সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের হিসাব-নিকাশে মূল্যস্ফীতি নিছক কোনো মাসিক পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি এক নির্মম ও রূঢ় বাস্তবতা| প্রতিদিনের খাবার টেবিলে পুষ্টিকর কোনো পদ রান্না হবে কি না, অসুস্থ হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া সম্ভব হবে নাকি টাকার অভাবে চিকিৎসা পিছিয়ে দিতে হবে, কিংবা সন্তানদের ভালো কোনো স্কুলে পড়াশোনার খরচ মেটানো যাবে কি না—এই সবই সরাসরি নির্ধারণ করে দেয় মূল্যস্ফীতির হার| অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে পণ্যের সাময়িক দাম বাড়ার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অনেক বেশি ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে| বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই নীরব অর্থনৈতিক সংকট মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সম্পূর্ণ নিঃশব্দে কেড়ে নেয়| এটি তিল তিল করে জমানো সঞ্চয়ের প্রকৃত মান ধুলোয় মিশিয়ে দেয়, নতুন বিনিয়োগকে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করে এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দারিদ্র্যের বিস্তার ঘটায়| প্রখ্যাত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতিকে আখ্যায়িত করেছিলেন এমন এক ধরনের কর হিসেবে, যা আরোপ করার জন্য সংসদে কোনো আইন পাসের প্রয়োজন হয় না| কারণ, সরকার বা রাষ্ট্র কোনো নতুন কর না বসালেও জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে মানুষের পকেটের টাকার মান এমনিতেই কমে যায়| এক শতাব্দী আগে, ১৯১৯ সালে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনসও সতর্ক করে বলেছিলেন যে, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি সমাজে সম্পদের এক ধরনের গোপন ও অন্যায্য পুনর্বণ্টন ঘটায়| এর ফলে নগদ অর্থ সঞ্চয়কারী ও স্থির আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে ঋণগ্রহীতা বা সম্পদের মালিকরা তুলনামূলকভাবে লাভবান হন|
গত চার বছর ধরে বাংলাদেশ এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির এক ভয়ংকর দুষ্টচক্রে আটকে আছে| বিশেষ করে ২০২২ সালের জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে জ্বালানি তেলের দাম গড়ে ৪৭ শতাংশ বাড়ানোর ঠিক এক মাস পরেই দেশের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ থেকে একলাফে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে পৌঁছে যায়| সেই সময় শুধু ডিজেলের দামই বাড়ানো হয়েছিল ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ| পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আগেই চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে আবারও তিন দফায় জ্বালানির দাম গড়ে ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে| এবারও ডিজেলের দাম ৩৫ শতাংশ বাড়ার ফলে অর্থনীতিতে নতুন করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবল ও দীর্ঘস্থায়ী আশঙ্কা তৈরি হয়েছে| বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ| জুনে সেটি সামান্য কমে ৯ দশমিক ১৬, জুলাইয়ে ৮ দশমিক ৩২ এবং আগস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে| আগস্ট মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ হলেও সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এ সময় বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে| এর বিপরীতে একই সময়ে মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ| অর্থাৎ, বাজারে জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে, খেটে খাওয়া মানুষের আয় সেই হারে বাড়ছে না| মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ এই নয় যে বাজারে পণ্যের দাম কমে গেছে, বরং আগের চেয়ে দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে মাত্র| তাই হার কমলেও সাধারণ ভোক্তা এর কোনো তাৎক্ষণিক সুফল বা স্বস্তি পান না|
উচ্চ মূল্যস্ফীতি একটি সমাজে দারিদ্র্যের মাত্রাকে কতটা ভয়াবহ রূপ দেয়, তা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষদের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে| বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে উচ্চ আয়ের কোনো পরিবার হয়তো তাদের নতুন গাড়ি কেনা পিছিয়ে দেয় বা বাইরে রেস্তোরাঁয় খাওয়া কিছুটা কমিয়ে আনতে পারে| কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষদের সামনে কাটছাঁট করার মতো এমন কোনো বিলাসী বিকল্প থাকে না| তাদের আয়ের সিংহভাগই ব্যয় হয় তিন বেলার খাবার, মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসাসহ নিতান্তই মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে| বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে| এর ফলে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশের প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে| বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের ওই দারিদ্র্য মূল্যায়ন প্রতিবেদনে আরও একটি ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে| সেখানে বলা হয়েছে যে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ এখনো যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় দারিদ্র্যসীমায় ফিরে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে| পরিবারে কারও বড় ধরনের অসুখ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কা এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে পথে বসিয়ে দিতে পারে| আজকের দিনে বাধ্য হয়ে করা পারিবারিক কাটছাঁটই আগামী দিনের ভয়াবহ দারিদ্র্যের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়|
মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে গভীর, সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিটি দৃশ্যমান হয় ভবিষ্যতের মানবসম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে| বর্তমানের উচ্চ খরচের কারণে একটি দরিদ্র পরিবার যখন বাধ্য হয়ে পুষ্টিকর খাবার কেনা কমিয়ে দেয় বা সন্তানের পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, তখন পরোক্ষভাবে একটি দুর্বল ও অদক্ষ প্রজন্মের জন্ম হয়| যে শিশুটি আজ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এবং মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময় সে দুর্বল স্বাস্থ্য ও কম দক্ষতার কারণে ভালো আয় করতে পারবে না| নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন উন্নয়নের সংজ্ঞায় শুধু মানুষের মাথাপিছু আয়কে বিবেচনা করেননি, বরং তিনি মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন| সেই মানব সক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, মূল্যস্ফীতি কেবল মানুষের পকেটই খালি করছে না, বরং একটি স্বাধীন দেশে নিজের পছন্দমতো সম্মানজনক জীবনযাপনের যে ন্যূনতম সুযোগ, সেটিও চিরতরে কেড়ে নিচ্ছে| ভবিষ্যতের উন্নত, প্রযুক্তিনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির জন্য যে দক্ষ ও সুস্থ জনশক্তি প্রয়োজন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশ সেই শক্তিশালী মানবসম্পদ তৈরির দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছে|
অন্যদিকে, দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ সঞ্চয়কারীরা এই নীরব মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় শিকার হয়ে দাঁড়িয়েছেন| একজন সাধারণ মানুষ তার সন্তানের উচ্চশিক্ষা, মাথা গোঁজার জন্য একটু জমি কেনা, নিজের নিরাপদ অবসর জীবন বা যেকোনো জরুরি চিকিৎসায় কাজে লাগানোর জন্য বছরের পর বছর ধরে ব্যাংকে টাকা জমান| কিন্তু সেই জমানো টাকার প্রাপ্ত সুদের হারের চেয়ে যদি বাজারের মূল্যস্ফীতির হার বেশি হয়, তবে প্রকৃত অর্থে সেই ব্যাংক হিসাবে টাকার অঙ্ক বাড়লেও তার ক্রয়ক্ষমতা বা মান কমে যায়| বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ব্যাংকে আমানতের গড় সুদের হার ছিল ৬ শতাংশের কাছাকাছি| অথচ দেশের মূল্যস্ফীতি সারা বছর জুড়েই ছিল ৮ থেকে ৯ শতাংশের ঘরে| অর্থাৎ, ব্যাংক থেকে সুদ পাওয়ার পরও আমানতকারীদের প্রকৃত আয়ের রিটার্ন ছিল ঋণাত্মক ২ থেকে ৩ শতাংশ| এই চরম হতাশাজনক পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা জমানোর ওপর আস্থা হারিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ বা দাম বাড়ার আশায় সম্পদ কিনে রাখার দিকে ঝুঁকছেন| অথচ একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির মূলধন গঠনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সঞ্চয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি আগামী দিনের সেই আর্থিক নিরাপত্তার বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ দুর্বল করে দেয়|
শুধু সাধারণ মানুষই নয়, দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বেসরকারি বিনিয়োগও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে| বাজারে জিনিসপত্রের দামের কোনো স্থিরতা না থাকায় একজন শিল্পোদ্যোক্তা বুঝতে পারছেন না আগামী ছয় মাস পর তার শিল্পের কাঁচামালের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে| একজন ব্যবসায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না তিনি ঠিক কতটা পণ্য গুদামে মজুত করবেন| ঠিক একইভাবে একটি বড় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের খরচের নির্ভরযোগ্য কোনো আর্থিক হিসাব দাঁড় করাতে পারে না| এর ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ পিছিয়ে যায় এবং অর্থনীতির চাকা শ্লথ হয়ে পড়ে| কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য জ্বালানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান| জ্বালানি শুধু সরাসরি ভোগের বিষয় নয়, এটি পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত| বর্তমান গ্যাস সংকট এবং এলএনজির বাড়তি দাম এমনিতেই শিল্প খাতকে চরম সংকটে ফেলে কিছু কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য করেছে| এর ওপর জ্বালানির এই নতুন দাম বৃদ্ধি পরিবহন থেকে শুরু করে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার চূড়ান্ত আর্থিক দায় গিয়ে পড়ছে সেই অসহায় সাধারণ ভোক্তার কাঁধেই|
সবশেষে, বাংলাদেশের সংবিধানে একটি সত্যিকারের কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, এই লাগামহীন মূল্যস্ফীতি তাকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করছে| স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর অনেক আর্থসামাজিক অগ্রগতি হলেও এখনো সমাজে চরম বৈষম্য ও স্বাস্থ্য-শিক্ষায় ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে| সরকারের দেওয়া সামাজিক সুরক্ষার ভাতাগুলোর প্রকৃত মূল্য দিন দিন তলানিতে গিয়ে ঠেকছে| ধরা যাক, একজন বয়স্ক মানুষ মাসে ৫ হাজার টাকা ভাতা পান, জিনিসপত্রের দাম কম থাকলে এর যে মূল্য ছিল, মূল্যস্ফীতির কারণে তা আজ একেবারেই অর্থহীন হয়ে পড়েছে| একজন শ্রমিক কি তার অবসরজীবনের জন্য নিশ্চিন্তে টাকা জমাতে পারবেন, নাকি একজন তরুণ দম্পতি ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে পারবেন—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই বলে দেয় একটি অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল| মূল্যস্ফীতি আজকের ভোগের ওপর একটি অদৃশ্য কর চাপিয়ে দেয়, অতীতের সঞ্চয়ের ওপর কঠোর শাস্তি আরোপ করে এবং দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি আগামী দিনের যাবতীয় সুযোগ ও সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয়| তাই মূল্যস্ফীতিকে নিছক কোনো অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার আর কোনো সুযোগ নেই|