শিক্ষাবর্ষের শুরুতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার মহৎ রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমকে ঘিরে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড তথা এনসিটিবিতে নজিরবিহীন অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির মহা-উৎসবের তথ্য উন্মোচিত হয়েছে| ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানোর মহা-আয়োজনে সরকারি আইন ও নীতিমালার তোয়াক্কা না করে এক গভীর কারসাজির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে| দরপত্র উন্মুক্ত বা ‘লাইভ’ থাকা অবস্থায় গোপন প্রাতিষ্ঠানিক প্রাক্কলিত দর সিন্ডিকেটের হাতে ফাঁস করে দিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা কৌশলে লোপাট করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে| শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের একটি প্রভাবশালী চক্র এবং চিহ্নিত কিছু প্রেস মালিকের মধ্যকার গোপন বোঝাপড়ায় গড়ে ওঠা ত্রিপক্ষীয় সিন্ডিকেট এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করেছে| প্রতিযোগিতাহীন পরিবেশে মাত্রাতিরিক্ত চড়া মূল্যে কাজ বাগিয়ে নিতে একাধিক সিডিউল বিক্রি হলেও সিংহভাগ লটে নামমাত্র একটি বা দুটি দরপত্র জমা দেওয়া হয়েছে| ক্রয় প্রক্রিয়ার এই নগ্ন আইন লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে দুর্নীতির নথিপত্র জব্দ করতে ইতিমধ্যে এনসিটিবি ভবনে আনুষ্ঠানিক সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক|
নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য সারা দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণের লক্ষ্যে সর্বমোট ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই মুদ্রণের মহাযজ্ঞ হাতে নেয় সরকার| এই বিশাল সংকলনের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ কপি, প্রাথমিক স্তরের জন্য রয়েছে ৭ কোটি ৯৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৩৮ কপি এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সর্ববৃহৎ অংশ হিসেবে ২২ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার ৯২৩ কপি বই ছাপানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়| রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এই বিপুল পরিমাণ বই মুদ্রণ বাবদ প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার বিশালাকার বাজেট বরাদ্দ করা হয়| কিন্তু এই মহতী রাষ্ট্রীয় উদ্যোগকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে একশ্রেণির অসাধু চক্র প্রাথমিক পর্যায় থেকেই লুণ্ঠনের নীলনকশা তৈরি করে|
এনসিটিবির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারীর দায়িত্ব পালনকালে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত বই মুদ্রণের প্রাতিষ্ঠানিক প্রাক্কলিত দর বাজারমূল্য যাচাইয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত করে দরপত্র আহ্বান বা লাইভ করা হয়েছিল| সেই প্রাতিষ্ঠানিক প্রাক্কলনে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের প্রতি ফর্মার প্রাক্কলিত খরচ ধরা হয়েছিল ৩ দশমিক ২৬ টাকা, ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ২ দশমিক ৮০ টাকা, সপ্তম শ্রেণিতে ২ দশমিক ৮১ টাকা এবং অষ্টম শ্রেণির ক্ষেত্রে ২ দশমিক ৯০ টাকা| ক্রয়কারী সংস্থার প্রধান বা ‘হোপ’ হিসেবে তিনি যাবতীয় বিধিবিধান ও বাজার বিশ্লেষণ পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করেই এই আর্থিক সীমার অনুমোদন দিয়েছিলেন| কিন্তু গত ১০ জুন নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা দায়িত্ব গ্রহণ করার পরপরই প্রশাসনিক পরিবর্তনের এই সুযোগটি লুফে নেয় সিন্ডিকেট চক্র| অভিযোগ রয়েছে, নতুন চেয়ারম্যানকে কৌশলে অন্ধকারে রেখে বোর্ডের এক প্রভাবশালী সদস্য অভ্যন্তরীণ এসব অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সংরক্ষিত আর্থিক প্রাক্কলন প্রেস মালিকদের একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেন|
দরপত্র প্রক্রিয়ার এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গত ২১ জুন খোদ শিক্ষামন্ত্রী ডক্টর আ ন ম এহছানুল হক মিলন এনসিটিবি কার্যালয় পরিদর্শনে আসেন এবং বিষয়টি নিয়ে চেয়ারম্যানের দপ্তরে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়| সেই আলোচনার পরই আইনবহির্ভূতভাবে এনসিটিবির ৪২৩তম বোর্ড সভায় দরপত্রের অনুমোদিত প্রাক্কলন এক ধাক্কায় অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দেওয়া হয়| সংশোধিত নতুন প্রাক্কলনে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির প্রতি ফর্মার দর বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় ৩ দশমিক ৬১ টাকা, ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ৩ দশমিক ৩০ টাকা, সপ্তম শ্রেণিতে ৩ দশমিক ৩১ টাকা এবং অষ্টম শ্রেণির জন্য ৩ দশমিক ৩৫ টাকা| এ ছাড়া মাধ্যমিকের নবম ও দশম শ্রেণির এক রঙের বইয়ের জন্য ৩ দশমিক ৪০ টাকা এবং চার রঙের ফর্মার জন্য ৩ দশমিক ৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়| অথচ দেশের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা বা পিপিআর-২০২৫ অনুযায়ী, একবার দরপত্র লাইভ বা উন্মুক্ত হয়ে গেলে কোনোভাবেই চলমান প্রক্রিয়ায় প্রাক্কলিত ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ নেই| নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র উন্মুক্তের পর কোনো যোগ্য দরদাতা না পাওয়া গেলে পুনরায় বাজার বিশ্লেষণ করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করতে হয় অথবা দরদাতাদের প্রস্তাবিত দর বেশি হলে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত সমন্বয়ের সুযোগ থাকে| কিন্তু বিদ্যমান আইনের সেই সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পুরোপুরি পদদলিত করা হয়েছে|
পিপিআর-২০২৫-এর ৪৪(২) বিধিতে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ রয়েছে যে, দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় বাস্তবসম্মত হওয়া সত্ত্বেও সর্বনিম্ন দর যদি সেই ব্যয়ের চেয়ে বেশি হয় কিংবা ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রকৃত প্রতিযোগিতার সুস্পষ্ট অভাব দৃশ্যমান হয়—তবে সংশ্লিষ্ট সব দরপত্র তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করতে হবে| কিন্তু এনসিটিবির নীতিনির্ধারকরা আইনকানুনের কোনো পরোয়া না করে সিন্ডিকেটের স্বার্থে দর বাড়িয়ে পুরো প্রক্রিয়া বৈধ করার অপচেষ্টা চালান| এমনকি দুর্নীতির গন্ধ পেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন এনসিটিবিতে হানা দিয়ে মূল নথিপত্র জব্দ করার পর নিজেদের বাঁচাতে এক ন্যক্কারজনক কৌশল নেয় সংস্থাটি| তড়িঘড়ি করে অধিকাংশ প্রেস মালিককে অনানুষ্ঠানিকভাবে ডেকে এনে আগের প্রাক্কলিত দর যে বাজার উপযোগী ছিল না, তা স্বীকার করে আগের তারিখ বা ব্যাকডেটে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্যাডে লিখিত প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়| এমন গুরুতর জালিয়াতি প্রসঙ্গে এনসিটিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি কিংবা বক্তব্য দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছেন|
মুদ্রণ দরপত্রের লটভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই সমঝোতার চিত্র আরও প্রকট হয়ে ওঠে| প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সর্বমোট ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে একক দরপত্র জমা পড়েছে ৩০টিতে, যা মোট লটের প্রায় ৬৭ শতাংশ| দুটি করে দরপত্র জমা পড়েছে ১৩টি লটে বা ২৯ শতাংশ ক্ষেত্রে এবং মাত্র দুটি লট বা ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে তিনটি করে দরপত্র জমা হয়েছে| অর্থাৎ প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই কোনো ধরনের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা হতে দেওয়া হয়নি| প্রতিটি লটের বিপরীতে যেখানে ১৭ থেকে ২৪টি করে দরপত্র বিক্রি হয়েছিল, সেখানে রহস্যজনকভাবে জমা পড়েছে মাত্র একটি বা দুটি| উদাহরণস্বরূপ, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ৩৪১ নম্বর লটে ২৪টি সিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র দুটি| একই স্তরের ৩৫৯ নম্বর লটে ২২টির বিপরীতে দুটি এবং ৩৮৮ নম্বর লটে ১৭টি সিডিউল বিক্রির বিপরীতে জমা পড়েছে মাত্র একটি দরপত্র| ষষ্ঠ শ্রেণির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে; যেখানে ৬৫২, ৬২১ ও ৬৩৪ নম্বর লটে ১৮ থেকে ১৯টি করে সিডিউল কিনেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের চাপে অন্যরা পিছু হটেছে এবং শেষ পর্যন্ত একটি করেই দরপত্র জমা পড়েছে|
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন কাগজের বই মুদ্রণে মাধ্যমিকের ফর্মাপ্রতি গড় দর দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩২ টাকা এবং প্রাথমিকে ৩ দশমিক ৫৪ টাকা| অথচ এর আগের ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে কোনো একটি লটেও কোনো একক দরপত্র জমা পড়েনি| উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার কারণে সে বছর মাধ্যমিকে সরকারি প্রাক্কলন ৩ দশমিক ১৭ টাকা থাকলেও প্রেস মালিকরা কাজ করেছিলেন গড়ে মাত্র ২ দশমিক ৩১ টাকায় এবং প্রাথমিকে গড় দর ছিল ৩ দশমিক ৪৪ টাকা| কারণ সে সময় দর ফাঁসের সুযোগ ছিল না এবং প্রেস মালিকরা প্রতিটি লটে ১০ থেকে ২৫টি করে দরপত্র জমা দিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন| কিন্তু এবার দর ফাঁসের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট ও সমঝোতা তৈরি করে ফর্মাপ্রতি বাড়তি দর হাতিয়ে নিয়ে জনগণের ট্যাক্সের আড়াইশো কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত অর্থ সিন্ডিকেটের পকেটে চালান করে দেওয়া হয়েছে|
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান পুরো ঘটনাটিকে দেশের শিক্ষা খাতের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায় বলে আখ্যায়িত করেছেন| তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, দরপত্র চূড়ান্তভাবে লাইভে আসার পর কোনো অবস্থাতেই প্রাক্কলন বাড়ানোর ন্যূনতম আইনি সুযোগ থাকে না| কিন্তু এনসিটিবি ও মন্ত্রণালয়ের নীরবতায় এই বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারি সংঘটিত হয়েছে| তিনি দুদকের চলমান তদন্তে জড়িত অপরাধীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন| জাতির মেরুদণ্ড গড়ে তোলার মূল হাতিয়ার পাঠ্যবই মুদ্রণ নিয়ে এমন বেপরোয়া লুটপাট কেবল রাষ্ট্রীয় কোষাগারের আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং আগামী প্রজন্মের শিক্ষাজীবনকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে| দরপত্র প্রক্রিয়ার এই চক্র ভেঙে এখনই স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের বিচারের আওতায় আনা এবং দুর্নীতির টাকায় ফুলেফেঁপে ওঠা সিন্ডিকেটের কার্যাদেশ বাতিল করা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের আর কোনো পথ খোলা নেই|
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ