিষ্যৎ যুদ্ধে জয়ী ও পরাজিত নির্ধারিত হবে কে কত ব্যয়বহুল মিসাইল ছুড়ল তার ওপর নয়, বরং কে কত চতুরতার সাথে সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার করতে পারল তার ওপর। আর এই নতুন সমীকরণের একচ্ছত্র কারিগর হিসেবে ইরান বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category