• রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৩১ অপরাহ্ন
Headline
ফলাফল সন্তোষজনক নয় এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার নির্দেশ পরওয়ারকে শাহে আলম: আতঙ্কিত হবেন না, ৭০০টির মধ্যে ৫টি অটোরিকশার নিবন্ধন পাবেন সাইবার নিরাপত্তায় নতুন নীতি আনছে বাংলাদেশ ব্যাংক চার মাসে রপ্তানি আয় ১৭.৪ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ ইরানের এক-দুটি স্থাপনায় এখনো হামলা চালানো বাকি: ট্রাম্প স্পিকারের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ স্পিকারের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ মজুরি বোর্ড গঠিত হওয়ায় শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান শ্রমমন্ত্রীর পুনর্ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: মাহদী আমিন নবীন কর্মকর্তাদের সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে: কৃষিমন্ত্রী

নেপালের সস্তা বিদ্যুৎ আমদানিতে ভারতের ট্রানজিট প্রস্তাবে কঠিন শর্ত

Reporter Name / ৩ Time View
Update : রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬

দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন আনতে নেপাল থেকে বিপুল পরিমাণ সস্তা জলবিদ্যুৎ আমদানির জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে একক কোনো সঞ্চালন লাইনের অনুমতি দেওয়ার বদলে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক গ্রিড বা ট্রানজিট ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলেছে ঢাকা। সম্প্রতি ভারতের মুম্বাই শহরে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদ্যুৎ সচিবদের ১৯তম উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই শক্ত অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। বিশ্বব্যাংকের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বৈঠকে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় নীতি নির্ধারক ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।

মুম্বাইয়ের এই সম্মেলনে নেপাল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যের জলবিদ্যুৎ সরবরাহের লোভনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ নামমাত্র খরচে নেপাল থেকে দৈনিক প্রায় ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আমদানি করছে, যার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম মাত্র ৮ টাকা ১৭ পয়সা পড়ে। অথচ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবি দেশের অভ্যন্তরে ও অন্যান্য বিদেশি বেসরকারি বিভিন্ন উৎস থেকে গড়ে প্রতি ইউনিট ১৩ টাকারও বেশি চড়া দামে বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এই বিশাল আর্থিক সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ঢাকা নেপাল থেকে আরও অধিক পরিমাণে জলবিদ্যুৎ আমদানির পথ সুগম করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

তবে এই বিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আঞ্চলিক সঞ্চালন লাইন বা গ্রিড নেটওয়ার্কের সুনির্দিষ্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আর এখানেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত দেনদরবার শুরু হয়েছে। বৈঠকে ভারত তাদের নিজেদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বা সেভেন সিস্টার্সে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশের পার্বতীপুর সীমান্ত দিয়ে একটি ৭৬৫ কেভির হাইভোল্টেজ সঞ্চালন লাইন বা করিডর নির্মাণের অনুমতি চেয়ে প্রস্তাব দেয়। দিল্লি আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে যে এই করিডর স্থাপিত হলে বাংলাদেশও তার প্রয়োজন অনুযায়ী নেপাল ও ভুটান থেকে সেই লাইন ব্যবহার করে বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারবে।

কিন্তু বিগত দিনের অভিজ্ঞতা এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণ মাথায় রেখে বাংলাদেশ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, সমান সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আঞ্চলিক গ্রিড ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা পাওয়া না গেলে ভারতকে একতরফাভাবে এই করিডর নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে না। বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকদের পরিষ্কার অভিমত হলো, দ্বিপাক্ষিক কোনো খণ্ডিত চুক্তির চেয়ে নেপাল-ভারত-বাংলাদেশ কিংবা ভুটান-ভারত-বাংলাদেশ সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক গ্রিড নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা আবশ্যক। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ঐতিহাসিক অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে না পারলে এই অঞ্চলের বিশাল জলবিদ্যুৎ সম্পদের সুফল কেউ পুরোপুরি ভোগ করতে পারবে না বলে ঢাকা জোরালোভাবে উল্লেখ করেছে।

বৈঠকে উপস্থিত বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে যে কেবল বাংলাদেশ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অংশগ্রহণকারী দেশগুলোও আঞ্চলিক গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যাপারে ইতিবাচক মত প্রকাশ করেছে। বিশ্বব্যাংক এই পুরো আলোচনার ওপর একটি বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর কাছে অচিরেই জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া আগামী বছর বিদ্যুৎ সচিবদের পরবর্তী আঞ্চলিক সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ঋতুভিত্তিক বিদ্যুৎ চাহিদার হিসাব মেলাতে গেলে নেপালের সঙ্গে এই জলবিদ্যুৎ সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রীষ্মের উষ্ণ মৌসুমে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা যেমন ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়, তেমনি শীতকালে তা অনেক কমে ১০ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। ফলে শীতকালে দেশের অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অব্যবহৃত অবস্থায় বসিয়ে রাখতে হয়। আবার অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে নেপালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা হ্রাস পায়। এই বৈপরীত্য দূর করতে বাংলাদেশ শীতকালীন সময়ে নেপালকে বিদ্যুৎ রপ্তানি করার অভিনব চিন্তার কথাও মুম্বাই সম্মেলনে তুলে ধরেছে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও ভারত ও বাংলাদেশের সচিবদের এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনাকে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বিনিময়ের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে গত জুলাই মাসে দুই দেশের বিদ্যুৎ সচিব পর্যায়ের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে ভারতের এই করিডর প্রস্তাব নিয়ে বেশ কিছু ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে ২০২৫ সালে কাজ শুরু করে ২০২৮ সালের মধ্যে এই লাইন চালুর তাগিদও নথিপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে তৎকালীন সরকার শেষ পর্যন্ত এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি। পরবর্তীতে আগস্ট মাসে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বাংলাদেশের নতুন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ৭৬৫ কেভি গ্রিড লাইন নির্মাণের প্রসঙ্গটি পুনরায় উত্থাপন করেন। তবে বাংলাদেশ সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে দিল্লি যেভাবে এককভাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে এই লাইন নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে, ঢাকা সেভাবে চিন্তা করছে না।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সুদৃঢ় আঞ্চলিক গ্রিড ব্যবস্থা কার্যকর থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ায় পারস্পরিক রাজনৈতিক অনাস্থার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তা গড়ে উঠতে পারেনি। ফলস্বরূপ, নেপাল ও ভুটানের পাহাড়সম জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনার সঠিক সদ্ব্যবহার আজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার বেড়াজাল ভেঙে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সমতার ভিত্তিতে আঞ্চলিক গ্রিড চালুর পক্ষে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে।

সব মিলিয়ে নেপালের ৩ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আমদানির প্রস্তাব এবং ভারতের ট্রানজিট করিডরের দাবি—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সমতার অধিকার এবং যৌথ সুবিধার নিশ্চয়তা আদায়ের এই শক্ত অবস্থান ভবিষ্যতে জাতীয় জ্বালানি সুরক্ষাকে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী করবে বলে সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেಷকেরা মনে করছেন। আগামী দিনে ঢাকার পরবর্তী আঞ্চলিক সম্মেলনে এই বিষয়ে কী ধরনের অগ্রগতি হয়, সেটাই এখন দেখার মূল বিষয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে ভারতের সেভেন সিস্টার্সে বিদ্যুৎ প্রেরণের করিডর দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি স্বার্থ শতভাগ সুরক্ষিত হওয়া উচিত। কেবল মৌখিক আশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক গ্রিড চুক্তিতে আইনগত ও কাঠামোগত নিশ্চয়তা থাকা বাধ্যতামূলক।

বাংলাদেশের এই দৃঢ় মানসিকতা ও কূটনৈতিক পরিপক্বতা প্রমাণ করে যে বর্তমান প্রশাসন জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক সুফলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করছে। নেপালের সস্তা বিদ্যুৎ আমদানির মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন ব্যয় কমানোর এটি এক সুবর্ণ সুযোগ।

আগামী দিনগুলোতে ত্রিদেশীয় এই জ্বালানি কূটনীতি কোন নতুন মোড় নেয় এবং আঞ্চলিক গ্রিড বাস্তবায়নে ভারত কতটা নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করে, তার ওপর নির্ভর করবে দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা।

দেশের সর্বস্তরের জনগণের প্রত্যাশা হলো, সকল আলোচনা ও চুক্তিতে যেন দেশের স্বার্থ সব সময় অক্ষুণ্ণ থাকে।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category